হ্যারি, তোমার সঙ্গে বরং আমি অপেরাতেই দেখা করব। বড়ো ক্লান্ত আমি, খাবার বিশেষ ইচ্ছে নেই আমার। তোমার বোনের ‘বকস’ নম্বরটা কত?
সম্ভবত সাতাশা গ্রালড টায়ার-এর ওপরে তার বকস। দরজার ওপর তার নাম লেখা থাকবে। কিন্তু আমার সঙ্গে বেরোতে আর ডিনার খেতে পারছ না বলে সত্যিই আমি দুঃখিত।
ডোরিয়েন ক্লান্তভাবে বললেন, ইচ্ছে করছে না। কিন্তু তুমি আমাকে যা বললে তার জন্যে আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। নিঃসন্দেহে তুমি আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু তোমার মতো আজ পর্যন্ত আর কেউ আমাকে বুঝতে পারেনি।
তাঁর সঙ্গে করমর্দন করে লর্ড হেনরি বললেন: ডোরিয়েন, আমাদের বন্ধুত্ব সবে শুরু হয়েছে। বিদায়। আশা করি, রাত্রি সাড়ে নটার আগেই তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে। মনে রেখ, প্যাটি আজ গান করছেন।
ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন লর্ড হেনরি। দরজাটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ডোরিয়েন বেল টিপলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভিকটর একটা বাতি নিয়ে ঘরে ঢুকল, তারপরে ঘরের। পর্দাগুলি সব নামিয়ে দিল। ভিকটরের চলে যাওয়ার জন্যে অস্থিরভাবে তিনি অপো করতে লাগলেন। সব কাজেই লোকটা কেমন যেন মাঠো।
লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে তিনি পর্দার দিকে দৌড়ে গেলেন; তারপরে একপাশে টেনে দিলেন সেটি। না, ছবির ওপরে আর কোনো পরিবর্তনের চাপ পড়েনি। তাঁর আগেই সাইবিল ভেনের মৃত্যসংবাদ ও জানতে পেরেছে। জীবনের ঘটনাগুলি কী ভাবে ঘটছে সে বিষয়ে ও সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। ঠিক যে-সময়ে সাইবিল বিষ অথবা ওই জাতীয় কিছু খেয়েছিল ঠিক সেই সময়ের নিষ্ঠুরতার সেই বিশেষ ছাপটি ওর মুখের ওপরে পড়েছিল। অথবা ফলাফলের বিষয়ে ও সম্পূর্ণ উদাসীন? আত্মার ভিতরে যা ঘটে ও কি কেবল সেইটুকুই গ্রাহ্য করে? তিনি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন হয়তো একদিন তিনি চোখের ওপরেই ওর ওপরে পরিবর্তন দেখতে পাবেন; সেই সম্ভাবনায় তিনি ভয়ে পিছিয়ে এলেন।
হতভাগিনী সাইবিল! তাঁদের দুজনের মধ্যে কী অদ্ভুত রোমান্সই না গড়ে উঠেছিল! স্টেডের ওপরে প্রায়ই সে মৃতের অনুকরণ করত। তারপরে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুই তাকে ছুঁয়ে গেল, সঙ্গে করে নিয়ে গেল তাকে। তার জীবননাট্যের সেই ভয়ঙ্কর শেষ দৃশ্যটি সে কী ভাবে অভিনয় করল? মৃত্যুর সময় সে কি তাঁকে অভিশাপ দিয়েছে? না; তাঁর প্রতি ভালোবাসা নিয়েই সে মৃত্যুবরণ করেছে এবং এখন থেকে ভালোবাসা তাঁর কাছে পবিত্র জিনিস ছাড়া আর কিছু নয়। নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে সে সব কিছুর জন্যে প্রাঘশ্চিত্ত করে গিয়েছে। থিয়েটারে সেই বীভৎস রাত্রিটিতে তার জন্যে তিনি কত কষ্ট পেয়েছেন সে-সব কথা আর তিনি মনে রাখবেন না। তার কথা যখন তিনি চিন্তা করবেন তখন মনে হবে একটি নির্ভেজাল প্রেমের প্রতীক করে ভগবান তাকে সংসার রঙ্গমঞ্চে পাঠিয়ে দিয়েছেন, সেই প্রতীকটি সম্পূর্ণভাবে ট্রাডিক। মেয়েটির শিশুর মতো সরল চাহলি, তার চিত্তাকর্ষক রোমান্টিক চালচলন আর ভীরু লাবণ্যের কথা মনে হতেই তাঁর চোখ দুটি ভলে ভরে উঠল। সেই জল তাড়াতাড়ি মুছে ফেলে তিনি ছবির দিকে আবার তাকিয়ে দেখলেন।
তাঁর মনে হল এখন থেকে তাঁর চলার পথটা তাঁকেই ঠিক করে ফেলতে হবে। অথবা তা কি আগেই ঠিক হয়ে গিয়েছে? হ্যাঁ, ভীবনই তা ঠিক করে দিয়েছে জীবন, আর জীবন সম্বন্ধে তাঁর অনন্ত কৌতূহল। অনন্ত যৌবন, অনন্ত কামনা, ইঙ্গিতময় এবং গোপন আনন্দ, উদ্যম, উদামতর পাপ–এই সব কটির সঙ্গে মোলাকাৎ করতে হবে তাঁকে। তাঁর লজ্জা আর। অপমানের সমস্ত জ্বালা আর যন্ত্রণা বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ছবিটিকে। এ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারেননি তিনি।
ক্যানভাসের ওপরে আঁকা ছবিটির সুন্দর মুখের ওপরে ভবিষ্যতে যে কলঙ্করেখাগুলি পড়ে সেটিকে হতবিষ্কত করে তুলবে একথা ভাবতে গিয়েই তিনি আতঙ্কিত হলেন। একবার নার্সিসাসকে ব্যঙ্গ করার শিশু-চাপল্যে যে ঠোঁট দুটি তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসছিল সেই ঠোঁট দুটিকে তিনি চুম্বন করলেন, অথবা চুম্বন করার ভান করলেন। অনেকদিন প্রভাতে এই ছবিটির দিকে তাকিয়ে তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে থাকতেন। এখন থেকে তাঁর প্রতিটি কাজের প্রতীক চিহ্ন হিসাবে কি ছবিটির পরিবর্তন হবে? এই ছবিটা কি শেষ পর্যন্ত দানবীর আর সেই সঙ্গে ঘৃণ্য হয়ে দাঁড়াবে? শেষ পর্যন্ত কি ছবিটিকে সূর্যকিরণ থেকে সরিয়ে ঘরের মধ্যে বন্ধ করে রাখতে হবে? হায়রে, কী দুর্ভাগ্য, কী দুর্ভাগ্য।
ছবি আর তাঁর মধ্যে যে ভয়ানক একটি আত্মিক সংযোগ দেখা দিয়েছে সেটি ছিঁড়ে ফেলার জন্যে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করার কথা একবার তিনি চিন্তা করলেন। প্রার্থনা করার ফলে ছবিটির ওপরে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। সম্ভবত সেই প্রার্থনার ফলেই ছবিটি আর ভোল পালটাবে না। কিন্তু তবু যতই আজগুবি হোক, অথবা যত ভয়ানক পরিণতিই আসুক, জীবন। সম্বন্ধে এতটুকু জ্ঞান আছে এমন মানুষ কে রয়েছে যে চির যৌবন ভোগ করার সুযোগ ছাড়তে পারে? তা ছাড়া, ছবির প্রতিটি নিয়ন্ত্রিত করার সত্যিই কি কোনো ক্ষমতা রয়েছে তাঁর? প্রার্থনা করার জন্যেই কি ছবিটি তার প্রথম পরিবর্তনকে বর্জন করেছে? এর পেছনে কি অদ্ভুত কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ নেই? জীবজগতের ওপরে চিন্তার যদি কোনো প্রভাব থাকে, তাহলে মৃত আর জডের ওপরেও কি তা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না? অর্থাৎ, গভীরভাবে চিন্তা। অথবা কামনা করলে বাইরের কোনো বস্তু কি আমাদের মনের গভীরে নিহিত বাসনা-কামনার অজস্র সম্পন্দনের মধ্যে তার অণু-পরমাণুগুলিকে সমান তালে নাচাতে পারে না? কিন্তু কারণটা নিয়ে চুলচেরা বিচার করার প্রয়োজন নেই তাঁর। আর কখনো ভয়ঙ্কর কোনো শক্তির কাছে তিনি প্রার্থনা জানাবেন না, প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা করবেন না। প্রতিকৃতিটা যদি তার মর্জিমতো রঙ বদলায় তো বদলাক। তাঁর কিছু করার নেই। অত খুঁটিয়ে দেখে লাভ কী?
