কপালের ওপরে হাত বুলোলেন ডোরিয়েন। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে সেখানে। তাঁর মনে হল একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির একেবারে শেষ ধাপে তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
তিনি বেশ জোর গলাতেই বললেন: ছবিটা তুমি কোনোদিনই প্রদর্শনীতে পাঠাবে না এই রকম একটা কথা মাসখানেক আগে আমাকে তুমি বলেছিলো তোমার মত পরিবর্তন করলে কেন? তোমাদের মতো যারা নিডদের এক কথার মানুষ বলে মনে করে তাদের সঙ্গে অন্য লোকদের কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য যদি কিছু থাকে তা হচ্ছে এই যে তোমাদের উচ্ছ্বাস অর্থহীন। তুমি যে আমাকে বলেছিলে যে পৃথিবীর কোনো কিছুর লোভেই তুমি ছবিটি প্রদর্শনীতে পাঠাবে না সেকথাটা নিশ্চয়ই তুমি ভুলে যাওনি। হ্যারিকেও তুমি ঠিক ওই কথাই বলেছিলে।
এই বলেই হঠাৎ তিনি চুপ করে গেলেন। হঠাৎ তাঁর একটা কথা মনে পড়ে গেল। কিছুটা সিরিয়াস আর আর কিছুটা উপহাসের ভঙ্গিতে লর্ড হেনরি একবার তাঁকে বলেছিলেন: যদি মিনিট পনেরো সময় পাও তো বেসিলকে বলতে বলো কেন সে ছবিটি প্রদর্শনীতে পাঠাবে না। সে আমাকে বলেছিল সে পাঠাবে না। কথাটা শুনে অবাক লেগেছিল আমার। হ্যাঁ, তাই। বেসিলেরও তাহলে কোনো গোপন রহস্য রয়েছে। তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করবেন, জানার চেষ্টা করবেন কারণটা।
তাঁর কাছে এগিয়ে এসে এবং সোজাসুজি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ডোরিয়েন বললেন: বেসিল, আমাদের দুজনেরই একটা গোপন রহস্য রয়েছো তুমি যদি তোমার কথা আমাকে বুল…আমার কথা আমি তোমাকে বলবা কেন তুমি আমার ছবিটা প্রদর্শনীতে পাঠাতে চাওনি তখন?
নিজের অজান্তে চিত্রকর একটু কেঁপে উঠলেন; বললেন: ডোরিয়েন, সে কথা বললে তুমি হয়তো আগের মতো আর আমাকে পছন্দ করবে না; চাই কি উপহাস-ও করতে পারা ও দুটির একটাও যদি তুমি কর আমি তা সহ্য করতে পারব না। তুমি যদি ওই ছবিটি আর কোনোদিনই আমাকে দেখাতে না চাও তাতেও আমি খুশি। আমি চাই তুমিই ওটিকে সব সময় দেখা তুমি যদি মনে কর আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ছবিটিকে তুমি লুকিয়ে রাখবে তাতেও আমি সন্তুষ্ট। যশ বা খ্যাতি-দুটোর কোনোটাকেই আমি তোমার বন্ধুত্বের ওপরে স্থান দিইনে।
ডোরিয়েন গ্রে ছাড়লেন না; বললেন: না বেসিলি; তোমাকে বলতেই হবে। মনে হয় সেকথা ডানার অধিকার আমার রয়েছে।
তাঁর আতঙ্ক সরে গেল; তার জায়গা দখল করল একটা কৌতূহল। বেসিল হলওয়ার্ডের রহস্যটা কী তা জানার জন্যে তিনি বদ্ধপরিকর হলেন।
হলওয়ার্ডের চোখমুখের চেহারা দেখে মনে হল তিনি বেশ একটা অসুবিধায় পড়েছেন।
ডোরিয়েন, এস আমরা বসি। আমি তোমাকে একটি মাত্র প্রশ্ন করব। তার উত্তর দাও। ছবির ভেতরে কোনো অদ্ভুত জিনিস কি তুমি লক্ষ করেছ? এমন একটা জিনিস যা প্রথমে তোমার নজরে পড়েনি; কিন্তু হঠাৎ একদিন ধরা পড়েছে তোমার কাছে?
কম্পিত হাতে চেয়ারের একটা হাতল জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠলেন তিনিঃ বেসিল!
চমকে উঠে ভয়-বিহ্বল চোখে তিনি তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বুঝতে পারছি তোমার চোখে তা ধরা পড়েছে। চুপ কর। এ-বিষয়ে আমি যা বলতে চাই তা তুমি মন দিয়ে শোন, ডোরিয়েন তোমার সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার পর থেকেই, তুমি। অদ্ভুতভাবে আমাকে প্রভাবান্বিত করেছিলো আমার আল্ল, মস্তিষ্ক আর শক্তি সকলের ওপরেই প্রভুত্ব বিস্তার করেছিলে তুমি। অনবদ্য স্বপ্নের মতো অদৃশ্য আদর্শের যে স্মৃতিটি আমাদের মতো আর্টিস্টদের অস্থির করে তোলে তুমি আমার কাছে ছিলে তার একটি মূর্ত প্রতীক। আমি তোমাকে পূজা করতাম। তুমি কারো সঙ্গে কথা বললে আমি তাকে করতাম হিংসা। আমি তোমার সমস্ত সত্তাকে নিজের মধ্যে পেতে চেয়েছিলাম। তুমি যখন আমার কাছে বসে থাকতে কেবলমাত্র তখনই আমি সুখী হতাম। তুমি যখন চলে যেতে, আমার শিল্পের মধ্যে তখনও তোমার উপস্থিতির সপর্শ পেতাম। অবশ্য এ ব্যাপারটা তোমাকে কখনো আমি জানতে দিইনি। জানতে দেওয়াটা সম্ভব ছিল না। তুমি তা বুঝতে পারতে না। আমি নিডোও কি তা পেরেছিলাম? আমি কেবল বুঝতে পেরেছিলাম, একটি নিখুঁত বাস্তব সৌন্দর্যের মুখোমুখি আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি এবং পৃথিবীটা আমার চোখে অদ্ভুত সুন্দর হয়ে ফুটে উঠেছে। সম্ভবত এটাও আমি জানতাম যে এই যুক্তিহীন পূভায় বিপদ লুকিয়ে। রয়েছে–সেই বিপদটা হচ্ছে হারানোর, ঠিক যেমন বিপদ রয়েছে সেটিকে নিজস্ব করে ধরে রাখার মধ্যে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে গেল; তোমার মধ্যে নিজেকে আমি হারিয়ে। ফেললাম। বিশ্বের সমস্ত রোমান্টিক নায়কের বেশে তোমাকে আমি কল্পনা করে সাজিয়ে দিলাম। সমস্ত আর্টেরই শেষ করা তাই অবচেতন মনের সমস্ত সৌন্দর্য আর রসবোধকে রঙ-তুলি দিয়ে ক্যানভাসের ওপরে ধরে রাখা। একদিন এল, যে দিনটি আমার মতে বিপদজ্জনক, আমি তোমার ছবি আকতে মনস্থ করলাম–প্রাচীন মৃত যুগের রঙে নয়, তোমার আসল রঙো তুমি যা সেই ভাবে। এটাই শিল্পকলার বাস্তব রীতি। না, তোমার অপরুপ ব্যক্তিত্বের কোনো প্রভাব আমাকে এই কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল তা আমি জানিলে। কিন্তু এটা আমি জানি যে তোমার প্রতিকৃতি আঁকার সময় প্রতিটি রঙ আর তুলির আঁচড় আমার মনের গোপন রহস্যটি আমার কাছে প্রকাশ করে দিয়েছিল। পাছে অন্য লোকে আমার এই মূর্তিপূজার কথা জানতে পারে এই ভয়ে শঙ্কিত ছিলাম আমি। ডোরিয়েন, আমার মনে হয়েছিল প্রতিকৃতিটির মধ্যে আমার নিজস্ব সত্ত্বার অনেকখানি আমি ঢেলে দিয়েছিলেম। তখনই আমি ঠিক করে ফেলেছিলেম এ-ছবি কোনোদিনই আমি কোনো প্রদর্শনীতে পাঠাব না। তুমি কিছুটা বিরক্ত হয়েছিলে কিন্তু ছবিটা আমার কাছে কী জিনিস তা তুমি তখন। ডানতে না। হ্যারিকে বলেছিলেম। সে আমাকে উপহাস করেছিল। সেই উপহাসে আমি কিছু মনে করিনি। ছবিটি শেষ হওয়ার পরে যখন আমি একা সেটির কাছে বসে থাকতাম তখন। আমার মনে হত আমি ঠিকই করেছি। ছবিটি আমার স্টডিযও থেকে চলে যাওয়ার কয়েকদিন পরে আমার মোহ কেটে গেল। আমার মনে হল ছবিটির মধ্যে অপরূপ কিছুর সন্ধান পাওয়াটা আমার পক্ষে মূর্খতা হয়েছে; আমার কেবলই মনে হতে লাগল যে অপরূপ অঙ্গসৌষ্ঠভ ছাড়া। আর কিছু নেই তোমার। কেবল এইটুকু ভেবেই সান্ত্বনা পেলাম যে ছবি আঁকার ক্ষমতা আমার রয়েছে। এমন কি এখনো আমার মনে হয় যে কল্পনায় আমরা যা ভাবি তা কোনোদিন বাস্তবে রূপায়িত হয় না। আমাদের কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি অবাস্তব হচ্ছে আর্ট। আঙ্গিকটা আঙ্গিক সাডা আর কিছু নয়। আমার ধারণা, আট যতখানি আটিস্টকে লুকিয়ে রাখে ততটা প্রকাশ করে না। সেই জন্যে প্যারিস থেকে ছবি পাঠানোর যখন আমন্ত্রণ পেলাম তখনই আমি ঠিক করলাম ওই ছবিটাকেই আমি প্রদর্শনীতে পাঠাবা তুমি যে রাজি হবে না সে কথা আমি ভাবিনি। এখন বুজতে পারছি তুমিই ঠিক। প্রতিকৃতিটাকে লোকচহস্কৃতে প্রকাশ করা উচিত হবে না। আমি তোমাকে যা বলেছি তার জন্যে রাগ করো না ডোরিযেলা হ্যারিকে যা বলেছি তোমাকেও তাই বলছি–বিশ্বের পূভা পাওয়ার জন্যেই তোমার সৃষ্টি হয়েছে।
