“একটি অভিনেত্রীর মৃত্যুর সম্বন্ধে তদন্ত: হক্সটন রোডে বেল ট্রাভার্ণ-এ ডিস্ট্রিক্ট করোনার মিঃ ডানবি আজ সকালে সাইলি ভেন নাম্নী একটি যুবতী অভিনেত্রীর মৃত্যুর কারণ বার করার জন্যে অনুসন্ধান পরিচালনা করেন। অভিনেত্রীটি হলবর্ন-এ রয়্যাল থিয়েটারে অভিনয় করতেন। নিছক একটা দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে যে তাঁর মৃত্যু হয়েছে এই মতই তিনি দিয়েছেন। মৃতার মা যখন সান্ধী দিতে এসেছিলেন তখন এই বিযোগের জন্যে অনেকেই তাঁর দুঃখে সহানুভুতি দেখান। ডঃ বিরেল ময়না তদন্ত করেন। তাঁর সাক্ষী দেওয়ার সময়েও শ্রোতারা গভীর দুঃখে ভেঙে পড়েন।”
লেখাটা পড়ে ভ্রুকুটি করলেন তিনি, কাগজটা ছিঁড়ে ফেলে ডানালার কাছে এগিয়ে গেলেন, তারপরে জানালার বাইরে সেগুলি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। কী কুৎসিত! কী ভয়ঙ্কর রকমের। কদর্য! সংবাদটা তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্যে লর্ড হেনরির ওপরে তাঁর রাগ হল। তাছাড়া। সংবাদটার চারপাশে লাল পেনসিল দিয়ে দাগ কেটে দেওয়াটাও নেহাৎ বোকামো হয়েছে। ভিকটর নিশ্চয় তা পড়েছে। ওটা পড়ে বোঝার চেয়ে অনেক বেশি ইংরেজি সে জানে।
সম্ভবত সে ওটি পড়েছে এবং পড়ে কিছু সন্দেহ করতে শুরু করেছে। কিন্তু তাতেই বা কী আসে যায়? সাইভিল ভেনের মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর সমপর্ক কী? না, কোনো ভয় নেই। ডোরিয়েন গ্রে তাকে মারেননি।
লর্ড হেনরি যে হলদে বুইটা পাঠিয়েছেন। সেই বইটার ওপরে নজর পড়ল তাঁরা বস্তুটা কী? তিনি অবাক হয়ে ভাবলেন। ধূসর বর্ণের ছোটো অষ্টভুজা দাঁড়ানো বই রাখার জায়গাটার দিকে তিনি এগিয়ে গেলেন। দেখে সব সময় তাঁর মনে হত ইজিপ্টের কোনো শ্রমশীল মিস্ত্রি ওটিকে তৈরি করেছেন। গ্রন্থটিকে তুলে নিয়ে আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দিলেন তিনি, তারপরে পড়ায় গেলেন ডুবো ওরকম অদ্ভুত বই জীবনে আর কখনো তিনি পড়েননি। তাঁর মনে হল বাঁশীর মিষ্টি সুরের সঙ্গে তাল দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত পাপ নির্বাকভাবে নাচতে নাচতে তাঁর সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে জিনিসগুলি তিনি কল্পনায় দেখতেন সেগুলি যেন হঠাৎ রূপ পরিগ্রহ করে তাঁর সামনে উপস্থিত হল। যে জিনিসটা কোনোদিন তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি সেই জিনিস ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করল।
ওটি একটি উপন্যাস কিন্তু প্লট বলে কিছু ওর নেই। চরিত্র বলতে একটিই–সেটি হচ্ছে প্যারিসের একটি যুবকের। ওটিকে একটি মনস্তত্ত্বমূলক গ্রন্থ বললেই বোধ হয় ঠিক বলা হবে। ঊনবিংশ শতাব্দীর এই যুবকটি একমাত্র তার নিজের যুগ ছাড়া অন্য সমস্ত যুগের ভাবধারা অনুধাবন করার চেষ্টা করেছিল। অর্থাৎ সেই সব কৃত্রিম আত্মত্যাগ যেগুলিকে মানুষ চিরকাল পুণ্য বলে ভুল করেছে অথবা মানুষের সেই সব স্বাভাবিক বিদ্রোহ যাদের মানুষ অবিবেচকের মতো পাপ বলে প্রচার করেছেন সেইগুলি আসলে কী তাই নিয়ে সে সারাজীবনটা গবেষণা। করেছিল। ভাষাটি মুক্তোর ঝালরের মতো তা প্রাচীন ব্যঞ্জনা আর আঙ্গিকে খোদাই করা। মাঝে-মাঝে বিশেষ অর্থে বিশেষ শব্দ প্রয়োগের চেষ্টা বেশ স্পষ্ট। সেই সঙ্গে রয়েছে বিশদ ব্যাখ্যা। জগতের শ্রেষ্ঠ লেখকরা বিশেষ করে ফ্রান্সে যাঁদের সিম্বোলিস্ট বলা হয়, এই জাতীয় দুর্বোধ্য রচনার ভেতর দিয়েই স্বীকৃতি লাভ করেছেন। অতীন্দ্রিয় দর্শনের মধ্যে দিয়ে রক্তমাংসের প্রবৃত্তিগুলিকে প্রকাশ করার চেষ্টা হয়েছে এখানে। পাঠক বুঝতে পারে না সে। মধ্যযুগের কোনো সাধুর আধ্যাত্মিক কোনো বক্তৃতা পড়ছে, না আধুনিক কোনো রুগ্ন পাপীর স্বীকারোক্তি পড়ছে। গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে বিষাক্ত ঘরের মধ্যে ধূপের ভারী গন্ধ বইটির পাতার। মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর চিন্তাধারাটিকে কিছুটা বিপর্যস্ত করে তুলেছিলা ভাষার ছন্দ আর বর্ণনার ঝঙ্কার তাঁর মনে এমন একটি সুর ভাগিয়ে তুলেছিল যে তিনি সব ভুলে একটি পরিচ্ছেদের পর আর একটি পরিচ্ছেদ অবলীলাক্রমে পড়ে যেতে লাগলেন।
মেঘমুক্ত আকাশ থেকে ধীরে-ধীরে অন্ধকার নেমে এল, জানালার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করল ঘরের মধ্যে সেই অস্পষ্ট আলোতে তিনি আরো কিছুক্ষণ পড়তে চেষ্টা করলেন; শেষ পর্যন্ত আর পারলেন না। এর মধ্যে তাঁর চাকরটি বারবার এসে দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে সচেতন করে দিয়ে গিয়েছে। শেষকালে একসময় তিনি উঠে পড়লেন এবং বইটি তাঁর শোওয়ার ঘরে রেখে ডিনারের জন্যে তৈরি হলেন।
ক্লাবে গিয়ে পৌঁছতে তাঁর প্রায় রাত নটা বেজে গেল। তিনি দেখলেন লর্ড হেনরি যথারীতি সেখানে বসে রয়েছে। মুখে তাঁর বেজারের চিহ্ন।
তিনি বললেন: দেরি হওয়ার জন্যে আমি সত্যিই বড়ো দুঃখিত, হেনরি। কিন্তু তুমি যে বইটা আমাকে পাঠিয়েছ সেটি পড়তে গিয়ে আমি কেমন যেন মশগুল হয়ে পড়েছিলাম। সময়ের জ্ঞান আমার ছিল না।
চেয়ার থেকে উঠে লর্ড হেনরি বললেন: আমি জানতাম, বইটি তোমার ভালো লাগবে।
ভালো লেগেছে সেকথা আমি বলিনি, হ্যারি; বলেছি আমাকে বইটি একেবারে অভিভূত করে তুলেছিল। দুটি কথার মধ্যে প্রভেদ রয়েছে।
দুজনে ডাইনিং রুমের দিকে যেতে-যেতে লর্ড হেনরি বললেন: তাই বুঝি! তুমি তাহলে তফাৎটা বুঝতে পেরেছ?
.
একাদশ পরিচ্ছেদ
তারপরে দীর্ঘ কয়েকটি বছর বইটির প্রভাব থেকে ডোরিয়েন গ্রে নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি; নিজেকে মুক্ত করতে চাননি বললেই হয়তো কথাটা ঠিক বলা হবে। বইটির প্রথম সংস্করণের বড়ো-বড়ো প্রায় নটি কাগজের মোড়াই কপি তিনি প্যারিস থেকে আনলেন বিভিন্ন রঙের কভার দিয়ে সেগুলিকে বাঁধালেন। যে-সব বাসনা-কামনার হাতে নিজেকে তিনি বন্দী করে ফেলেছিলেন, বিভিন্ন ঋতুতে তাদেরই খুশি করার জন্যে তাঁর এই প্রচেষ্টা তাঁকে বেশ কিছুদিন একেবারে মশগুল করে রেখেছিল। প্যারিসের অধিবাসী সেই নায়কের রোমান্টিক এবং বৈজ্ঞানিক ভাবধারার মধ্যে তিনি তাঁর নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছিলেন। সত্যি কথা বলতে কি, তাঁর জন্মের অনেক আগে থাকতেই তাঁরই জীবনের কাহিনি নিয়ে কে যেন উপন্যাসটি রচনা করে গিয়েছেন।
