দীর্ঘ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন ডোরিয়েন গ্রে। তাঁর দেহের স্বাভাবিক রঙ ফিরে এল; মুখের ওপরে ফুটে উঠল হাসি। যাক, বিপদটা কেটে গিয়েছে, আপাতত তিনি নিরাপদ। কিন্তু তবু ওই যে চিত্রকরটি তাঁর কাছে একটি স্বীকারোক্তি করলেন, তারই জন্যে বেসিলের ওপরে তাঁর বুড়ো মায়া হল। তাঁর ওপরেও কি তাঁর কোনো বন্ধুর এতখানি প্রভাব রয়েছে? প্রশ্নটা অবাক হয়েই ভাবতে লাগলেন তিনি। লর্ড হেনরির প্রভাবের মধ্যে মনোহারিত্ব রয়েছে এবং সেই প্রভাবটি নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক। কিন্তু তাঁকে নিয়ে দুর্ভাবনার কিছু নেই। সত্যিকার ভালোবাসা বলতে কিছু তাঁর ভেতরে নেই। মানুষের ওপরে অনাস্থাও তাঁর যথেষ্ট। এমন কেউ কি রয়েছে যে তাঁকে পূজা করে? ভাগ্য কি তাঁর জন্যে পূজার উপকরণ সাজিযে রেখেছে?
হলওয়ার্ড বললেন; ছবির ওপরে এই বিশেষ ডিজনিসটা যে তোমার চোখে পড়েছে তাতেই আমি খুব আশ্চর্য হচ্ছি, ডোরিয়েন। সত্যিই কি তুমি দেখতে পেয়েছ?
তিনি বললেন: দেখেছি। এমন একটা জিনিস দেখেছি যা আমাকে অবাক করে দিয়েছে।
যাই হোক, এখন ছবিটা একবার দেখতে দিতে নিশ্চয় তোমার আপত্তি নেই?
ডোরিয়েন মাথা নেড়ে বলেন: আর ওকথা নয়, বেসিল ছবিটার সামনে দাঁড়াতে তোমাকে আমি দেব না।
আজ না দাও, আর একদিন নিশ্চয় দেবে?
কোনোদিন দেব না।
হয়তো তুমি ঠিকই করছ। এখন আমি চলি ডোরিয়েন। আমার জীবনে একমাত্র তুমি এসেছ। যে আমার চিত্রকলাকে প্রভাবান্বিত করেছে। যত ভালো ছবি আমি এঁকেছি সেগুলির জন্যে তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তোমাকে আমি যা বললাম সেটা বলতে আমাকে কত খেসারৎ দিতে হয়েছে তা হয়তো তুমি জান না।
ডোরিয়েন বললেন: প্রিয় বেসিল, কীই ব মি আমাকে বলে? শুধু বলেছ, আমাকে তোমার খুব ভালো লাগে। শালীনতার দিক থেকে ওটা এমন একটা উঁচুদরের নয়।
ভদ্রতা দেখানোর জন্য ওকথা আমি বলিনি। ওটাই আমার স্বীকারোক্তি ওই স্বীকারোক্তি করার পরে মনে হচ্ছে আমি কিছু হারিয়ে ফেলেছি। পূজা করার কথাটা সম্ভবত মুখ ফুটে বলতে নেই।
এই স্বীকারোক্তি মানুষের মনে আশা জাগায় না বন্ধু।
তা ছাড়া আর কী তুমি আশা কর, ডোরিয়েন? ছবির মধ্যে আর কিছু তুমি দেখনি। দেখেছ কি? আরো কিছু দেখার জিনিস সেখানে রয়েছে?
না। আর কিছু নেই। একথা তুমি জিজ্ঞাসা করছ কেন? কিন্তু পূজার কথা বলো না। কথাটাই বোকার মতো। আমরা পরস্পরের বন্ধু বেসিল, চিরকাল আমরা বন্ধুই থাকব।
বিষণ্ণ সুরে চিত্রকর বললেন: বন্ধু হিসাবেই তুমি হ্যারিকে পেয়েছ।
ছোটো ছোটো হাসির ঢেউ-এ ভেঙে পড়ে, ডোরিয়েন বললেন: ও, হ্যারির কথা বলছ? অবিশ্বাস্য কথা বলে সে সারাদিন কাটায়, রাত্রিতে এমন সব কাজ করে যেগুলি অবাস্তব, আমিও ঠিক ওই রকম জীবনই যাপন করতে চাই। তবু আমার মনে হয়, বিপদে পড়লে। কোনোদিনই আমি হ্যারির কাছে যাব না; তার আগে যাব তোমার কাছে।
আবার তুমি আমার মডেল হবে?
অসম্ভব।
আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আমার চিত্রকরের জীবনটা তুমি নষ্ট করে দিলে, ডোরিয়েন। কোনো মানুষের জীবনে দু’বার আদর্শ আসে না; একবারই খুব কম মানুষই তার আদর্শের সংবাদ পায়।
কারণটা তোমাকে আমি বুঝিযে বলতে পারব না, বেসিল। কিন্তু তোমার ছবির মডেল হতে আর আমি পারব না। ছবিটার মধ্যে বিপজ্জনক কিছু রয়েছে। মনে হচ্ছে ছবিটা জীবন্ত। চল, তোমার সঙ্গে চা খাইগে। এ আলোচনা মধুরেণ সমাপয়েৎ করা যাক।
হলওয়ার্ড বললেন: তোমার দিক থেকে মধুরেণ হতে পারে। এখন চলি। ছবিটা যে আর তুমি আমাকে দেখতে দেবে না এই কথা শুনে দুঃখই পেয়েছি। কিন্তু উপায় নেই। ছবিটার সম্বন্ধে তোমার মনোভাব কী তা আমি বেশ বুঝতে পারছি।
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন হলওয়ার্ড। মনে-মনে হাসলেন ডোরিয়েন গ্রে। হতভাগ্য বেসিল। ছবিটা দেখতে না দেওয়ার আসল কারণটা তিনি জানতেই পারলেন না। আর কী আশ্চর্যের কথা, তাঁর নিজের রহস্য ফাঁস না করে কী অদ্ভুত উপাযেই না তিনি বেসিলের মনের গোপন কথাটি বার করে নিলেন চিত্রকরের হাস্যোদ্দীপক হিংসা, তাঁর উদ্দাম ভক্তি, অনাবশ্যক স্তুতি,–বেসিলের মনের অনেক অবচেতন মনের রহস্যই তিনি জানতে পারলেন। বেসিলের উন্যে দুঃখ হল তাঁর। রোমান্সের রঙে রঙিন বন্ধুত্বের মধ্যে কোথায় যেন একটা বিষাদের সুর লুকিয়ে রয়েছে বলে মনে হল তাঁরা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ‘বেল’ টিপলেন তিনি। যেমন করেই হোক প্রতিকৃতিটাকে সরিয়ে ফেলতে হবে। আর কেউ এটিকে দেখতে পারে এ-ঝুঁকি আর তিনি নিতে চাইলেন না। যে ঘরে তাঁর বন্ধুরা আসা-যাওয়া করেন সেই ঘরে ছবিটাকে এক ঘন্টার জন্যেও রাখাটা তাঁর। পাগলামি হয়েছে।
৩. চাকরটি ঘরে এসে ঢুকতে
দশম পরিচ্ছেদ
চাকরটি ঘরে এসে ঢুকতেই একদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। লোকটা কি পর্দার পেছনে আড়ি পেতে শুনছিল এতক্ষণ? লোকটির মুখের ওপরে কোনোরকম ভাবান্তর দেখা গেল না। সে নির্দেশের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। একটা সিগারেট ধরিয়ে আরশীর দিকে এগিয়ে গেলেন ডোরিয়েন। তাকিয়ে দেখলেন। ভিকটরের মুখটা বেশ সপষ্টই দেখা যাচ্ছিল আরশীর ওপরে। চাকরের মুখের মতনই সে মুখ নিবাত-নিষ্কম্পা ভয় করার মতো কিছু নেই সেখানে। তবু তাঁর মনে হল সাবধানে থাকাই ভালো।
