ভোরের দিকে তিনি বুঝতে পারলেন কোভেনট গার্ডেন-এর খুব কাছে এসে পড়েছেন। অন্ধকার অপসারিত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে একটা ফিকে আগুনে রঙ দেখা দিল। তারপরেই আকাশ মুক্তোর মতো হয়ে গেল। লিলি ফুলের বোঝা নিয়ে বড়ো-বড়ো গাড়িগুলি ফাঁকা। রাস্তার ওপর দিয়ে ক্যাঁচক্যাঁচ করতে-করতে এগিয়ে যেতে লাগলা ফুলের গন্ধে ভারী হয়ে উঠল বাতাস। তাদের গন্ধে যন্ত্রণার কিছুটা উপশম হল তাঁরা বাজারের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি; বিরাট-বিরাট গাড়ি থেকে মাল খালাস করতে দেখলেন। সাদা পোশাক পরা একটি গাড়োয়ান তাঁকে কয়েকটা চেরি দিল। তিনি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন লোকটা তাঁর কাছ থেকে দাম নিল না কেন। সেই ফলগুলি নিয়ে অন্যমনস্কভাবে তিনি খেতে লাগলেন। ফলগুলিকে মধ্যরাত্রিতেই তোলা হয়েছে, রাত্রির ঠান্ডা ফলগুলির ভেতরে ঢুকে সেগুলিকে স্নিগ্ধ করে রেখেছে। একদল ছেলে টিউলিপ, বেগনে আর লাল গোলাপের টুকরি নিয়ে তাঁর পাশ দিয়ে শাকসজির দোকানের দিকে এগিয়ে গেল। সূর্যের আলোকে চকচকে বড়ো বড়ো থাম দেওয়া গাড়িবারান্দার নীচে নিলাম ডাকা শেষ হওয়ার জন্যে একদল মেয়ে খোলা মাথায় অপেক্ষা করছে। আর সবাই পিয়াজার কফি-হাউসের ঠেলা দরজার কাছে কফি খাওয়ার জন্যে ভিড় করেছে। বড়ো-বড়ো শকটগুলো ঘন্টা বাজিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। কয়েকটা গাড়োয়ান খালি বস্তার ওপরে গড়াগড়ি দিচ্ছে, আবার রাস্তার ওপরে ছড়ানো খাবার খুটে খাওয়ার জন্যে পায়রার দল ঝাঁক বেঁধে উড়ছে।
কিছুক্ষণ পরে একটা গাড়ি ডেকে বাড়িতে ফিরে এলেন তিনি। কিছুক্ষণ তিনি বন্ধ দরজার সামনেই পায়চারি করতে লাগলেন; সামনেই পার্ক, পার্কের চারপাশের বাডিগুলি জানালা-দরজা বন্ধ করে তখলো ঘুমোচ্ছিল। সেইদিকে কয়েক মিনিট তিনি তাকিয়ে রইলেন।
ঘরের সামনেই বিরাট হলঘর। ওক-গাছের বিম দেওয়া তৈরি নীচের ছাদ থেকে ভেনিসের তৈরি বিরাট একটা বাতিদান ঝুলছিল। তার ভেতরে তিনটে বাতি তখনো জ্বলছিল মিটমিট করো বাতিগুলিকে নিবিয়ে দিলেন তিনি; টুপি আর ঢিলে জামাটা টেবিলের ওপরে খুলে রেখে লাইব্রেরির মধ্যে দিয়ে তিনি তাঁর শোওয়ার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। নীচের তলার ঘরটি তাঁর বেশ বড়োই। জীবনে নতুন ভোগের আস্বাদ পেয়ে ঘরটিকে সুন্দরভাবে সাজিয়েছিলেন তিনি। ঘরের দরজা খোলার সময় হঠাৎ বেসিলের তৈরি তাঁর সেই প্রতিকৃতিটির দিকে নজর পড়ে গেল। সেটি তাঁর ঘরের দরজার সামনেই দাঁড় করানো ছিল। প্রতিকৃতিটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চমকে একটু পিছু হটে গেলেন তিনি। একটু বিভ্রান্ত হয়ে তিনি ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন। কোটটা খুলে একটু ইতস্তত করলেন; তারপরে বেরিয়ে এলেন। আবার প্রতিকৃতির সামনে এসে দাঁড়ালেন। ঘি-রঙা মোটা সিল্কের পর্দা ভেদ করে যেটুকু আলো প্রতিকৃতিটির ওপরে এসে পড়েছিল সেই আলোতেই সেইদিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি। মনে হল কিছুটা যেন পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। প্রতিকৃতিটির আগেকার চাহনি আর নেই। মুখের ওপরে নিষ্ঠুরতার একটা ছাপ পড়েছে। ছাপটা স্পষ্ট; যে-কোনো লোকের চোখেই তা ধরা পড়ার কথা। নিশ্চয়, ওটা নিষ্ঠুরতার ছাপ ছাড়া আর কিছু নয়।
ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি, জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন, পর্দাটা দিলেন সরিয়ে। ভোরের উজ্জ্বল আলো ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, ঘরের রহস্যময় অন্ধকার একপা<Hard copy issue> ছিটকে পড়ল। কিন্তু প্রতিকৃতিটির মুখের ওপরে যে অদ্ভুত ছাপটি তিনি প্রথমে লক্ষ। করেছিলেন, আলোর জ্যোতিতেও তা অপসারিত হল না; মনে হল, সেটি আরো ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। আরশির সামনে দাঁড়ালে মানুষ যেমন তার মুখের প্রতিটি অংশ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখতে পায়, প্রভাতের আলোর দ্যুতিতেও সেই রকম পরিচ্ছন্নভাবে দেখতে পেলেন। তিনি-প্রতিকৃতির মুখের ওপরে যে ছাপটা পড়েছে সেটা নিষ্ঠুরতার মনে হচ্ছে, এইমাত্র সে কোনো পাপ করে এসেছে।
ভ্রুকুটি করলেন ডোরিয়েন। লর্ড হেনরি তাঁকে অনেক উপহার দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটা। ছিল ডিম্বাকৃতি গ্লাস। তারই মসৃণ গায়ের ওপরে তিনি তাড়াতাড়ি নিজের মুখ দেখতে লাগলেন। না, তাঁর লাল ঠোঁট দুটির ওপরে তো কোনো চিহ্ন পড়েনি। তাহলে, এর অর্থ কী?
চোখ দুটো রগড়ে নিলেন তিনি? ছবিটির খুব কাছে এসে আবার পরীক্ষা করতে লাগলেন। ছবিটার ওপরে সত্যিকার কোনো দাগ পড়েনি, তবু মনে হচ্ছে ছবিটির মুখের চেহারাটা যেন পালটিয়ে গিয়েছে। এটা তাঁর নিছক কল্পনা নয়। পরিবর্তনটা স্পষ্ট-ভীষণভাবে স্পষ্ট।
একটা চেয়ারের ওপরে বসে ভাবতে লাগলেন।
ছবিটা শেষ হওয়ার দিন বেসিলের স্টুডিযোতে বসে একটা কথা বলেছিলেন। সেই কথাটা হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে গেল। হ্যাঁ, সপষ্ট মনে রয়েছে তাঁর। তিনি একটি উন্মত্ত আশা পোষণ করেছিলেন। আশাটা হচ্ছে, তিনি চিরকাল তরুণ থাকবেন। বৃদ্ধ হোক ছবিটা। তাঁর নিজস্ব সৌন্দর্য যেন নষ্ট না হয়, তাঁর সমস্ত পাপ আর উচ্ছ্বাসের ছাপ ওই ক্যানভাসের বুকে প্রতিফলিত হোক। তাঁর সমস্ত দুঃখ আর চিন্তার রেখার জর্জরিত হোক ছবিটা। তিনি যৌবনের সমস্ত রস চিরকাল সঞ্জীবিত থাকুন। নিশ্চয় তাঁর আশা পূর্ণ হয়নি। এ-আশা পূর্ণ হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁর সামনের ওই ছবিটির মুখে নিষ্ঠুরতার ছাপ পড়ল কী করে?
