তাঁর মনে হল চাকরটিকে এখনই কোথাও সরিয়ে দিতে হবে। ছবিটা কোথায় রাখা হবে সে সংবাদ তাকে জানতে দেওয়া হবে না। এই উদ্দেশ্যে একটু চালাকি খেলতে হল তাঁকে। লেখার টেবিলে ধীরে সুস্থে বসে তিনি একখানা পত্র লেখার কাগজ টেনে নিলেন; লর্ড হেনরিকে উদ্দেশ্য করে কয়েকটি লাইন খসখস করে লিখেও ফেললেন; সেই চিঠিতে পড়ার জন্যে কিছু বই তাঁকে পাঠাতে বলেলন, সেই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিলেন সেদিন রাত আটটা পনেরোর সময় তাঁদের বিশেষ একটি জায়গায় মিলিত হওয়ার কথা রয়েছে।
চিঠিটা চাকরের হাতে দিয়ে বললেন: এটা তুমি লর্ড হেনরির কাছে নিয়ে যাও। তাঁর উত্তরটা নিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করো। ভদ্রোলোকদের আসতে বলে যাও।
দু’তিন মিনিটের মধ্যে আর একটা টোকা পড়ল। হাজির হলেন সাউথ অডলি স্ট্রিটের মিঃ হবার্ড স্বয়ং। পেশার দিক থেকে বেশ নামকরা ফটো ফ্রেম বাঁধাইকারী। তিনি একলা । আসেননি; সঙ্গে এসেছেন রুক্ষ চেহারার একটি যুবক সহকারীকে। চেহারার দিকে ভদ্রলোক বেঁটে; গোঁফ জোড়াটি লাল, পোশাক বেশ জাঁকালো আর্টের ওপরে। তাঁর যে শ্রদ্ধা তার উৎস হচ্ছে যে সব আর্টিস্টের সঙ্গে তাঁর লেনদেনের ব্যাপার ছিল তাঁদের অনেকেরই চরম দারিদ্র্য। নীতিগতভাবে কোনোদিনই তিনি দোকান ছেড়ে বেরোতেন না। খরিদ্দার বা অন্য লোকদের ডজন্যে তিনি দোকানেই অপেক্ষা করতেন। কিন্তু ডোরিয়েন গ্রের ব্যাপারে সব সময়েই তিনি এই নিয়ম ভেঙে চলতেন। ডোরিয়েন গ্রে-র মধ্যে এমন একটা জিনিস ছিল যা মানুষকে মুগ্ধ না করে পারত না। তাঁকে চোখে দেখেও আনন্দ পেত মানুষ।
তাঁর স্থূল হাত দুটিকে কচলিয়ে তিনি বললেন: আপনার জন্যে কী করতে পারি মিঃ গ্রে? ভেবেছিলেম আপনার এখানে আমি একাই আসব। আমার দোকানে অদ্ভুত সুন্দর একটা ছবির ফ্রেম রয়েছে, স্যার। এটাকে একটা সেল-এ কিনেছি আমি। মনে হয়, ফ্রন্টহিল থেকে আমদানি হয়েছে। ধর্ম সংক্রান্ত কোনো কিছু ছবির পক্ষে এই ফ্রেম খুব জুৎসই, স্যার।
মিঃ হুবার্ড, আপনি যে কষ্ট করে নিজেই এসেছেন তার জন্যে আমি দুঃখিত। যদিও ধর্ম। সম্বন্ধীয় কোনো আর্ট নিয়ে বর্তমানে আমি মাথা ঘামাইনে তবু আপনার দোকানে একদিন গিয়ে নিশ্চয় আমি ফ্রেমটি দেখে আসব,কিন্তু আজকে আমার একটি ছবিকে বাড়ির ওপরতলায় নিয়ে যেতে হবে। ছবিটা বেশ ভারী, আপনি যদি ডনে দুই লোক পাঠিয়ে দিতে পারেন তাহলে খুব ভালো হয়।
তাতে আর অসুবিধে কী রয়েছে, মিঃ গ্রে? আপনার কোনো সাহায্যে আসতে পারলে আমি খুশিই হবা কোন ছবিটার কথা বলছেন, স্যার?
পর্দাটাকে সরিয়ে ডোরিন বললেন: এইটা। চাপানসুদ্ধ, ঠিক যেমনটি রয়েছে, এটাকে নিয়ে যেতে পারবেন? ওপরে নিয়ে যাওয়ার সময় এর গায়ে কোথাও কোনো ঠোক্কর লাগুক তা আমি চাইলে।
কোনো অসুবিধে হবে না স্যার।
এই বলে সেই লোকটি তাঁর সহকারীকে নিয়ে যে পেতলের শেকল দিয়ে ছবিটি টাঙানো ছিল। তার পেরেকটা খুলতে লাগলেন।
এখন কোথায় এটিকে নিয়ে যাব, মিঃ গ্রে?
আপনি দয়া করে আমার সঙ্গে আসুন। জায়গাটা আমি দেখিয়ে দিচ্ছি, মিঃ হুবার্ড। তার চেয়ে আপনিই বরং আগে-আগে চলুন। যেতে হবে বাড়ির একেবারে ওপরতলায়। চলুন আমরা সামনের সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাই। সিড়িঁটা বেশ চওড়া।
তাঁদের যাতে বেরিয়ে যেতে অসুবিধে না হয় সেইজন্যে দরজাটা তিনি ফাঁক করে দিলেন। হলঘরের মধ্যে ঢুকে তাঁরা সিঁড়িতে উঠতে লাগলেন। বিশেষ এবং বিশদ খুঁটিনাটির দিকে লক্ষ রাখার ফলে ছবিটা বেশ ভারী হয়ে পড়েছিল। পাচ্ছে সেটা ঠোক্কর লেগে ভেঙে যায় এই ভয়ে মাঝে-মাঝে ডোরিয়েন ছবিটাকে ধরছিলেন। কিন্তু মিঃ হুবার্ড বিনয়-নম্রভাবে নিষেধ করছিলেন তাঁকে তাঁর বোধ হয় কারণটা এই যে সত্যিকার ব্যবসাদারের মতো তিনি চাইতেন না কোনো ভদ্রলোক কোনো প্রয়োজনীয় কাজ করুক।
সিঁড়ির শেষ ধাপে উঠে সেই খুদে লোকটি হাঁপাতে-হাঁপাতে বললেন: সত্যিকাল ভারী, স্যার।
এই বলে কপালের ঘাম মুছলেন তিনি।
ঘরের চাবি খুললেন ডোরিয়েন; এই ঘরেই তিনি তাঁর জীবনের একটি অদ্ভুত গোপন রহস্যকে লুকিয়ে রাখতে এসেছেন। সেই সঙ্গে লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে রাখবেন নিজের আত্মাটিকেও। দরজাটা খুলে দিয়ে তিনি বললেন, হ্যাঁ, তা বেশ ভারীই বটে।
এই ঘরে জীবনে তিনি বারো বছরের মধ্যে ঢোকেননি। শৈশবে এই ঘরে তিনি খেলতেন; কিছুটা বড়ো হওয়ার পরে এখানে তিনি পড়াশুনা করতেন। ঘরটি বিরাট এবং উপযুক্ত। মাপের। বাচ্চা নাতির জন্যেই মৃত লর্ড কেলসো ঘরটিকে তৈরি করিয়েছিলেন। ছেলেটির। মধ্যে তার মায়ের চেহারার দুপ থাকায় এবং অন্যান্য কারণে, ছেলেটিকে সূব সময় তিনি ঘৃণার চোখে দেখতেন। বিশেষ করে সেইজন্যেই ছেলেটিকে তিনি তাঁর কাছ থেকে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। ডোরিয়েনের মনে হল ঘরটির কিছুই পরিবর্তন হয়নি। তার গঠন, আসবাবপত্র–সব একইরকম রয়েছে। সাটিনের তৈরি বুককেসের মধ্যে এখনো তাঁর স্কুলের বইগুলি সাজানো রয়েছে। তার পেছনে দেওয়াল। সেই দেওয়ালের ওপরে অপরিচ্ছন্ন একটা পর্দা। পর্দায় গায়ে একটি বাজা আর রানির অস্পষ্ট ছবি; বাগানে বসে তাঁরা দাবা খেলছেন। পাশের রাস্তা দিয়ে কয়েকটি ফিরিওয়ালা ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছে। তাদের কব্জির ওপরে শেকল। বাঁধা কয়েকটা ঝুঁটিওয়ালা পাখি। সব মনে রয়েছে তাঁর স্পষ্ট মনে রয়েছে। ঘররে চারপাশে তিনি তাকিয়ে দেখলেন। শৈশবের প্রতিটি নিঃসঙ্গ মুহূর্ত তাঁর মনে পড়ে গেল। মনে পড়ল তাঁর শৈশবের নিষ্পাপ দিনগুলির কথা। সেই ঘরের মধ্যে এই ধরনের যে একটা বিষাক্ত ছবিকে লুকিয়ে রাখতে হবে এটা ভাবতেই তাঁর মনটা আঁতকে উঠল। তাঁর কপালে এই লেখা রয়েছে–একথা কি কোনোদিন তিনি ভাবতে পেরেছিলেন?
