উপন্যাসের সেই অদ্ভুত নায়কের চেয়ে একদিন থেকে তিনি বেশি ভাগ্যবান ছিলেন। আয়না, পালিশকরা চকচকে ধাতব জিনিস, অথবা শান্ত পরিষ্কার ভল খুব অল্প বয়স থেকেই ওই নায়কের মনে কেমন একটা অদ্ভুত ভীতির সৃষ্টি করেছিল। তাঁর দেহের সৌন্দর্য হঠাৎ নষ্ট হয়ে যাওয়াটাই এই ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এসব দিক থেকে ডোরিয়েন নির্ভয। দিলেন। বইটির শেষ দিকের অংশটি তিনি একটা নির্দয় আনন্দের সঙ্গে পড়তেন–সম্ভবত, প্রতিটি আনন্দে আর আমোদ-প্রমোদের মধ্যেই কিছু-না-কিছু নির্মমতা রয়েছে; অথচ, কিছুটা আতিশয্য থাকা সত্ত্বেও, এই অংশটিই সত্যিকার বড়ো করুণ। এইখানেই নায়ক একটি। অবশ্যম্ভাবী বস্তুর সত্যের সামনা-সামনি এসে পড়েছেন সেই সত্যটি হচ্ছে সৌন্দর্যের মৃত্যু। বিশ্বের সকলেই যে বস্তুটিকে সবচেয়ে মূল্যবান বলে মনে করে সেই বস্তুটিই তিনি যে। দিন-দিন হারিয়ে ফেলছেন এই নিষ্ঠুর সত্যটা নায়ককে নৈরাশ্যের অন্ধকারে দিশেহারা করে তুলেছে।
কারণ, যে অপরূপ সৌন্দর্য বেসিল হলোয়ার্ড এবং অনেক মানুষকেই মুগ্ধ করেছিল সেই সৌন্দর্য তাঁর অটুট ছিল। কুৎসাই বলুন অথবা ফিসফিসানিই বলুন, লন্ডন শহরে, ক্লাবে, বারে তাঁকে নিয়ে যারা দিনরাত মুকরোচক আলোচনা করত, তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়া মাত্র সেই সব মানুষরা সব ভুলে যেত; তারা ভাবতেই পারত না যে এমন একটি অপরুপ মানুষ কোনোরকম নিন্দনীয় কাজ করতে পারেন। তাঁর চেহারা দেখলে মনে হত তিনি একটি নিষ্পাপ কুসুম ছাড়া আর কিছু নন। কালিমার কোনো ছাপই তাঁর মুখের ওপরে পড়েনি। বরং একটা পবিত্রতার ছায়া তাঁর মুখটিকে স্নিগ্ধ করে রেখেছিল। সেই দেখেই কুৎসা রটনাকারীরা লজ্জিত হত, কেমন করে ওই রকম অপরূপ চেহারার একটি যুবক পৃথিবীর হাজার ক্লেদাক্ত পরিবেশ থেকে মুক্ত থাকতে পারে একথা ভেবেই তারা অবাক হয়ে যেত।
মাঝে-মাঝে অনেক দিন ধরে শহর থেকে টানা তিনি অনুপস্থিত থাকতেন। কোথায় যেতেন, কী করতেন সে-বিষয়ে কেউ কিছু জানত না। ওই নিয়ে নানান লোকে নানান গুজব ছড়াত, বিশেষ করে তাঁর বন্ধু আর বান্ধবীরা। তারপর হঠাৎ একদিন তিনি ফিরে আইসতেন, প্রায়। নিঃশব্দে ওপরে উঠে দরজার চাবি খুলতেন। তারপরে একটা আয়না নিয়ে তিনি বেসিলের আঁকা সেই প্রতিকৃতিটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেন। প্রতিকৃতিটির মুখের ওপরে পাপের যে ক্লেদাক্ত চিহ্নগুলি ফুটে উঠেছে, একবার তিনি সেইগুলির দিকে তাকিয়ে দেখতেন, একবার দেখতেন আনার মধ্যে প্রতিফলিত নিপাপ সুন্দর তার নিজের মুখটাকে দেখে হাসতেন। দুটির মধ্যে তীব্র পার্থক্য তাঁর আনন্দ বাড়িয়ে দিত। ক্রমশ তিনি যেমন নিজের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে পড়লেন, তেমনি আগ্রহী হলেন নিজের আত্মার অধঃপতনে। পাপের এবং বয়সের যে ছাপগুলি প্রতিকৃতিটির কুঞ্চিত কপালের ওপরে বীভৎস হয়ে ফুটে উঠেছিল, বিকৃত করেছিল মুখের আদলটিকে সেইগুলি তিনি বেশ খুঁটিযে-খুঁটিয়ে দেখতেন, দেখে মাঝে-মাঝে একটা পাশবিক আনন্দে তাঁর মন নেচে উঠত। ছবিটির খসখসে মোটা হাতের পাশে নিজের পরিচ্ছন্ন হাত রেখে তিনি হাসতেন। সেই বিকৃত দেহ এবং বিবশ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখে বিদ্রূপ করতেন তিনি।
রাত্রিতে মাঝে-মাঝে তাঁর ঘরে সুন্দর বিছানায় যখন তিনি একা শুয়ে থাকতেন অথবা ডকের পাশে নোংরা ছোটো বস্তীর ঘরে নিজের নাম ভাঁড়িয়ে এবং গোপনে যখন তিনি রাত্রিবাস করতেন, প্রায়ই বেশ্যালয়ে যাওয়াটা যখন তাঁর কেমন একটা অভাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, তখন মাঝে-মাঝে আত্মার অধঃপতনে তাঁর কেমন যেন একটা দুঃখ হত; এই দুঃখে তাঁর একান্ত ব্যাক্তিগত বলেই তা এত তিক্ত। কিন্তু এ রকম চিন্তাও তাঁর মনে খুব একটা বেশি আসত না। বেসিলের বাগানে বসে লর্ড হেনরি তাঁর মলে জীবনের যে কৌতূহল । ভাগিয়ে তুলেছিলেন সেই কৌতূহলই তাঁর বাড়তে লাগল আর সেই কৌতূহল যত তাঁর মিটতে লাগল ততই তিনি খুশি হতে লাগলেন। যতই তিনি জানতে লাগলেল ততই তাঁর জানার আগ্রহ বাড়তে লাগল। সেই বাসনার পূর্তির সঙ্গে-সঙ্গে নতুন বাসনা দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল।
কিন্তু তবু সত্যি কথা বলতে কি সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার দিক থেকে তিনি মোটেই উদাসীন ছিলেন না। শীতকালে মাসে দু’বার কি একবার এবং বুধবার সন্ধ্যার সময় বাড়িতে তাঁর গানের জলসা বসত; সেই জলসাঘ কেবল বিদগ্ধ মানুষদেরই তিনি আপ্যায়িত করতে না, সে-যুগের বিখ্যাত এবং লব্ধপ্রতিষ্ঠ সঙ্গীতকারদেরও নিমন্ত্রণ জানাতেন; তাঁরা তাঁদের সঙ্গীতে শ্রোতুবর্ণকে মুগ্ধ করতেন। মাঝে-মাঝে তিনি ছোটোছোটো ভোজ দিতেন। এই কাজে লর্ড হেনরি অবশ্য সব সময়েই তাঁকে সাহায্য করতেন। এখানেও সেই একই ব্যাপার। নিমন্ত্রিত থেকে শুরু করে খাবার টেবিল, ঘর সাজানো এবং খাদ্যের তালিকা প্রস্তুতিতে তিনি যথেষ্ট সুরুচি এবং শিল্পকলার পরিচয় দিতেন। সেই নিমন্ত্রিতদের মধ্যে এমন অনেকেই ছিলেন বিশেষ করে যুবক সম্প্রদায় তাঁর মধ্যে ইটন অথবা অক্সফোর্ডের আভিজাত্য খুঁজে পেতেন।
এবং একথা বললে অযৌক্তিক হবে না যে জীবনটাই তাঁর কাছে ছিল প্রথম আর শ্রেষ্ঠ-সকল কলার শ্রেষ্ঠ কলা; অন্য সমস্ত কলা সেই জীবনকে পরিপূর্ণ ভাবে উপভোগ করার প্রস্তুতি মাত্রা সত্যিকার আজগুবি জিনিস ফ্যাশানের মাধ্যমেই সর্বজনীন হয়ে দাঁড়ায়; আধুনিক সৌন্দর্যকে জোর করে জাহির করাকেই বলা হয় বাবুগিরি। এই দুটি জিনিসই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল। তাঁর পোশাকের গঠন এবং পোশাক পরার রীতিটি তখনকার “মেফেযার বল” এবং “পল মল” ক্লাবের যুবক সম্প্রদায়ের মনে বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। তারা সবাই তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ, চলন-বলন অনুকরণ করার ব্যর্থ চেষ্টায় হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াত।
