সোফার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন ডোরিয়েন; তারপরে বিড়বিড় করে বললেন, আমার ভালোবাসাকে হত্যা করেছ তুমি।
তাঁর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সাইবিল; হাসল। কোনো উত্তর দিলেন না ডোরিয়েন। সাইবিল তাঁর কাছে এগিয়ে এসে তার ছোটো-ছোটো আঙুল দিয়ে তাঁর মাথার চুলগুলিকে আস্তে-আস্তে টানতে লাগল। হাঁটু মুড়ে বসে তার আঙুলগুলি দিয়ে তার ঠোঁটের ওপরে ধরল চেপে। তিনি হাতটাকে টেনে নিলেন; তাঁর দেহটা কাঁপতে লাগল।
তারপরেই তিনি লাফিয়ে উঠে দরজার ধারে দাঁড়িয়ে বললেন, হ্যাঁ সত্যি কথা, তুমি আমার। প্রেমকে হত্যা করেছ। তুমি আমার কল্পনাকে উদ্বোধিত করেছিলে একদিন, আজ তুমি আমার মনে সামান্য কৌতূহল জাগাতেও অক্ষম হয়েছে। তুমি আমাকে আর নাড়া দিতে পারছ না। তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলেম কারণ তুমি ছিলে অপরুপা, কারণ তোমার ছিল প্রতিভা, ছিল ধীশক্তি, মহান কবিদের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়ার মত ছিল তোমার এবং কলার যাকে আমরা ছায়া বলি তাকেই বাস্তবে রূপায়িত করতে তুমি পারতে–সেই সমস্ত ক্ষমতার অধিকারিণী হয়েও তুমি তাদের ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে। তোমার গভীরতা নেই, মূর্খ তুমি! হায় ভাবান, কত ভালোই না তোমাকে আমি বেসেছিলেম! কী মুখই না আমি ছিলেম! এখন থেকে তোমার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক নেই আমার। আর তোমার মুখ আমি দেখব না। আর তোমার কথা আমি চিন্তা করব না। আর তোমার নাম আমি উচ্চারণ করব না। একদিন তুমি যে আমার কাছে কি ছিলে তা তুমি জান না। ওঃ, আমি আর ভাবতে পারছিনো হারে, তোমার সঙ্গে আমার যদি কোনোদিন দেখা না হত! আমার জীবনের রোমান্স তুমি নষ্ট করে দিয়েছা ভালোবাসা তোমার আটকে নষ্ট করে দেয় এই যদি তোমার মত হয় তাহলে বুঝতে হবে ভালোবাসা কাকে বলে তা তুমি জান না। আমি তোমাকে দিঘিজয়িনী করিয়ে আনতে। পারতাম, তোমাকে বিশ্বের মানুষ পুজো করত এবং আমার স্ত্রী হিসাবে পরিচিতি পেতে তুমি, কিন্তু এখন তুমি কী? সুন্দর মুখধারিণী তৃতীয় শ্রেণির অভিনেত্রী ছাড়া আর কিছু নয়।
মেয়েটির মুখ সাদা হয়ে গেল; কাঁপতে লাগল সে; নিজের দুটো হাত মুচড়াতে লাগল। গলার মধ্যে স্বরটা তার আটকে গেল যেন; সে বলল, ডোরিয়েন, তুমি সিরিয়াস নও। তুমি অভিনয় করছ।
তিনি তিক্তভাবে বললেন: অভিনয়! ওটা আমি তোমার জন্যে রেখে দিলাম। ওটা তুমি ভালোই করা
সাইবিল উঠে দাঁড়াল; তারপর বিবর্ণ মুখে ডোরিয়েনের সামনে এসে হাজির হল; একটা হাত তাঁর হাতের ওপরে রেখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
ডোরিয়েন তাকে ঠেলে সরিয়ে দিলেন।
চিৎকার করে কেঁদে উঠল সাইবিল: আমাকে তুমি ছোঁবে না?
একটা অস্পষ্ট কান্নায় ভেঙে পড়ল সাইবিল, ডোরিয়েনের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল। সেইখানে পায়ে মাড়ানো ফুলের মতো কিছুক্ষণ সে পড়ে রইল, তারপরে ফিস ফিস করে। বলল: ডোরিয়েন, আমাকে পরিত্যাগ করো না। ভালো অভিনয় করতে পারিনি বলে আমি দুঃখিত। অভিনয়ের সময় সারাটা দুষ্কণই আমি তোমার কথাই চিন্তা করছিলাম। কিন্তু আমি চেষ্টা করব–সত্যিই আমি চেষ্টা করব। তোমাকে ভালোবাসি বলেই হঠাৎ আমার এই ভাবান্তর ঘটেছিল। যদি তুমি আমাকে চুমু না খেতে, যদি আমি তোমাকে চুমু না খেতাম, তাহলে আমরা যে দুজনে দুজনকে ভালোবাসি তা আমি বুঝতে পারতাম না। আমাকে আবার চুমু খাও। আমার কাছ থেকে চলে যেয়ো না। আমার ভাই…না না, সেকথা থাক। সত্যি সত্যিই কিছু করবে বলে সে একথা বলেনি, ঠাট্টা করেই বলেছিল…কিন্তু তুমি… আজকের মতো তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পার না? আমি ভালো অভিনয় করার জন্যে আবার চেষ্টা করব। পৃথিবীর মধ্যে তোমাকেই আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি বলে আমার ওপরে নিষ্ঠুর হয়ো না তুমি। মোট কথা, মাত্র একবারই আমি তোমাকে খুশি করতে পারিনি। কিন্তু। ডোরিয়েন, তুমিই ঠিক কথা বলেছ। আর্টিস্ট হিসাবেই নিজেকে আমার বেশ মনে করা উচিত ছিল। মূখের মতো কাজ করেছি আমি, না করে পারিনি বলেই করেছি। আমাকে তুমি ছেড়ে যেয়ো না, ছেড়ে যেয়ো না।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ফুলে-ফুলে কাঁদতে লাগল সাইবিল; ডোরিয়েন গভীর অনীহা নিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলেন, অপরূপ ঘৃণায় তাঁর কারুকার্যকরা ঠোঁট দুটি বি হল, ভালোবাসা নষ্ট হলে মানুষের সমস্ত উচ্ছ্বাসই কেমন যেন হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়। সাইবিল ভেনকেও অদ্ভুত রকমের অতি নাটকীয় বলে মনে হল তাঁরা সাইবিলের ফোঁপানির শব্দ আর চোখের জল বিরক্ত করল তাঁকে।
শেষকালে পরিচ্ছন্ন স্বরে তিনি বললেন: আমি যাচ্ছি। আমি নিষ্ঠুর হতে চাই নে, কিন্তু তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না। তুমি আমাকে নিরাশ করে।
মেয়েটি নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল কোনো উত্তর দিল না; কিন্তু তাঁর দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে। আসতে লাগল। তার ছোটো ছোটো হাত দুটি বিস্তারিত হয়ে অন্ধকারে কী যেন খুঁজতে লাগল, মনে হল তাঁকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে। তিনি পিছন ফিরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। কয়েক মিনিট পরেই থিয়েটারের বাইরে গিয়ে পড়লেন।
কোথায় যা যাচ্ছিলেন তা তিনি নিজেও জানতেন না। মনে হল, আলো-আঁধারের ভেতর দিয়ে, স্বল্প আলোকোজ্জ্বল রাস্তার ওপর দিয়ে, কালো-কালো গম্বুজ আর ভুতুড়ে বিরাট-বিরাট প্রাসাদের পাশ দিয়ে তিনি হেঁটে চলেছেন। কর্কশভাবে হাসতে-হাসতে স্ত্রীলোকেরা তাঁকে। চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল। মদ খেয়ে মাতালগুলো হনুমানের মতো কিচকিচ করতে-করতে আর গালাগালি দিতে দিতে রাস্তার ওপরে গড়াগড়ি দিচ্ছে। কিম্ভুতকিমাকার চেহারার বাচ্চাদের রকের ওপরে বসে থাকতে তিনি দেখলেন, ভেতরের উঠোন থেকে অশ্লীল ভাষায় যে সব। কথাবার্তা চলছিল সে-শব্দও শুনতে পেলেন তিনি।
