ভিকটর হেসে বলল: মলিয়ে আজ অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছেন।
ঘুমচোখে ডোরিয়েন জিজ্ঞাসা করলেন: কটা বেজেছে, ভিকটর?
সওয়া একটা মঁসিয়ে।
সত্যিই বড়ো দেরি হয়েছে। উঠে বসলেন তিনি; চা খেয়ে তিনি চিঠিগুলি টেনে নিলেন। একটা চিঠি এসেছে লর্ড হেনরির কাছ থেকে। সেদিনই সকালে একটি পত্রবাহক এসে সেটি দিয়ে। গিয়েছে। খুলবেন কি খুলবেন না–একটু ইতস্তত করে তিনি সেটিকে সরিয়ে রাখলেন। অন্যগুলিকে তিনি খুললেন বটে কিন্তু পড়ার আগ্রহ তাঁর একেবারে ছিল না। চিঠিগুলির মধ্যে ছিল কার্ড, ডিনারের নিমন্ত্রণ, সিনেমা, কনসার্টের টিকিট, এই সময়টা লন্ডনের কর্মহীন ফ্যাশানেবল যুবকদের কাছে এই জাতীয় চিঠিপত্র প্রায়ই আসে। একটা অনেক টাকা দামের বিল-ও এসেছিল। তিনি একটা রুপোর লুই কুইনজ টয়লেট সেট কিনেছিলেন। এই কথাটা তখনো পর্যন্ত তিনি তাঁর অভিভাবকদের জানাতে সাহস করেননি। তার একমাত্র কারণ হচ্ছে তাঁর অভিভাবক একেবারে সেকেলে। তিনি কিছুতেই বুঝতে চান না আধুনিক যুগে আমাদের সবচেয়ে প্রযোজনীয় জিনিসের। ভারমিন স্ট্রিটের উত্তমর্ণদের কাছ থেকে চিঠিও এসেছিল। অনেকগুলি। তারা বেশ বিনীতভাবে জানিয়েছিল যে এক মিনিটের নোটিশে এবং সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত অথবা নামমাত্র সুদ নিয়ে তারা ধার দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পাবে। ঘুম থেকে ওঠার প্রায় মিনিট দশেক পরে, সিল্কের পাড় বসানো দামি একটা বড়ো কাশ্মীরি উলের তৈরি ড্রেসিং গাউন গায়ে চড়িয়ে তিনি স্নানের ঘরে ঢুকলেন। দীর্ঘ নিদ্রার পরে ঠান্ডা জল তাঁর অবসাদ অনেকটা দূর করে দিল। আগের দিন রাত্রি থেকে যে সব যন্ত্রণা আর হতাশার মধ্যে। দিয়ে তাকে কাটাতে হয়েছিল, স্নানের পরে সে সমস্ত তাঁর মন থেকে মুছে গেল। দু’একবার অবশ্য বিয়োগান্ত নাটকের অদ্ভুত স্মৃতিগুলি তাঁর মনের কোণে উঁকি দেয়লি সেকথা সত্যি নয়; কিন্তু তাঁর মনে হল সেগুলি সব স্বপ্ন, তাদের মধ্যে বাস্তবের কোনো ছোঁয়াচ নেই।
স্নান সেরে তিনি লাইব্রেরিতে গেলেন। এই ঘরেই খোলা জানালার ধারে ছোটো একটি টেবিলের ওপরে তাঁর জন্যে অল্প পরিমান ফ্রেঞ্চ ব্রেকফাস্ট দেওয়া হয়েছিল। সেই টেবিলের পাশে গিয়ে তিনি বসলেন। দিনটি বড়ো চমৎকার। মনে হল, গরম বাতাসের মধ্যে সুগন্ধি মশলার গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। গুনগুন করতে-করতে একটা মৌমাছি ঘরের মধ্যে ঢুকে এল; তাঁর সামনে নীল ভেস-এর মধ্যে রাখা বেগনে গোলাপ ফুলের চারপাশে ঘুরতে লাগল। আর তাঁর কোনো দুঃখ নেই। মন তাঁর আনন্দে ভরে উঠেছে।
প্রতিকৃতির সামনে যে পর্দা ঝোলানো ছিল হঠাৎ তাঁর চোখ দুটো তার ওপরে গিয়ে পড়ল। চমকে উঠলেন তিনি।
টেবিলের ওপরে একটা ওমলেটের প্লেট দিয়ে তাঁর পরিচারক জিজ্ঞাসা করল: খুব ঠান্ডা লাগছে, মঁসিয়ে? ডানালাটা বন্ধ করে দেব?
মাথা নাড়লেন ডোরিয়েন বললেন: না, না, ঠান্ডা লাগছে না।
ব্যাপারটা কি সত্যি? সত্যিই কি প্রতিকৃতিটার ওপরে পরিবর্তন দেখা দেয়েছে? প্রতিকৃতিটির মুখের যে জায়গাটায় আগে আনন্দের জ্যোতি ফুটে উঠেছিল সেইখানে একটা কলঙ্কের রেখা দেখা দিয়েছে। এটা কি সত্যি, না, তাঁর মতিভ্রম? ক্যানভাসে আঁকা চেহারার মধ্যে নিশ্চয়। কোনো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে না। ব্যাপারটা একেবারে অসম্ভব ঘটনা। বেসিলকে তিনি গল্প বলার ছলে এ-কাহিনি একদিন বলতে পারেন। গল্প শুনে নিশ্চয় তিনি হাসবেন।
কিন্তু তবু কত স্পষ্টই না তাঁর সব মনে রয়েছে। প্রথমে প্রত্যুষের অস্পষ্ট আলোতে তারপরে প্রভাতের উজ্জ্বল আলোতে ওই ছবিটির ঠোঁটের ওপরে নিষ্ঠুরতার একটি বাঁকা ভঙ্গি তিনি দেখেছেন। তাঁর পরিচারক ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে তিনি একটু ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি বেশ বুঝতে পারলেন যে ঘরে একা থাকলেই ওই প্রতিকৃতিটিকে পরীক্ষা করার জন্যে আবার তাঁকে উঠতে হবে। পরীক্ষা করতে তাঁর আপত্তি নেই, কিন্তু সেই নির্মম ব্যঙ্গের ছায়াটি যে তিনি দেখতে পাবেন সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না তাঁর। কফি আর সিগারেট দিয়ে লোকটি যখন চলে যাওয়ার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল তখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে না যাওয়ার জন্যে তাকে অনুরোধ জানানোর একটা উদগ্র কামনা জাগল তাঁর। লোকটি বাইরে বেরিয়ে গিয়ে দরজা ভেড়ানোর সঙ্গে-সঙ্গে তিনি তাকে ডাকলেন। তাঁর নির্দেশ কী শোনার জন্যে দাঁড়িয়ে। রইল লোকটি ডোরিয়েন তার দিকে এ তাকিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন: কেউ এলে বলে দিয়ো আমি বাড়িতে নেই।
মাথাটা একটু নুইয়ে বেরিয়ে গেল লোকটি।
তারপরে তিনি উঠলেন, একটা সিগারেট ধরালেন, পর্দার দিকে মুখ করে যে ভালো গদি দিয়ে মোড়া সোফাটি পাতা ছিল তার ওপরে বসে পড়লেন। পর্দাটা পুরনো, স্পেনদেশীয় চামড়া দিয়ে তৈরি; তার ওপরে লুই কোয়টজ জাতীয় চকচকে স্ফটিক মণির নক্সা কাটা। বিশেষ কৌতূহল নিয়ে তিনি পরীক্ষা করলেন সেটিকে। সত্যিই কি মানুষের হৃদয়ের গোপন কোনো রহস্য এর আগে কোনোদিন সে লুকিয়ে রেখেছে?
যাই হোক, এটাকে কি তিনি সরিয়ে রাখবেন? কী দরকার? ওখানেই থাক না। ও-কথা জেনে লাভ কী? ব্যাপারটা যদি সত্যিই হয় তাহলে নিশ্চয় তা ভয়ানক; যদি সত্যি না হয়, তাহলে বিষয়টা নিয়ে এত চিন্তা করে লাভ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আর কারো চোখে যদি হঠাৎ এই পরিবর্তনটি ধরা পড়ে? বেসিল হলওয়ার্ড এসে যদি এই ছবিটির দিকে তাঁকে তাকিয়ে দেখতে বলেন তাহলে তিনি কী করবেন? বেসিল সেকথা যে তাঁকে বলবেন সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। না; জিনিসটাকে ভালো করে দেখতে হবে, এবং এখনই। এই ভয়ঙ্কর সন্দেহ মনের মধ্যে পুষে রাখার চেয়ে অন্য যে কোনো কাজ করা ভালো।
