যুবকটির অবচেতন মনের দাম্ভিকতা নিয়ে খেলা করতে বেশ মজা লাগল লর্ড হেনরির; তিনি বললেন: সমস্যাটা কৌতূহলোদ্দীপক, সন্দেহ নেই, সত্যিই বড়ো কৌতূহলোদ্দীপক। আমার ধারণা তুমি যে প্রশ্নটি রেখেছ তার যে প্রশ্নটি রেখে তার আসল উত্তর হচ্ছে এই জীবনের সত্যিকারের ট্রাজিডিগুলি প্রায়ই এমন অশিল্পীসুলভ প্রক্রিয়ায় ঘটে যে তাদের নগ্নতায় আমরা আহত হই, আহত হই তাদের সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যহীনতায়, তাদের হাস্যকর অর্থহীনতায এবং আঘাত করার অসুন্দর আঙ্গিকে। অশ্লীলতা যেভাবে আমাদের আঘাত করে ঠিক সেইভাবেই আঘাত করে এই ট্রাজিডিগুলি। তাদের সেই আক্রমণে পশুশক্তির গন্ধ পাই বলেই আমরা তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করি। মাঝে-মাঝে অবশ্য অতি সুন্দর ভাবেই আমাদের জীবনে ট্র্যাজিডি দেখা দেয়; এই সৌন্দর্যের অবদানগুলি বাস্তব হলে তারা আমাদের নাটকীয় অনুভূতিগুলিকে স্পর্শ করে। হঠাৎ আমাদের মনে হয় আমরা আর অভিনেতা নয়, দর্শকমাত্র। অথবা, আমরা দুইই। নিজেদের লক্ষ করি আমরা এবং দৃশ্যাবলির চমৎকারিত্ব আমাদের দাসত্বে পরিণত করে, অর্থাৎ একেবারে সম্মোহিত করে ফেলে আমাদের। বর্তমান ক্ষেত্রে আসল ঘটনাটা কী বল তো? তোমার ভালোবাসা হারানোর ভয়ে একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। এরকম একটা অভিজ্ঞতা আমার হলে খুব খুশি হতাম। তাহলে আমার বাকি জীবনটার সঙ্গে আমি নিজেই প্রেমে পড়ে যেতাম। যারা আমাকে ভালোবাসত, আমার সঙ্গে মেলামেশা না করলে যারা অস্থির হয়ে উঠত–যদিও তাদের সংখ্যা খুব একটা বেশি নয–সামান্য তাদের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক আমি ছিন্ন করার পরেও, অথবা, আমার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক তারা শেষ করে দেওয়ার পরেও অনেকদিন তারা বেঁচে রয়েছে, আত্মহত্যা অথবা আত্মনির্যাতনের কথা তারা কল্পনাও করেনি। তাদের স্বাস্থ্য ফিরেছে–একঘেয়েমি বেড়েছে তাদের। হঠাৎ দেখা হলে তারা সেই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে শুরু করেছে। নারীদের স্মৃতিশক্তি কি ভয়ানক! কি ভয়ঙ্কর! চিন্তার জগতে তারা একেবারে স্থবির। জীবনের সৌন্দর্যে মানুষের ডুবে থাকা উচিত, জীবনের খুঁটিনাটি নিয়ে মেতে থাকা উচিত নয়। খুঁটিনাটি সবসময়েই অশ্লীল।
ডোরিয়েন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন: আমার বাগানে পপি বুনতেই হবে।
লর্ড হেনরি বললেন: কোনো প্রয়োজন নেই। জীবনের হাতে সব সময়েই পপি অর্থাৎ আফিও রয়েছে। মাঝে-মাঝে অবশ্য কিছু স্মৃতি বেশিদিন ধরে বেঁচে থাকে। একটি রোমান্সের মৃত্যু না হওয়ায় শিল্পীসুলভ দুঃখ প্রকাশ করার জন্যে পুরো একটা ঋতু ধরে ভায়লেট ছাড়া অন্য কোনো ফুলই আমি ব্যবহার করিনি। শেষ পর্যন্ত সেই রোমান্সের অবশ্য মৃত্যু হয়নি; মৃত্যু কী করে হল সেকথা আজ আর আমার মনে নেই। আমার ধারণা যেদিন মেয়েটি ঘোষণা করল। যে আমার জন্যে সে পৃথিবীর সব কিছু পরিত্যাগ করতে রাজি সেই দিনই আমাদের রোমান্সের পরিসমাপ্তি ঘটেছে এই সময়টাই মানুষের জীবনে সবচেয়ে সঙ্কটময়; কারণ, অনন্তের ভীতি আমাদের তখন গ্রাস করে ফেলে। এক সপ্তাহ আগে লেডি হ্যাম্পশায়ারের বাড়িতে ডিনারের নিমন্ত্রণ ছিল আমার। ভদ্রমহিলার পাশেই আমি খেতে বসেছিলাম। তুমি কি বিশ্বাস করবে ভদ্রমহিলা আবার সেই পুরনো দিনগুলির কথা তুলে ভবিষ্যতের অসহনীয় দিনগুলির সম্ভাব্য এবং অসম্ভাব্য কাহিনি কপচাতে শুরু করলেন। অ্যাসফোডল ফুলের বিছানায় আমাদের রোমান্স আগেই আমি কবর দিয়ে ফেলেছিলেম তিনি আবার তাকে খুডে বার করে আমাকে সস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন যে আমি তাঁর জীবন নষ্ট করে দিয়েছি। আমি একথা বলতে বাধ্য যে সেদিন ডিনারে তাঁর কিছু অরুচি আমার চোখে পড়েনি; সোডা কথায় ভুরিভোজনই তিনি সেদিন করেছিলেন। সেই জন্যে তাঁর সেই অভিযোগে আমার মলে কোনো আশঙ্কা জাগেলি। কিন্তু কী কুরুচির পরিচয়ই সেদিন তিনি দিয়েছিলেন বল তো! অতীতের একমাত্র সৌন্দর্য এই যে সে অতীত। কিন্তু কখন যে যবনিকা পড়ে সে-সংবাদ নারীরা রাখে না। তারা সব সময় নাটকে ষষ্ঠ অংকের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকে এবং নাটকের অভিনয় যখন শেষ হয়ে যায় তখনো তারা সেটিকে চায় আরো টেনে নিয়ে যেতে। তাদের যদি সে-সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে সব কমেডিই ট্র্যাজিডিতে পরিণত হবে; আর সব ট্র্যাজিডি পরিণত হবে ফার্স-এ। কৃত্রিমতার দিক থেকে তারা সত্যিই বড়ো চমৎকার, ‘আর্টিস্টিক সেনস’ বলতে সত্যিই তাদের কিছু নেই। আমার চেয়ে এদিক থেকে তুমি অনেক। ভাগ্যবান। আমি তোমাকে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, ডোরিয়েন, যে সাইবিল ভেন তোমার যে উপকার করেছে সেরকম উপকার আমার কোনো প্রেমিকাই আমার করতে পারেনি। সাধারণ মহিলারা সব সময়েই নিজেদের সান্ত্বনা দেয়। কিছু মহিলা রয়েছে যারা নিজেদের সান্ত্বনা দেয় রেগে হইচই করে। যে মহিলা ফিকে লাল রঙের পোশাক পরে, তাদের বয়স যাই হোক, কোনোদিন তাদের বিশ্বাস করো না, বিশ্বাস করো না সেই সব মহিলাদের যাদের বয়স পঁয়ত্রিশের ওপরে, যারা ফিকে লাল ফিতে দিয়ে চুল বাঁধতে ভালোবাসে। এই জাতীয় মহিলাদের দেখলেই ভেবে নিযো যে তাদের প্রত্যেকে কছু ইতিহাস রয়েছে। আর একদল মহিলা রয়েছে যারা হঠাৎ তাদের স্বামীদের সদগুণগুলি আবিষ্কার করতে পেরেছে বলে নিজেদের সান্ত্বনা দেয়। লোকের নাকের ডগায় তারা তাদের বিবাহিত জীবনের সুখ এবং আড়ম্বরের সঙ্গে প্রকাশ করে যে মনে হবে জিনিসটা চমৎকার একটা পাপ ছাড়া আর কিছু নয়। কেউ-কেউ আবার ধর্মানুষ্ঠানের মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে পায়। একটি মহিলা একবার আমাকে বলেছিলেন যে রঙিন বাক-চাতুর্যের মধ্যেই নারীদের সান্ত্বনা পাওয়ার রহস্যটি লুকিয়ে রয়েছে এবং কথাটা যে সত্যি তা বুঝতে আমার কোনো অসুবিধা হয়নি। তা ছাড়া নিজেকে পাপী বলে চিহ্নিত করার মধ্যে মানুষের দম্ভ ছাড়া আর কিছু প্রকাশ পায় না। বিবেক বলে বস্তুটা আমাদের সবাইকেই আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। হ্যাঁ, আধুনিক ভাতে সান্ত্বনার উপায় খুঁজে পাওয়ার সত্যিই কোনো শেষ নেই মহিলাদের। সত্যি কথা বলতে কি এখনো আমি সবচেয়ে দামি কথাটাই বলিনি।
