লাল হয়ে উঠল ডোরিয়েনের মুখ, তিনি জানালার ধারে গিয়ে সূর্যকরোজ্জ্বল বাগানের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ; তারপরে বললেন: বেসল, হ্যারির কাছে আমি অনেক ঋণী; তোমার চেয়েও বেশি। তুমি আমাকে কেবল অনাবশ্যকভাবে দাম্ভিক হতে শিখিয়েছিলে।
সেই জন্যে আমি শাস্তি পেয়েছি, ডোরিয়েন-অথবা ভবিষ্যতে পাব।
ঘুরে দাঁড়িয়ে ডোরিয়েন বললেন: তোমার কথাটা আমার মাথায় ঢুকছে না বেসিলা তুমি কী চাও তাও আমি বুঝতে পারছি না। কী চাও বল তো?
দুঃখের সঙ্গে আর্টিস্ট বললেন, আমি চাই সেই ডোরিয়েন গ্রে-কে যার ছবি আমি এঁকেছি।
তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে এবং একটি হাত তাঁর কাঁধের ওপরে রেখে ডোরিয়েন বললেন: বড়ো দেরি হয়ে গিয়েছে বেসিল। গতকাল যখন আমি শুনলাম সাইবিল আত্মহত্যা করেছে…
তাঁর দিকে তাকিয়ে বিহ্বল নেত্রে হলওওযার্ড বললেন; আত্মহত্যা! হায় ভগবান! এ বিষয়ে আমারও কোনো সন্দেহ নেই।
প্রিয় বেসিল, এটা যে একটা নিছক দুর্ঘটনা তা নিশ্চয় তুমি মনে করনি। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আত্মহত্যাই সে করেছে।
বয়স্ক মানুষটি নিজের হাতের মধ্যে মুখটা ঢেকে বললেন: ওঃ, কী ভয়ানক!
দেহটা তাঁর কাঁপতে লাগল।
ডোরিয়েন গ্রে বললেন: না, না। ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই এতো এ-যুগের এটাই হচ্ছে একটি বড়ো রোমান্টিক ট্রাজিডি। যারা অভিনয় করে তারা সাধারণত সাধারণ ভাবেই বেঁচে থাকে। তাদের স্বামী থাকে, থাকে বিশ্বাসী স্ত্রী; জীবনটা তাদের একঘেয়ে, গতানুগতিকের বেড়া দিয়ে ঘেরা। আমি কী বলতে চাই তা নিশ্চয় তুমি বুঝতে পারছ? আমি বলতে চাই শ্রেণি আর । সাংস্কৃতির দিক থেকে তারা সবাই মধ্যবিত্ত ধর্ম, আচার-ব্যবহার–সব দিক থেকেই তাদের সঙ্গে সাইবিলের পার্থক্য কত। তার জীবনটাই হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দর, মধুর একটি ট্র্যাজিডি সব সময়েই সে নায়িকা। গত রাত্রিতে, অর্থাৎ তোমরা তাকে যেদিন দেখেছিলে–সে খুব। খারাপ অভিনয় করেছিল, কারণ সত্যিকার ভালোবাসা বলতে কী বোঝায় তা সে বুঝতে পেরেছিল। যখন সে বুঝতে পারল এটা কতখানি অবাস্তব তখনই সে মারা গেল। ঠিক এই ভাবেই জুলিয়েট মারা গিয়েছিল। সত্যিকার আর্টের জগতে প্রবেশ করল সে তার মত্যুর মধ্যে আমি কী দেখতে পাচ্ছি? দেখতে পাচ্ছি শহিদ হওয়ার কবুণ ব্যর্থতা, বিনষ্ট সৌন্দর্যের ব্যর্থতা। কিন্তু যা তোমাকে বলছিলাম, ভেব না যে আমি কম দুঃখ ভোগ করেছি। গতকাল যদি বিশেষ একটি মুহূর্তে তুমি এখানে আসতে–ধর সাড়ে পাঁচটা অথবা পৌনে ছটার। কাছাকাছি-তাহলে আমার চোখ ভরা জল তুমি দেখতে পেতে। হ্যারি-ই এই সংবাদটা নিয়ে আমার কাছে এসেছিল। খবরটা পেয়ে আমার মনের কী অবস্থা হয়েছিল এমন কি সেও তা। বুঝতে পারেনি। দুঃখ আর অনুশোচনায় সাময়িকভাবে ভেঙে পড়েছিলেম আমি। তারপরে সেই অবস্থাটা আমার কেটে গেল। সেই অনুভূতিকে আর আমি ফিরিয়ে আনতে পারব না; একমাত্র ভাবপ্রবণ মূর্খ ছাড়া কেউ তা পারে না। সেদিক থেকে, বেসিল, আমার ওপরে সত্যিই তুমি অবিচার করা আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে তুমি এখানে এসে খুব ভালো কথা। তুমি দেখলে আগেই আমি শান্ত হয়ে গিয়েছি। দেখেই তুমি ক্ষেপে উঠলো এই কি তোমার সহানুভূতির নমুনা? হ্যারি আমাকে একটা গল্প বলেছিল। তুমি আমাকে সেটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলে। গল্পটা হচ্ছে, একজন পরোপকারী ব্যক্তির একটি অন্যায়ের প্রতিকার করার। অ কোনো একটি আইনের ধারা পালটানোর জন্যে, ব্যাপারটা আমার ঠিক মনে নেই, তাঁর জীবনের কুড়িটি বছর তিনি নষ্ট করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর চেষ্টা সফল হয়েছিল; তার। পরেই কিন্তু তিনি নিরাশ হয়ে পড়লেন; আর কিছু করার ছিল না তাঁর; মনের এই বেকারত্ব সহ্য করতে পারলেন না তিনি। শেষ পর্যন্ত অপরের ক্ষতি করার উৎসাহে মেতে উঠলেন। তা ছাড়া প্রিয় বেসিল, তুমি যদি সত্যিই আমাকে সান্ত্বনা দিতে চাও তাহলে কেমন করে ওই তিক্ত ঘটনাটিকে আমি ভুলে যেতে পারি সেই পথটাই তুমি আমাকে বাতলিয়ে দাও; অথবা, কেমন করে সমস্ত জিনিসটাকে আমি আর্টিস্টের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখতে পারি সেই উপদেশই আমাকে দাও। সেদিন মারলো হোটেলে একটি যুবকের সঙ্গে তুমি আলাপ করিয়ে দিয়েছিলে তিনি সেদিন কথায়-কথায় বলেছিলেন জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট পীতাভ মাটিন ভুলিয়ে দিতে। পারে। আমি অবশ্য সে-মতে বিশ্বাসী নই। আমি সুন্দর জিনিস ভালোবাসি; সুন্দর আর। বাস্তব–যেগুলিকে আমি স্পর্শ করতে পারি। পুরনো ব্রোকেড, সবুজ ব্রোঞ্জের জিনিস, ল্যাকারের কাজ, খোদাই করা হাতির দাঁত, সুন্দর পারিপার্শ্ব, প্রাচুর্য, উচ্ছ্বাস, আর আনন্দ–এদের সকলের কাছ থেকেই কিছু না কিছু পাওয়ার রয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে যে আর্টিস্টিক মানসিকতা রয়েছে, অথবা, যে আটিস্টিক রুচি তারা প্রকাশ করে, আমার বেশি আকর্ষণ সেই দিকে হ্যারির মতে নিজের জীবনটাকে মানুষ যদি দর্শকের ভূমিকা থেকে দেখতে পারে তাহলেই সে নিজের জীবনের দুঃখ ভুলে যায়।
কেমন করে আমি হঠাৎ বড়ো হয়ে উঠলাম তা তুমি জান না। তুমি যখন আমায় চিনতে তখন আমি ছিলাম স্কুলের ছাত্রএখন আমি পূর্ণাঙ্গ মানুষ। কিন্তু তার জন্যে আমাকে তুমি কম পছন্দ করতে পারবে না। আমি এখন অন্য জাতের আমার ভাবনা নতুন, চিন্তা নতুন, আদর্শ নতুন। এক কথায় খোলনলচে আমার পালটিযে গিয়েছে। পরিবর্তন আমার যে হয়েছে সেটা ঠিকই কিন্তু তুমি সব সময়েই আমার বন্ধু থাকবে-ঠিক আগের মতনই। অবশ্য। হ্যারিকে আমার খুবই ভালো লাগে। কিন্তু বন্ধু হিসাবে হ্যারির চেয়ে তুমি অনেক উঁচু স্তরের শক্তির দিক থেকে তার মতো সবল তুমি নও, জীবনটাকে বেশি ভয় কর তুমি কিন্তু তুমি। তার চেয়েও উঁচু মনের। আমরা দুজনে কী সুখেই না ছিলাম। বেসিল, আমাকে তুমি পরিত্যাগ করো না; আমার সঙ্গে ঝগড়া করো না তুমি এখন আমাকে যা তুমি দেখছ, আমি তাই। এছাড়া আর কিছু আমার বলার নেই।
