চিত্রকরকে অদ্ভুতভাবে বিচলিত হতে দেখা গেল। ছেলেটিকে তিনি বড়ো ভালোবাসতেন এবং তাঁর চিত্রকরের জীবনে ওই ছেলেটিই বিরাট একটি সাফল্য এনে দিয়েছে। তাকে বেশি। তিরস্কার করতে কেমন যেন কষ্ট হল তাঁর। তাছাড়া, জীবনের ওপরে তার যে বিরাট নৈরাশ্য দেখা দিয়েছে সেটা নিঃসন্দেহে সাময়িক কিছুণের ভেতরেই তার এই মনোভাব নষ্ট হয়ে যাবে। তার মধ্যে অনেক ভালো জিনিস রয়েছে, এমন অনেক কিছু রয়েছে যাদের মহতের পর্যায়ে ফেলা যায়।
শেষ পর্যন্ত একটা বিষণ্ণ হাসি হেসে তিনি বললেন: ঠিক আছে, ডোরিয়েন, আজকের পর এই ভয়াবহ ঘটনা নিয়ে আর কোনোদিনই আমি তোমার সঙ্গে আলোচনা করব না। আশা করি, এর মধ্যে তোমাকে কেউ ভজড়াবে না। আজ বিকেলেই হত্যার তদন্ত শুরু হবে তারা কি তোমাকে সাল্কী দেওয়ার জন্য ডেকেছে?
মাথা নাড়লেন ডোরিয়েন; তদন্ত কথাটা শুনে তাঁর মুখের ওপরে বিরক্তির রেখা ফুটে বেরোল; সেই রেখার মধ্যে ফুটে উঠল একটা রুক্ষ ভাব, একটা অশ্লীল অনুভাব। তিনি শুধু বললেন: তারা আমার নাম জানে না।
কিন্তু মেয়েটি নিশ্চয় জানত?
শুধু আমার খৃস্টান নামটাই সে জানত। আমি নিশ্চিত যে এ কথাটাও সে কাউকে বলেনি। সে। একবার আমাকে বলেছিল আমার আসল পরিচয় জানার জন্যে ওখানে অনেকেই বিশেষ কৌতূহলী ছিল। সে তাদের সবাইকেই বলেছিল আমার নাম “প্রিন্স চার্মিং”, ভালোই করেছিল। বেসিল, সাইবিলের একটা ছবি এঁকে দিও আমাকে। কয়েকটি চুম্বন, করুণ কয়েকটি ভাঙা-ভাঙা কথার স্মৃতি ছাড়া তার আরো কিছু আমি সঞ্চযের ঘরে জমা করে রাখতে চাই।
তুমি চাইলে কিছু করার চেষ্টা করব, ডোরিয়েন। কিন্তু তুমি এসে আবার আমার কাছে বস তোমাকে ছাড়া আমার চলবে না।
হঠাৎ চমকে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে ডোরিয়েন চিৎকার করে বললেন: না; আর আমি তোমার মডেল হতে পারব না–না, না; অসম্ভব।
চিত্রকর তাঁর দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন; কী পাগলের মতো কথা বলছ! তুমি কি বলতে চাও তোমার জন্যে আমি যা করেছি তা তোমার ভালো লাগেনি? দেখতে পাচ্ছি, ছবিটার সামনে তুমি একটা পর্দা ঝুলিয়ে দিয়েছা দেখতে দাও আমাকে আজ পর্যন্ত আমি যা এঁকেছি এটি তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। ডোরিয়েল, পর্দাটাকে সরিয়ে দাও। আমার ছবিকে এইভাবে ঢেকে রাখাটা তোমার চাকরদের খুব অন্যায় হয়েছে। ভেতরে ঢোকার সময় তোমার ঘরের চেহারাটাও যেন কেমন-কেমন লাগছে।
ওর সঙ্গে আমার চাকর-বাকরদের কোনো সম্পর্ক নেই, বেসিলা ভেব না, আমার ঘর কী ভাবে সাজানো হবে সে বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমি কোনো পরামর্শ করি না। এক কিছু ফুল সাজিয়ে রাখা ছাড়া আর কিছুতে হাত দেয় না তারা। না; ছবিটাকে আমিই ঢেকে রেখেছি। ছবিটার ওপরে বেশি আলো পড়ছিল।
বেশি আলো! নিশ্চয় নয়। এই জায়গাটাই ছবিটা রাখার সবচেয়ে ভালো জায়গা। দেখি ছবিটা।
এই বলে হলওয়ার্ড ঘরের সেই বিশেষ কোণটির দিকে এগিয়ে গেলেন।
একটা ভয়ার্ত আর্তনাদ ডোরিয়েনের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল। তিনি দৌড়ে ছবি আর চিত্রকরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন।
বিবর্ণ মুখে তিনি বললেন: বেসিল, ছবিটাকে তুমি দেখো না। আমি চাইলে তুমি দেখ।
হলওয়ার্ড হাসতে হাসতে বললেন: বল কী হে! আমার নিজের আঁকা ছবি আমি দেখব না? তুমি সিরিয়াস নও, কেন দেখব না?
আমার দিব্যি, যদি তুমি ছবিটা দেখ তাহলে জীবনে আর আমি তোমার সঙ্গে কথা বলব না। এদিক থেকে আমি তোমাকে খাঁটি কথাই বলছি। এর কোনো কৈফিয়ৎ তোমাকে আমি দেব না; তুমিও তা চেয়ো না। কিন্তু মনে রেখ, পর্দাটা একবার চুয়েছ কি আমাদের মধ্যে সব সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে।
বজ্রাহতের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন হলওয়ার্ড। অবাক বিস্ময়ে ডোরিয়েনের দিকে চেয়ে রইলেন তিনি। ডোরিয়েনের এই রকম মানসিক অবস্থার সঙ্গে তাঁর আগে কোনোদিন পরিচয় ছিল না। ডোরিয়েন সত্যি-সত্যিই রাগে টগবগ করে ফুটছিলেন। তাঁর হাত দুটি ছিল মুষ্টিবদ্ধ, দুটো চোখ আগুনের গোলার মতো বনবন করে ঘুরছিল। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আপাদমস্তক কাঁপছিলেন তিনি।
ডোরিয়েন!
কোনো কথা নয়।
কিন্তু ব্যাপারটা কী বল তো?
পিছু ঘুরে জানালার দিকে ফিরে যেতে-যেতে বেশ বিরক্তির সঙ্গেই তিনি বললেন, অবশ্য তোমার আপত্তি থাকলে আমি ছবিটা দেখব না। কিন্তু আমার নিজের হাতে আঁকা ছবিটা আমি দেখতে পাব না–ব্যাপারটা নেহাতই হাস্যকর, বিশেষ করে এই শরৎ কালে প্যারিসের চিত্র প্রদর্শনীতে ছবিটা যখন আমি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। পাঠানোর আগে সম্ভবত ছবিটার ওপরে আর এক পোঁচ রঙ বুলাতে হবে। সেইজন্যেই ছবিটা একবার আমার দেখা দরকার। আডকে দেখার আপত্তিটা কী?
এই ছবিটাকে তুমি প্রদর্শনীতে পাঠাবে!
চিৎকার করে উঠলেন ডোরিয়েন। একটা অদ্ভুত ভীতির ছায়া তাঁর সারা শরীরের ওপরে গুঁডি দিয়ে এগিয়ে আসতে লাগল। তাঁর জীবনের গোপন রহস্যটি সকলের কাছে দেখানো হবে? সারা বিশ্ব সেই রহস্যের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে? না না; সে অসম্ভব। ঠিক কী তাঁর করা উচিত তা তিনি বুঝতে পারলেন না বটে; কিন্তু এটা বুঝতে তাঁর অসুবিধে হল না যে একটা কিছু তাঁর করা দরকার এবং এখনই।
হ্যাঁ। আমার ধারণা তাতে তোমার কোনো আপত্তি হবে না। রু দ্য সিজের বিশেষ প্রদর্শনীতে দেখানোর জন্যে জর্জ পেটিন্ট আমার শ্রেষ্ঠ ছবিগুলিকে সংগ্রহ করছেন। প্রদর্শনীটা শুরু হচ্ছে অকটোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে। মাত্র একমাসের জন্য ছবিটা আমি নিয়ে যাব। আমার ধারণা, এই কটা দিন ছবিটাকে যদি সব সময় তুমি পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখ তাহলে ওর উপরে যত্ন নেওয়াও তোমার পক্ষে সম্ভব হবে না।
