নিষ্ঠুরতা! সত্যিই কি তিনি নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছেন? অপরাধ মেয়েটির; তাঁর নয়। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন মেয়েটি একজন বিরাট আর্টিস্ট, প্রতিভাময়ী ভেবেছিলেন বলেই তো তিনি তাকে ভালোবেসেছিলেন। সে তাঁকে নিরাশ করেছে। মেয়েটি সাধারণ; তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতা তার নেই। তবু মেয়েটি যে একটা শিশুর মতো তাঁর পায়ের নীচে লুটিয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছিল–এই দৃশ্যটা মনে পড়তেই তিনি দুঃখ আর তীব্র অনুশোচনায়। ভেঙে পড়লেন। তিনি যে কতটা নিরাসক্তভাবে সেই দৃশ্য দেখেছিলেন সেকথাটা তাঁর মনে। পড়ে গেল। ভগবান তাঁকে কেন এমন করে সৃষ্টি করলেন? কেন তিনি তাঁকে ওই ধরনের আত্মা দিয়েছেন? কিন্তু তিনিও কম যন্ত্রণা ভোগ করেননি। অভিনয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনটি ঘন্টা তাঁর মনে হয়েছিল তিনটি শতাব্দী; আর তাদের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। তাঁকে পাওয়া তো সাইবিলের পক্ষে কম পাওয়া ছিল না। তিনি তাকে অনেক যন্ত্রণা দিয়েছেন এই কথাটা স্বীকার করে নিলেও তো অস্বীকার করা যায় না যে সেও তাঁকে মুহূর্তের জন্যে বিয়ে করেছিল। তাছাড়া, ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা দুঃখভোগে বেশি অভ্যস্ত। প্রেমিকদের সঙ্গে কলহ করতেই মেয়েরা ভালোবাসে; একথা লর্ড হেনরি তাঁকে বলেছেন এবং মেয়েরা কী ধাতু দিয়ে গড়া তা লর্ড হেনরি ভালোভাবেই জানেন। সাইবিল ভেনের কথা চিন্তা করে তিনি এত কষ্ট পাচ্ছেন কেন? এখন থেকে মাইবিল ভেন তাঁর কাছে কেউ নয়।
কিন্তু তাঁর ছবি? ওটার সম্বন্ধে কী বলার রয়েছে তাঁর? ওই ছবিটাতেই তো তাঁর জীবনের রহস্য লুকিয়ে রেখেছে; ওই ছবিটাই তাঁর জীবনের আলেখ্য। এই ছবিটাই তাঁকে তাঁর নিজের সৌন্দর্যকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। নিজের আত্মাকে ঘৃণা করতেও কি ওই ছবি তাঁকে শেখাবে? আবার কি তিনি ছবিটিকে দেখবেন?
না। যে যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে তিনি কাটিয়েছেন তারই জন্যে দৃষ্টিবিভ্রম ঘটেছে তাঁরা যে ভয়ানক রাত্রিটি তিনি অতিক্রম করে এসেছেন সেই রাত্রিটিই তাঁর পিছনে ভৌতিক ছায়াগুলিকে লেলিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ তাঁর মাথার মধ্যে এমন একটা দুশ্চিন্তার বীজ উপ্ত হয়েছে সে দুশ্চিন্তা মানুষকে উন্মাদ করে দেয়। প্রতিকৃতিটির কোনো পরিবর্তন হয়নি; পরিবর্তন হয়েছে একথাটা ভাবাই তাঁর পক্ষে মূর্খতা হয়েছে।
তবু তার সুন্দর অথচ বিকৃত মুখ আর নিষ্ঠুর হাসি নিয়ে ছবিটি তাঁকে লক্ করছে। প্রভাতের সূর্যরশ্মিতে তার উজ্জ্বল চুলগুলি চিকচিক করছে। তার নীল চোখ দুটির সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হল। তাঁর নিজের জন্যে ন্য, তাঁর ওই প্রতিকৃতিটির জন্যে তাঁর একটা অদ্ভুত মায়া হল। ছবিটির মধ্যে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, ভবিষ্যতে আরো দেখা দেবে। তার গোলাপী রঙটা। ফ্যাকাশে হয়ে যাবে, শুকিয়ে যাবে তার লাল আর সাদা গোলাপগুলি। তিনি যে সব পাপ কাজ করবেন তার প্রতিটি ছাপ ওই সুন্দর মুখের ওপরে পড়ে তাকে বিকৃত করবে। কিন্তু তিনি । কোনো পাপ কাজ করবেন না। পরিবর্তন হোক আর নাই হোক, তাঁর বিবেকের প্রতীক চিহ্ন হিসাবে ছবিটি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে। প্রলোভন তিনি এডিয়ে চলবেন। লর্ড হেনরির সঙ্গে আর তিনি দেখা করবেন না; অন্তত, আর কোনোদিনই তাঁর কথায় কান দেবেন না। এবং এই কথাগুলিই বেসিল হলওয়ার্ডের বাগানে প্রথম তিনি তাঁর মুখ থেকে শুনেছিলেন; এবং এইগুলিই বিষাক্ত নীতির মতো তাঁর অসম্ভব বাসনা-কামনাগুলিকে নাড়া দিয়েছিল। তিনি সাইবিল ভেনের কাছেই ফিরে যাবেন, তার কাছে হমা প্রার্থনা করবেন, তাকে বিয়ে করবেন, আবার তাকে ভালোবাসতে চেষ্টা করবেন। হ্যাঁ, এটাই তাঁর কর্তব্য হবে। তিনি যত কষ্ট ভোগ করেছে তার চেয়ে সাইবিল নিশ্চয় অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছে। হতভাগ্য শিশু। স্বার্থপরের। মতো তিনি তার সঙ্গে নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছেন। আইবিলের ওপরে তাঁর যে আকর্ষণ জন্মেছিল সে-আকঙ্কণ আবার ফিরে আসবে। তাকে নিয়ে সুখী হবেন তিনি। তাকে বিয়ে করে তাঁর জীবন সুন্দর আর পবিত্র হয়ে উঠবে।
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন তিনি; প্রতিকৃতির সামনে যে বিরাট পর্দাটা ঝুলছিল সেটাকে একপাশে টেনে দিলেন, তার দিকে তাকিয়ে ভয়ে কেঁপে উঠলেন। “কী ভয়ঙ্কর!”–বিড়বিড় করে বলতে-বলতে তিনি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে জানালাটা খুলে দিলেন। ঘাসের ওপরে বেরিয়ে এসে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলেন তিনি। প্রভাতের স্নিগ্ধ বাতাস তাঁর মনের সমস্ত অবসাদ দূর করে দিল। কেবল সাইবিলের কথাই তিনি ভাবতে লাগলেন। ভালোবাসার একটা হীণ রশ্মি আবার তাঁর চোখে পড়ল। সাইবিলের নাম তিনি বার বার উচ্চারণ করতে লাগলেন। শিশিরভেজা বাগালের মধ্যে পাখিরা যে গান গাইছিল সেই গান সাইবিলের কথাই তাঁকে শোনাচ্ছিল।
.
অষ্টম পরিচ্ছেদ
তাঁর ঘুম যখন ভাঙল তখন দুপুর অনেকটা গড়িয়ে গিয়েছে। তিনি জেগেছেন নাকি জানার জন্যে তাঁর চাকর অনেকবারই নিঃশব্দে ঘরের মধ্যে ঢুকেছে; তার যুবক মনিব এত ঘুমোচ্ছেন কেন বুঝতে না পেরে অবাক হয়েছে যথারীতি। শেষ পর্যন্ত একসময় তাঁর ঘুম ভাঙল; তিনি বেল বাজালেন। ভিকটর এক কাপ চা আর পুরনো চিনেমাটির ট্রে-তে করে একগাদা চিঠি নিয়ে ধীরে-ধীরে ঘরে এসে ঢুকল; তিনটি জানালার ওপরে যে ওলিভ-সাটিনের পর্দাগুলি ঝুলছিল সেগুলি সে টেনে একপাশে সরিয়ে দিল।
