অনেকক্ষণ নিজের মনে-মনে বিড়বিড় করতে-করতে ডোরিয়েন গ্রে বললেন: সুতরাং সাইবিল ভেনকে আমি খুন করলাম। তার ছোটো কণ্ঠটি ছুরি দিয়ে কেটে ফেলার মতন করেই তাকে আমি হত্যা করে ফেললাম। তবুও গোলাপ ফুলকে এখনো আমরা কম ভালোবাসছিনে। আমার বাগানে পাখিরা এখনো সেই আগের মতোই মিষ্টি সুরে গান করছে এবং আজ রাত্রিতে তোমরা সঙ্গে আমি ডিনার খেতে চলেছি, সেখান থেকে যাব অপেরাতে অপেরা। ভাঙলে আর কোনো জায়গায় খেতে যাব। জীবন কি অসম্ভব রকমেরই না নাটকীয। হ্যারি, এই কাহিনি কোনো বই-এ পড়লে নিশ্চয় আমি কাঁদতাম। যে-কোনো কারণেই হোক ঘটনাটি সত্যি-সত্যি ঘটেছে বলেই, অথবা, আমাকে কেন্দ্র করে ঘটেছে বলেই হয়তো চোখের জল ফেলার চেয়েও অনেক বেশি চমৎকার বলে মনে হচ্ছে। জীবনে এই প্রথম আমি একটি উজ্জ্বল প্রেমপত্র লিখেছিলাম সত্যিই এটা একটা আশ্চর্যের ব্যাপার যে আমার প্রথম প্রেমপত্র একটি মৃতা প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করে লেখা। আমি অবাক হয়ে ভাবি, ওই শ্বেত পোশাক পরা। মানুষগুলি, যাদের আমরা মৃত বলি, তাদের কি অনুভব করার শক্তি রয়েছে? সাইবিল সে কি অনুভব করতে পারে, জানতে পারে, শুনতে পায়? হায হ্যারি, তাকে আমি কত ভালবাসতাম! মনে হচ্ছে সে যেন কত বছর আগেকার কথা। আমার সমস্ত মন আর প্রাণ। জুড়ে বসেছিল সে। তারপরে সেই ভয়ঙ্কর রাত্রিটি হাজির হল। সেটই কি সত্যিই গত রাত্রি? সে খারাপ অভিনয় করল; সেই দেখে আমার হৃদয় গেল ভেঙো খারাপ অভিনয় সে কেন করেছিল সে-কথা সে আমাকে বুঝিয়ে বলেছিল। কী করুণ সেই দৃশ্য! কিন্তু আমার হৃদয় তাতে একবিন্দু-ও গলেনি। আমি ধরে নিয়েছিলাম অভিনয় করার ক্ষমতা তার নেই। অকস্মাৎ এমন একটা ঘটনা ঘটল যে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কী যে ঘটল তা ঠিক জানি নে, কিন্তু এটা। বুঝতে আমার অসুবিধে হয়নি যে সেটি ভয়ঙ্কর। আমি বললাম তার কাছে আমি ফিরে যাব। আমি বুঝতে পারলাম তার ওপরে আমি অন্যায় করেছি এবং এখন সে মৃত। ভগবান, এখন। আমি কী করব? তুমি জান না কী বিপদে আমি পড়েছি। নিজেকে শক্তি করে ধরে রাখার মতো অন্য কোনো অবলম্বন আমার নেই। আমাকে একমাত্র সেই ধরে রাখতে পারত। আত্মহত্যা করার কোনো অধিকার তার ছিল না। সে নিতান্ত স্বার্থপরের মতো কাজ করেছে।
সিগারেটের বক্স থেকে একটা সিগারেট বার করলেন লর্ড হেনরি, সোনালি দেশলাই-এর খোল থেকে কাঠি বের করে সেটি ধরালেন, তারপরে বললেন: প্রিয় ডোরিয়েন, পুরুষকে সৎপথে আনার একটি কৌশলই নারীদের জানা রয়েছে, সেটি হচ্ছে তাদের তিতিবিরক্ত করে তোলা; তাতেই বাঁচার সমস্ত আকাঙ্খা পুরুষদের নষ্ট হয়ে যায়। এই মেয়েটিকে বিয়ে করলে নিজেকে তুমি হতভাগ্য বলে মনে করতে। অবশ্য তার সঙ্গে তুমি সদ্য ব্যবহার করতে পারতে। কিন্তু করা সঙ্গে মানুষ সদ্য ব্যবহার করে জান? যার ওপরে তার বিন্দুমাত্র দরদ নেই। কিন্তু মেয়েটির বুঝতে দেরি হত না যে তুমি তার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন। কোনো মহিলা যদি বুঝতে পারে যে তার স্বামী তার প্রতি উদাসীন তাহলে সে কী করে বল তো? হয় সে ভয়ঙ্কর রকমের কদর্য হয়ে যায়, নতুবা, সে এমন জাঁকালো পোশাক পরে ঘুরে বেড়ায় যার খরচ অন্য মহিলাদের স্বামীদের যোগান দিতে হয়। সামাজিক ভুল নর কথা আমি অবশ্য এখানে তুলছিনে-কারণগুলি মানুষের নীচতা প্রকাশ করে, এবং ওগুলিকে। কোনোদিনই আমি হমার চোখে দেখতে পারিনে; কিন্তু একটা বিষয়ে আমি তোমাকে নিশ্চিন্ত করতে পারি যে বিয়ে করলে তোমার সারা জীবনটা ব্যর্থ হয়ে যেত।
ঘরের মধ্যে বিবর্ণ মুখে পায়চারি করতে-করতে ডোরিয়েন বললেন: সম্ভবত, তোমার কথাই ঠিক। কিন্তু ভেবেছিলেম এটাই আমার কর্তব্য। এই ভয়ঙ্কর মৃত্যু যে আমার সেই কর্তব্যের পথে বাধার সৃষ্টি করল তার জন্যে আমার কোনো অপরাধ নেই। আমার মনে রয়েছে তুমি একবার বলেছিলে সমস্ত সৎ পরিকল্পনার মধ্যেই কোথায় যেন ধ্বংসের একটা উপকরণ লুকিয়ে রয়েছে। তুমি আরো বলেছিলে সৎ প্রচেষ্টাগুলিকে কার্যকরী করতে আমাদের অনেক দেরি হয়ে যায়। আমার পক্ষে সেটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
সৎ সংকল্পগুলি সব সময় বৈজ্ঞানিক নীতির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার ব্যর্থ চেষ্টা করে। তাদের উৎসই হচ্ছে নির্ভেজাল দাম্ভিকতা। সেইজন্যে আমদানির ঘরটা তাদের একেবারে শূন্য থাকে। মাঝে-মাঝে তারা অবশ্য কিছু দান করে; সেগুলি হচ্ছে বন্ধ্যা উচ্ছ্বাসের প্রাচুর্য। সেই দেখে দুর্বলরা কখনো কখনো যে মুগ্ধ হয় সেকথা মিথ্যা নয়। এছাড়া সৎ সংকল্পের পহে আর কিছুই বিশেষ বলার নেই। ব্যাঙ্কে টাকা না থাকা সত্ত্বেও চেক কাটলে ব্যাপারটা যে রকম দাঁড়ায় এও অনেকটা সেই জাতীয় ব্যাপার।
লর্ড হেনরির কাছে এসে পাশে বসলেন ডোরিয়েন; তারপরে বললেন, হ্যারি, বলতে পার। দুঃখটাকে যতটা গভীরভাবে আমি অনুভব করতে চাই ততটা অনুভব করতে পারছিনে কেন? আমি যে হৃদয়হীন সেকথা তো আমার মনে হয় না। তোমার কী মনে হয়?
মিষ্টি সুরে এবং বিষণ্ণ হাসি হেসে লর্ড হেনরি বললেন: বিগত পনেরোটি দিন ধরে তুমি এত বোকার মতো কাজ করে যার ফলে ওই বিশ্লেষণটি অর্জন করার যোগ্যতা তোমার হয়নি।
ভ্রূকুটি করে ডোরিয়েন বললেন: হ্যারি, তোমার বিশ্লেষণটা আমার ভালো লাগছে না; কিন্তু আমি নির্মম নই একথাটা যে তুমি স্বীকার করে এতেই আমি খুশি। সত্যিই আমি নির্মম নই। আমি তা জানি। তবু আমি স্বীকার করতে বাধ্য যে যতটা আঘাত করা উচিত ছিল দুর্ঘটনাটি ততখানি আঘাত আমাকে করেনি। মনে হচ্ছে একটি অপরূপ সুন্দর নাটকের একটি অপরূপ সুন্দর সমাপ্তি ঘটেছে। গ্রীক ট্র্যাজিডির সব কিছু ভয়াল সৌন্দর্যই এখানে রয়েছে; মনে হচ্ছে, সেই নাটকে অনেকটা প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে আমাকে অথচ, একটুকুও আহত হইনি আমি।
