এই ভেবে তিনি উঠে পড়লেন; বন্ধ করে দিলেন দুটি দরজা। এই লজ্জার কালিমা একমাত্র তিনি নিজেই দেখবেন। তারপরে তিনি পর্দাটাকে সরিয়ে দিলেন, প্রতিকৃতিটির মুখোমুখি দাঁড়ালেন। না, ব্যাপারটা সত্যি-যাকে বলে নির্ভেজাল। প্রতিকৃতিটির চেহারায় পরিবর্তন এসেছে।
ভবিষ্যতে ঘটনাটিকে নিয়ে মনে-মলে তিনি অনেকবারই আলোচনা করেছেন এবং আলোচনা করতে-করতে কম অবাক হননি। প্রথমে ছবিটির দিকে তিনি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি দিয়েই তাকিয়ে ছিলেন। এইরকম একটা পরিবর্তন যে ঘটতে পারে তা তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি। কিন্তু তবু ঘটনাটা সত্যি। রাসায়নিক অণু-পরমাণুগুলির মধ্যে কি চোখে দেখা যায়। না এমন কোনো সংযোগ রয়েছে? তার তারই ফলে কি ক্যানভাসের ওপরে প্রতিকৃতির। অবয়ব, রঙ, আর তার আত্মাটি প্রতিফলিত হয়? এটা কি সম্ভব যে সেই আত্মা যা চিন্তা করে সেইটাই পরমাণুগুলি বাইরে প্রকাশ করে? সেই আত্মা যা স্বপ্ন দেখে সেইটাকেই তারা পরিণত করে সত্যে? অথবা, এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে এবং সে কারণগুলি ভয়ঙ্কর? ভাবতে-ভাবতে তিনি ভয়ে কেঁপে উঠলেন; তারপরে, সোফার ওপরে ফিরে গিয়ে তিনি বিহ্বল নেত্রে ছবিটির দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন চুপচাপ।
একটি জিনিস অবশ্য ছবিটি তাঁর কাছে পরিষ্কার করে দিয়েছে। সেটা সাইবিল ভেনের ওপরে তিনি কী অত্যাচার করেছেন, তার সঙ্গে কত নির্মম ব্যবহার করেছেন সেটা তিনি বুঝ পেরেছেন। এই অন্যায়ের প্রতিকার করার সময় যায়নি এখনো। সাইবিল তাঁর স্ত্রী হতে পারে। তাঁর এই অবাস্তব আর স্বার্থপরের মতো ভালোবাসা কোনো মহৎ আদর্শের কাছে মাথা নীচু করবে, বেসিল হলওয়ার্ড তাঁর যে প্রতিকৃতিটি তৈরি করেছেন সেটি ভবিষ্যতে তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে; সন্মার্গ বলতে কিছু লোকে যা বোঝে, বিবেক বলতে কিছু লোকের কাছে যা মনে হয় এবং ভগবৎ-ভীতি বলতে সকলের কাছে যা প্রতীয়মান, ছবিটিকে সেইভাবে মেনে নিয়ে তিনি চলার পথে এগিয়ে যাবেন। অনুশোচনা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে আফিও রয়েছে, নৈতিক প্রবৃত্তিগুলিকে ঘুম পাড়ানোর জন্যে রয়েছে ওষুধ। কিন্তু পাপের জন্যে তাঁর যে অধঃপতন ঘটেছে তা এখানে সপষ্ট। তিনি যে তাঁর আত্মাটিকে ধ্বংস করে ফেলেছেন তারই চির ভাস্বর নিদর্শন এইখানে জলজ্বল করে জ্বলছে।
তিনটে বাজল, চারটে বাজল; সাড়ে চারটে বাডঘর দ্বৈত সংকেত শোনা গেল ঘড়িতে। কিন্তু একইভাবে বসে রইলেন গ্রে। বসে বসে জীবনের পীতাভ-লালচে সুতোগুলিকে একসঙ্গে গুটিয়ে তিনি একটি নতুন প্যাটার্ন তৈরি করছিলেন। আশা আর আবেগের যে অন্ধ গলির মধ্যে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তারই মধ্যে থেকে পথ খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। এর পরে কী তিনি করবেন সে। সম্বন্ধে কিছুই তিনি ভেবে পেলেন না। ভাবতে-ভাবতে তিনি টেবিলের ধারে উঠে গেলেন; যে-মেয়েটিকে তিনি ভালোবাসতেন তাকে উদ্দেশ্য করে একটি দীর্ঘ আবেগমাখা প্রেমপত্র লিখলেন; তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে জানালেন যে সেদিন তিনি তার সঙ্গে অপ্রকৃতিস্থর মতো ব্যবহার করছেন। দুঃখ, যন্ত্রণা, আর অনুশোচনায় ভারাক্রান্ত হৃদয়ের উচ্ছ্বাস দিয়ে। তিনি পাতার পর পাতা ভরিয়ে তুললেন। গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত চিঠিটি আত্ম-তিরস্কারে ভরাট হয়ে গেল। নিজেরাই যখন আমরা নিজেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলি তখন আমরা ভাবি আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার আর কারো অধিকার নেই। পাদরী নয়, এই স্বীকারোক্তিই আমাদের মুক্তি দেয়। চিঠিটি শেষ করার পরে ডোরিয়েন সহজভাবে নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলেন তিনি যে অন্যায় করেছেন সেই অন্যায়ের প্রতিকার সুসম্পন্ন হয়েছে।
হঠাৎ দরজায় একটা টোকা পড়ল; বাইরে থেকে লর্ড হেনরির কথা শোনা গেল ডোরিয়েন, তোমার সঙ্গে দেখা আমাকে করতেই হবে। দরজা খোল। এইভাবে দরজা বন্ধ করে তুমি বসে থাকবে এটা আমি সহ্য করতে পারব না।
প্রথমে কোনো উত্তর দিলেন না তিনি; চুপচাপ বসে রইলেন। দরজার ওপরে ধাক্কার পর ধাক্কা পড়তে লাগল; ঠিক, ঠিক–তাঁকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়াই ভালো। তিনি যে নতুন জীবনের পরিকল্পনা করেছেন সেটা তাঁকে খুলে বলতে হবে; তিনি যদি তার বিরোধিতা করেন তাহলে প্রয়োজনবোধ কলহের আসরেও নামতে হবে তাঁকে; আর সেই কলহের ফলে দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদ যদি অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায় তাহলে সেই বিচ্ছেদকেও তাঁকে মেনে নিতে হবে। এই ভেবে তিনি দাঁড়িয়ে উঠলেন এবং তাড়াতাড়ি পর্দাটি ছবির সামনে টেনে দিয়ে তিনি দরজাটা খুলে দিলেন।
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে লর্ড হেনরি বললেন: যা ঘটেছে তার জন্যে আমি সত্যিই দুঃখিত, ডোরিয়েন; কিন্তু ও-সম্বন্ধে বেশি কিছু চিন্তা করো না তুমি।
ডোরিয়েন জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি সাইবিল ভেনের কথা বলছ?
চেয়ারের ওপরে বসে ধীরে ধীরে হাতের দস্তানাগুলি খুলতে খুলতে লর্ড হেনরি বললেন: হ্যাঁ, নিশ্চয়। একদিন থেকে ঘটনাটা ভয়ঙ্কর, সন্দেহ নেই, কিন্তু তার জন্যে তুমি দায়ী নও। বল দেখি, অভিনয় শেষ হওয়ার পরে তুমি কি নীচে নেমে তার সঙ্গে দেখা করেছিলে?
করেছিলাম।
আমিও তাই ভেবেছিলাম। তার সঙ্গে কোনো ঝগড়া-ঝাঁটি তোমার হয়েছিল?
আমি খুব নিষ্ঠুরের মতো ব্যবহার করেছিলেম হ্যারি-পশুর মতো ব্যবহার করেছিলেম। কিন্তু সে সব এখন মিটে গিয়েছে। যা ঘটে গিয়েছে তার জন্যে আমি দুঃখিত নই। এই ঘটনার মাধ্যমে নিজেকে আমি ভালো করে বোঝার সুযোগ পেয়েছি।
