কারণ এটিকে লক্ষ করার মধ্যেই তো আসল আনন্দ লুকিয়ে রয়েছে। একেই অনুসরণ করে তিনি তাঁর মনের গভীরে লুকানো অনেক কিছুই জানতে পারবেন। ঐন্দ্রজালিক আরশীর মতো ছবিটি তাঁকে সাহায্য করবে। এটি যেমন তাঁর দেহটাকে ফুটিয়ে তুলেছে, তেমনি প্রকাশ করে দেবে তাঁর আত্মাটিকে। এবং যখন ওর ওপরে শৈত্যের জড়তা এসে দেখা দেবে তখনো তাঁর দেহের ওপরে বসন্তের হিল্লোল থাকবে জেগে। যখন ওর মুখের ওপর থেকে রক্ত শুকিয়ে যাবে, যখন ওর চোখ দুটি তাদের জ্যোতি হারিয়ে কোটরের মধ্যে আশ্রয় নেবে তখনো তিনি ভরা যৌবনের জোয়ারে ভেসে বেড়াবেন। তাঁর সৌন্দর্যের একটি কণাও নষ্ট হবে না; তাঁর ধমনীর একটি সম্পন্দনও গতিহীন হবে না; গ্রীক দেবতাদের মতো তিনি শক্তিবান হয়ে থাকবেন, গতি আর আনন্দের আমেজে থাকবেন মেতো ক্যানভাসের ওপরে আঁকা ওই রঙিন প্রতিকৃতিটার কী হবে তাতে তাঁর কী আসে যায়? তিনি তো নিরাপদে থাকবেন। এ-ছাড়া, আর কিছু ভাববার নেই তার।
হাসতে-হাসতে ভারী পর্দাটা আবার তিনি প্রতিকৃতির মুখের ওপরে টেনে নিলেন; তারপরে, শোওয়ার ঘরে ঢুকলেন। সেইখানে তাঁর পরিচারক ভিকটর তাঁরই জন্যে অপেষ্কা করছিল। এক ঘন্টা পরে তিনি অপেরাতে হাজির হলেন; লর্ড হেনরি তাঁর চেয়ারের ওপরে ঝুঁকে বসেছিলেন।
.
নবম পরিচ্ছেদ
পরের দিন সকালে-সকালে তিনি বসে-বসে প্রভাতকালীন ডালযোগ করছিলেন এমন সময় বেসিল হলওয়ার্ড ঘরের মধ্যে এসে ঢুকলেন। ঢুকেই গম্ভীরভাবে বললেন: তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে খুব খুশি হয়েছি, ডোরিয়েন। কাল রাত্রিতে এসে শুনলাম তুমি অপেরাতে গিয়ে। অবশ্য আমি জানতাম কথাটা সত্যি নয় তবু তুমি ঠিক কোথায় গিয়েছ সে-সম্বন্ধে যদি সপষ্ট ভাবে। বলে যেতে তাহলে আমি নিশ্চিন্ত হতাম। আর একটা বিপদ ঘটতে পারে এই আশঙ্কায় কাল সন্ধেটা আমার খুব খারাপ গিয়েছিল। সংবাদটা প্রথম পাওয়ার পরে আমাকে তোমার টেলিগ্রাফ করা উচিত ছিল। ক্লাবে ‘গ্লোব’ কাগজের শেষ সংস্করণটার ওপরে চোখ বুলোতে-বুলোতে হঠাৎ সংবাদটা আমার নজরে পড়ে গেল। সংবাদটা পড়েই আমি এখানে। ছুটে এসেছিলেম। তোমাকে না পেয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছিলাম। সমস্ত ঘটনাটা পড়ে আমি যে কত কষ্ট পেযেছিলেম তা আর তোমাকে কী বলব? আমি জানি নিশ্চয় তোমার কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু তুমি কোথায় গিয়েছিলে? তুমি কি মেয়েটির মায়ের সঙ্গে দেখা করতে তাদের। বাড়ি গিয়েছিলে? একবার ভাবলাম সেই দিকে আমিও এগিয়ে যাই। কাগজেই তাদের বাড়ির ঠিকানাটা দেওয়া ছিল। এসটোন রোডের কাছাকাছি একটা জায়গা, তাই না? কিন্তু যে দুঃখকে আমি এতটুকু কমাতে পারব না সেখানে অনাবশ্যক যেতে আমার কেমন সঙ্কোচ লাগছিল। হতভাগিনী নারী! নিশ্চয় তাঁর মনের অবস্থা খুব খারাপ। ওই তাঁর একমাত্র সন্তান। এ বিষয়ে তিনি কী বললেন?
ভেনিশিয়াল গ্লাস থেকে ফিকে বেগলে রঙের মদ চাকতে-চাকতে ডোরিয়েন আস্তে আস্তে বললেন: প্রিয় বেসিল, তা জানব কেমন করে?
তারপর অত্যন্ত ক্লান্ত স্বরে বললেন: আমি অপেরাতেই গিয়েছিলেম। তোমারও সেখানে যাওয়া। উচিত ছিল। কালই প্রথম হেনরির বোন লেডি গিনদোলেন-এর সঙ্গে আমার পরিচয় হল, আমরা দুজনে একটা বকস-এ বসেছিলেম। ভদ্রমহিলা সত্যিকার সুন্দরী। প্যাটিও অদ্ভুত সুন্দর গান গাইলেন। ভয়ানক ঘটনা নিয়ে আর আলোচনা করো না। কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা না করলেই সেটা যে সত্যিই ঘটেছে তা আমাদের মনে হবে না। হ্যারি বলে, আলোচনা করলেই যে-কোনো জিনিসই বাস্তব হয়ে দাঁড়ায়। আমি কেবল তোমাকে এইটুকুই জানাতে পারি যে ভদ্রমহিলার ওই একমাত্র সন্তান নয়। একটি ছেলেও রয়েছে। সেটি-ও বড়ো চমৎকার ছেলে কিন্তু সে অভিনয় করে না। পেশার দিক থেকে সে নাবিক বা ওই জাতীয় কিছু একটা হবে। এখন তোমার কথা, আর বর্তমানে তুমি কী আকছ তাই আমাকে বল।
ধীরে-ধীরে এবং বেদনার্ত স্বরে হলওয়ার্ড বললেন: অপেরাতে গিয়েছিলে? একটা নোংরা ঘরে সাইবিল ভেনের মৃতদহটা যখন পড়েছিল তখন তুমি বসেছিলে অপেরাতে! যে মেয়েটিকে তুমি ভালোবাসতে সেই মেয়েটিকে নির্বিঘ্নে কবরস্থ করার আগেই অন্য মহিলারা যে কত। সুন্দরী, প্যাটি যে কেমন স্বর্গীয় গান গাইলেন সেই সব কথা আমাকে তুমি বলতে পারলে? তুমি কি জান না, সাইবিলের শ্বেতশুভ্র সেই শরীরটা নিয়ে এখনো অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে?
চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে উঠলেন ডোরিয়েন: বেসিল, চুপ কর, চুপ কর! ওসব কথা শুনতে চাই লে। আমাকে ওসব কথা তুমি বলো না। যা হয়েছে তা হয়ে গিয়েছে। যা অতীত তা অতীতেই মিলিয়ে যাক।
গতকাল যা ঘটেছে তাকে তুমি অতীতে বলতে চাও?
ঘন্টা-মিনিট ধরে সময়ের প্রকৃতি ঠিক করা যায় না; যারা মূর্খ, মনের নদীতে যাদের চড়া পড়ে গিয়েছে, বিশেষ কোনো অনুভূতিকে ভুলে যেতে তাদেরই অনেক বছর সময় লাগে। নিজের প্রবৃত্তিগুলিকে যে আয়ত্তে রাখতে পেরেছে সে যেমন অতি সহজে নতুন আনন্দের আয়োজন। করতে পারে তেমনি সহজে ভুলে যেতে পারে দুঃখ প্রবৃত্তির দাস হতে আমি রাজি নই। আমি চাই তাদের খাটাতে, আনন্দ পেতে এবং তাদের ওপরে প্রভুত্ব করতো।
ডোরিয়েন, তুমি যে কথা বলছ সেগুলি নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক। এমন কিছু ঘটেছে যা তোমার চরিত্রকে একেবারে পালটিয়ে দিয়েছে। যে অদ্ভুত সুন্দর ছেলেটি দিনের পর দিন আমার স্টুডিযোতে এসে বসে থাকত, এখনো বাইরে থেকে সেইরকমই সুন্দর তুমি দেখতে। কিন্তু তখন তুমি ছিলে সাদামাঠা, স্বাভাবিক এবং স্নেহশীল। সারা দুনিয়ায় তোমার মতো নিষ্পাপ মানুষ আমার চোখে আর পড়েনি। কিন্তু এ কী কথা শুনছি! জানি না, কী হল তোমার। তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে হৃদ্য বলতে কোনো পদার্থ তোমার নেই। নেই কোনো দয়া, মায়া, অনুভূতি। বেশ বুঝতে পারছি, হ্যারির প্রভাব তোমার ওপরে পড়েছে।
