কিন্তু কৌতূহলী দৃষ্টি থেকে কোনো জিনিস লুকিয়ে রাখার মতো এর চেয়ে ভালো জায়গা আর নেই। চাবিটা তাঁর কাছে রয়েছে সেই জন্যে অন্য কেউ সেখানে ঢুকতে পারবে না। এই লাল চাদরের নীচে প্রয়োজন মনে করলে ছবির মুখটা তার খুশি মতো পাশবিক মূর্তি গ্রহণ করতে পারে। তাতে কার কী যায় আসে? কেউ তা দেখতে আসবে না। নিজেও তিনি তা দেখবেন না। তাঁর আত্মার এই ভয়ঙ্কর বিকৃতি কেনই বা তিনি লক্ষ করবেন? তাঁর যৌবন বেঁচে থাকবে এইতো যথেষ্ট। তাছাড়া, তাঁর চরিত্র কি শেষ পর্যন্ত সুন্দর হয়ে উঠবে না? তাঁর ভবিষ্যৎটাও যে এই রকমেরই ক্লেদাক্ত থেকে যাবে এর পেছনেও তো কোনো কারণ নেই। নতুন কোনো প্রেম তাঁর ভেতরে দেখা দিতে পারে সেই প্রেম তাঁকে পবিত্র করে তুলবে এং যে পাপ তাঁর দেহ আর মনকে এমনভাবে ঝাঁকানি দিয়েছে–সেই অদ্ভুত অদৃশ্য পাপ যাকে আমরা বুঝতে পারিনি বলেই মনোহর বলে মনে করি–সেই পাপ থেকে তাঁকে রহস্কা করতে পারে। সেই রক্তিমাভ সপর্শকাতর মুখ থেকে হয়তো একদিন সেই নির্মম চাহনিটি মুছে যাবে এবং বেসিল হলওয়ার্ডের জীবনের শ্রেষ্ঠ শিল্পকীর্তিটিকে তিনি বিশ্বকে দেখাতে পারবেন।
না, সে অসম্ভব। ঘন্টার পর ঘন্টা, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, ছবিটির ওপরে বার্ধক্যের ছাপ পড়বে। পাপের ভয়ঙ্কর বিকৃতি থেকে ও মুক্তি পেতে পারে, কিন্তু বয়সের বিকৃতি থেকে ওর কোনো মুক্তি নেই। গাল দুটি চুপসে যাবে, হবে থলথলে; হলদে রঙের ছায়া নেমে নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়বে নিষ্প্রভ দুটি চোখের কোটরে, বীভৎস দেখাবে তাদের। চুলগুলি হারিয়ে ফেলবে তাদের। উজ্জল বর্ণ, মুখের চোয়াল পড়বে ঝুলে, বৃদ্ধদের মুখের মতো সেই মুখ বোকাটে-বোকাটে দেখাবে। কণ্ঠে জাগবে কুঞ্চন, ঠান্ডা হাত দুটির ওপরে নীল শিরাগুলি জেগে উঠবে; দেহটা ভেঙে কুঁজো হয়ে যাবে। শৈশবে যে দাদামশায় তাঁর চোখে অত কঠোর প্রকৃতির ছিলেন, বৃদ্ধ বয়সে তিনিও ঠিক ওই জাতীয় প্রাণীতে পরিণত হয়েছিলেন। বেশ মনে রয়েছে তাঁর। সুতরাং ছবিটাকে লুকিয়ে ফেলতেই হবে। এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই তাঁর।
ঘুরে দাঁড়িয়ে বেশ ক্লান্ত স্বরেই তিনি বললেন: ওটাকে ভেতরে নিয়ে আসুন, মিঃ হুবার্ড, আপনাদের অনর্থক দাঁড় করিয়ে রাখরা জন্যে দুঃখিত, আমি অন্য কথা ভাবছিলাম।
মিঃ হুবার্ড পরিশ্রমে হাঁপাচ্ছিলেন, তিনি বললেন: একটু বিশ্রাম পেয়ে ভালোই হয়েছে, মিঃ গ্রে। এটাকে কোথায় রাখব বলুন তো?
যে কোনো জায়গায়। এখানে, এখানে-ও রাখা যেতে পারে। আমি এটাকে ঝুলিয়ে রাখতে চাই নে। দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখুন। ধন্যবাদ।
কিন্তু ছবিটা কেউ দেখতে চাইতে পারে স্যার!
কথাটা শুনে চমকে উঠলেন মিঃ ডোরিয়েন; লোকটির দিকে চোখ রেখে বললেন: ওটা দেখতে আপনার ভালো লাগবে না।
যে জাঁকালো পর্দাটা তাঁর জীবনের একটি গোপন রহস্যকে ঢেকে রেখেছে, লোকটি যদি সেই পর্দাটা একটু সরিয়ে ছবিটি দেখার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে তাহলে তাঁকে আচ্ছা করে ধোলাই দেওয়ার একটা বাসনা তাঁর মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে গেল।
আর আপনাকে কষ্ট দেব না। আপনি যে দয়া করে এসেছেন তার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
মোটেই না, মোটেই না, মিঃ গ্রে। আপনার জন্যে সব সময়ে সব কাজ করতে আমরা প্রস্তুত।
এই বলে মিঃ হুবার্ড তাঁর সহকারীকে পেছনে নিয়ে নামার পথ ধরলেন। নামার পথে সহকারীটি তার সেই রুক্ষ আর বিশ্রী মুখ ঘুরিয়ে লজ্জা আর সেই সঙ্গে কিছুটা বিস্ময় মখালো। দৃষ্টি দিয়ে পেছনে ফিরে ডোরিয়েনের দিকে একবার তাকাল। এমন অপরূপ চেহারার মানুষ, আর কোনো দিন তার চোখে পড়েনি।
তাদের পদশব্দ নীচে মিলিয়ে যাওয়ার পরে, দরজায় চাবি দিয়ে চাবিকাঠিটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন ডোরিয়েন। এখন অনেকটা নিরাপদ মনে হল তাঁরা এই ভয়ঙ্কর জিনিসটা আর কারও চোখে পড়বে না। নিজের ছাড়া আর কারও চোখ তাঁর এই লজ্জার ওপরে পড়বে না।
লাইব্রেরিতে নেমে আসার পরে তিনি দেখলেন পাঁচটা বেড়ে গিয়েছে। টেবিলের ওপরে চা-এর সরলাম সাজানো রয়েছে। প্রচুর পরিমাণে ঝিনুক দিয়ে গাঁথা সুগন্ধী কাঠের তৈরি ছোট্ট একটা টেবিলের ওপরে লর্ড হেনরির একটা চিঠি চাপা রয়েছে। তাঁর অভিভাবকের পত্নী লেডি ব্যাডল টেবিলটি তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন। ভদ্রমহিলা গত শীতে কায়রোতে ছিলেন। লর্ড হেনরির চিঠির পাশে হলদে কাগজে মোড়া একখানা বই রয়েছে। বইটির মলাট সামান্য ছেঁড়া, বাঁধাইটা নোংরা। চা-এর ট্রের ওপরে দি সেন্ট জেমস গেজেটের তৃতীয় সংস্করণের একটি কপি চাপা দেওয়া। স্পষ্টতই বোঝা গেল যে ভিকটর ফিরে এসেছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে দুজনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল কিনা এবং হলে তাদের কাছ থেকে সে কোনো তথ্য সংগ্রহ করেছে কি না এটাই তিনি ভাবতে লাগলেন। ঘরের মধ্যে চা-এর সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখার সময় সম্ভবত ছবিটিকে সে দেখতে পায–সম্ভবত নয়, নিশ্চয়। পর্দাটাকেও সে ঠিক করে রাখেনি। ফলে দেওয়ালের সামনের জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। হয়তো কোনো রাত্রিতে লোকটা খুঁড়ি দিয়ে ওপরে গিয়ে দরজাটা ভাঙার চেষ্টা করবে। ঘরের ভেতরে গুপ্তচর। রাখাটা নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক। তিনি এমন কিছু ধনী মানুষদের কথা শুনেছেন যাদের বাড়ির চাকর চিরকাল তাঁদের ব্ল্যাকমেইল করেছে, কারণ তাঁদের কোনো গোপন চিঠি তারা পড়ে। ফেলেছিল, অথবা, মনিবের কিছু কথা তারা আড়ি পেতে শুনেছিল, অথবা ঠিকানা লেখা কোনো কার্ড তাদের হাতে পড়েছিল, অথবা বালিশের তলায় পাক বাঁধা কোনো চুলের ফিতে আবিষ্কার করে ফেলেছিল। এই জন্যে চাকরদের অনেক ঘুষ খাওয়াতে হয়েছে তাঁদের। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। তারপরে চা ঢেলে লর্ড হেনরির চিঠিটা খুললেন। চিঠিতে কেবল লেখা ছিল যে সন্ধ্যার কাগজটা তিনি পাঠিয়ে দিলেন, সেই সঙ্গে পড়তে যদি ভালো লাগে এই আশায একখানি বই-ও পাঠালেন। তিনি যে তাঁর জন্যে ক্লাবে আটটা পনেরোতে অপেক্ষা করবেন সেকথা লিখতেও ভোলেননি তিনি। খবরের কাগজের পাতাগুলি উদাসীনভাবেই উলটোচ্ছিলেন তিনি; হঠাৎ পঞ্চম পৃষ্ঠার একটি কলামে লাল পেনসিলের দাগ কাটা থাকায় তাঁর কৌতহল কেমন বেড়ে গেল। তিনি সেটা পড়ে গেলেন।
