বাঁচালে ডোরিয়েন। গোটা ব্যাপারটাকেই তুমি যে এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখতে পেরেছ এতেই আমি খুশি হয়েছি। তুমি হয়তো গভীর অনুশোচনায় ডুবে নিজের মাথার সুন্দর চুলগুলি ছিডছ এই ভেবে আমি বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেম।
মাথায় একটা ঝাঁকানি দিয়ে এবং একটু হেসে ডোরিয়েন বললেন: সে অবস্থা আমি পেরিয়ে এসেছি। এখন আমি খুশি। প্রথম কথাটা হচ্ছে, বিবেক বলতে কী বোঝায় তা আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি আমাকে যেভাবে বুঝিয়েছিলে বিবেক তা নয়; আমাদের মধ্যে যা কিছু রয়েছে। বিবেক হচ্ছে তাদের সকলের চেয়ে স্বর্গীয়। নাক সিটকিয়ো না, হ্যারি; অন্তত আমার কাছে না; আমি ভালো হতে চাই আমার আত্মা ভয়ঙ্কর হবে, বিকৃত হবে তা আমি সহ্য করতে পারব না।
নীতির ভিত্তি হিসাবে তোমার কথাটি কেবল মনোরমই নয়, সত্যিকার কলাবিদের মতো ডোরিয়েন। এই কথা বলার জন্যে তোমাকে আমার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। কিন্তু শুরু করবে কোথায়?
সাইবিল ভেনকে বিয়ে করে।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠলেন লর্ড হেনরি; হতভম্বের দৃষ্টি তাকিয়ে তিনি প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। কী, কী বললে? সাইবিল ভেনকে বিয়ে করে! কিন্তু প্রিয় ডোরিয়েন…
হ্যাঁ, হ্যারি; এর পরে তুমি কী বলবে তা আমি জানি। বিয়ের বিরুদ্ধে নিশ্চয় কোনো ভয়ঙ্কর কথা। না, না, ওসব কথা বলো না। আমার কাছে আর কোনোদিন বিয়ের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করো না তুমি। দু’দিন আগে সাইবিলকে বলেছিলেম আমাকে বিয়ে করতে। সে কথা ভাঙতে আমি রাজি নই। সেই আমার স্ত্রী হবে।
তোমার স্ত্রী হবে! ডোরিয়েন…তুমি কি আজ সকালে আমার চিঠি পাওনি? নিজের হাতে সেই চিঠি আমি তোমার বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি।
তোমার চিঠি। হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়ছে বটে। আমি সেটা এখনো পড়িনি। ভঘ হচ্ছিল হয়তো সেই চিঠিতে এমন কিছু রয়েছে যা আমার পড়ে ভালো লাগবে না। তোমার বক্রোক্তিগুলি একটা। আস্তো জীবনকে কেটে টুকরো-টুকরো করে ফেলে।
তাহলে তুমি কিছুই জান না?
কী বলছ তুমি?
লর্ড হেনরি ঘরের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে ডোরিয়েন গ্রে-র পাশে গিয়ে বসলেন; তারপরে তাঁর। একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে শক্ত করে ধরে বললেন: ডোরিয়েন, ভয় পেয়ো না; আমার চিঠিতে লেখা ছিল সাইবিল ভেন মারা গিয়েছে।
যন্ত্রণার একটা তীব্র আর্তনাদ ডোরিয়েনের ঠোঁটের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে এল; চট করে দাঁড়িয়ে উঠলেন তিনি; লর্ড হেনরির মুঠো থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিয়ে বললেন–মারা গিয়েছে! সাইবিল আর নেই! না, এ সত্যি নয়; এ একটা জঘন্য মিথ্যা কথা। একথা বলতে তোমার সাহস হল কেমন করে?
লর্ড হেনরি গম্ভীরভাবে বললেন: কথাটা সত্যি, ডোরিয়েন। সকালের কাগজেই এই সংবাদটা বেরিয়েছে। আমার সঙ্গে দেখা করার আগে আর কারো সঙ্গে তুমি দেখা করো না–বিশেষ। করে এই কথাটাই সেখান লেখা ছিল এবং অবশ্যই একটা অনুসন্ধান এর হবে–যাকে বলে ময়না তদন্ত; সেই তদন্তের সঙ্গে তোমার জড়িয়ে পড়া চলবে না। এই রকম ব্যাপার ফ্রান্সে মানুষকে ফ্যাশনেবল করে তোলে, কিন্তু লন্ডনে সাধারণ লোকেরা ছি-ছি করে। দুর্নাম রটনা হতে পারে এমন কোনো কাউকেই এখানে আমাদের প্রচারযন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। বৃদ্ধ বয়সে স্মৃতিচারণার সঙ্গে ওগুলিকে সঞ্চয় করে রাখা উচিত। আমার মনে হয়, থিয়েটার কেউ তোমার নাম জানে না। যদি না জেনে থাকে তো ভালোই। তার ঘরের দিকে যেতে কেউ কি তোমাকে দেখেছিল? এইটিই একটা জরুরি জিনিস।
কয়েক মিনিট কোনো কথা বললেন না ডোরিয়েন; মনে হল, হতভম্ব হয়ে পড়েছেন তিনি। তাঁর চোখ আর মুখের ওপরে ভয়ের একটা ছায়া পড়েছে। অবশেষে বুদ্ধ কণ্ঠের ভেতর থেকে একটা জড়ানো, অসপষ্ট স্বর বেরিয়ে এল তাঁর: ও, হ্যারি, ময়না তদন্তের কথা তুমি বলবে না? কেন ময়না তদন্ত? সাইবিল কি তাহলে…ও, হ্যারি, আমি সহ্য করতে পারছিলেন। তাড়াতাড়ি কী ঘটেছে সব আমাকে তাড়াতাড়ি বলা
ডোরিয়েন, আমার ধারণা ব্যাপারটা নিছক দুর্ঘটনা ন্য; যদিও সেইভাবেই বাইরের লোকের কাছে ঘটনাটা সাজাতে হবে। মনে হচ্ছে রাত্রি সাড়ে বারোটা অথবা তারই কাছাকাছি কোনো এক সময়ে তার মা যখন তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে থিয়েটারে এসেছিলেন সেই সময় কিছু। একটা জিনিস আনার জন্যে সাইবিল দোতলায় যায়। জিনিসটা নাকি ভুলে সে সেখানে ফেলে এসেছিল। কিছুক্ষণ তাঁরা নীচে অপেক্ষা করেছিলেন; কিন্তু সাইবিল আর নীচে নামেনি। খুঁজতে-খুঁজতে তাঁরা শেষ পর্যন্ত সাজঘরের মেঝের ওপরে তার মৃতদেহটিকে পড়ে থাকতে দেখেন। ভুল করে বিষ জাতীয় কিছু একটা সে খেয়ে ফেলেছিল। ওই জাতীয় কিছু জিনিস থিয়েটারের কাজে লাগে। ঠিক ডানিনে বস্তুটি কী, হয়তো প্রুশিক অ্যাসিড; শ্বেত পারা-ও হতে পারে। আমার বিশ্বাস প্রুশিক অ্যাসিড-ই হবে; কারণ, খাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে তার মৃত্যু হয়েছিল।
চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন ডোরিয়েন: হ্যারি, হ্যারি, ভয়ঙ্কর এই সংবাদ!
হ্যাঁ, ঘটনাটা অবশ্যই বড়ো করুণ। কিন্তু এর সঙ্গে তোমার জড়িয়ে পড়লে চলবে না। স্ট্যান্ডার্ড কাগজ পড়ে বুঝলাম মেয়েটির বয়স সতের। আরো কম ব্যস বলেই মনে হয়েছিল আমার। দেখতে মেয়েটি ছিল বাচ্চা; আর অভিনয় করতে সে কিছুই জানত না। ডোরিয়েন, এটা নিয়ে তুমি বেশি ভেবো না। তুমি আমার সঙ্গে চল রাত্রির খাওয়াটা আমরা দুজনে একসঙ্গে সারব: তারপরে আমরা অপেরাতে যাবা আজকে পার্টির সম্মানার্থে সেখানে অভিনয়ের আয়োজন হয়েছে। গণ্যমান্য সবাইকেই সেখানে তুমি দেখতে পাবে। আমার বোনের আসনে তুমি বসবে; তার সঙ্গে কিছু অভিজাত ঘরণী রয়েছে। তার টিকিট পেতে কোনো অসুবিধে হবে না।
