ডোরিয়েন একটু চিৎকার করেই বললেনঃ হ্যারি তুমি যাও। আমি একা থাকতে চাই। বেসিল, তোমাকেও যেতে হবে। আমার হৃদয় যে ভেঙে যাচ্ছে তা কি তোমরা দেখতে পাচ্ছ না? তাঁর চোখ দুটি গরম অশ্রুতে ভরে উঠল, কাঁপতে লাগল দুটি ঠোঁট; বকস-এর পেছনে দৌড়ে গিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে তিনি চোখ দুটিকে হাতের চেটো দিয়ে ঢেকে দিলেন।
স্বরটাকে অদ্ভুতভাবে নরম করে লর্ড হেনরি বললেনঃ এস বেসিল।
ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন দুজনে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার মঞ্চের আলো জ্বলে উঠল; যবনিকা তোলা হল শুরু হল তৃতীয় অঙ্ক। ডোরিয়েন তাঁর নিজের জায়গায় ফিরে গেলেন। তাঁকে তখন বিবর্ণ দেখাচ্ছিল; কেবল বিবর্ণ নয়, গর্বিত; সেই সঙ্গে উদাসীন। গড়িযে-গড়িয়ে নাটক চলতে লাগল; সময় যেন আর কাটতে চায় না। হাসতে হাসতে ভারী বুট ঠুকতে-ঠুকতে প্রায় অর্ধেক দর্শক নাটক শেষ হবার আগেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। সব জিনিসটাই শেষ পর্যন্ত পরিণত হল প্রহসনে। শেষ অংক অভিনীত হল শূন্য ঘরে। শেষ পর্যন্ত অভিনয় শেষ হল; অসন্তোষের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে।
অভিনয় শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ডোরিয়েন ছুটে সাজঘরে গিয়ে হাজির হলেন। বিজয়িনীর মতো সাইবিল একাই দাঁড়িয়েছিল। তার চোখের ওপরে একটা অপরূপ জ্যোতি ফুটে উঠেছিল। তার চারপাশে একটা আলোর দ্যুতি খেলা করছিল। তার ঠোঁট দুটি কী জানি একটা গভীর রহস্যে বিমুক্ত হয়ে হাসছিল।
ডোরিয়েন ঘরে ঢুকতেই সে তাঁর দিকে তাকাল, একটা বিপুল আনন্দ তাকে নাড়া দিয়ে গেল। সে বললঃ ডোরিয়েন, আজ আমি কি রকম খারাপ অভিনয় করলাম দেখেছ?
তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে তিনি বললেনঃ ভয়ঙ্কর, ভয়ঙ্কর রকমের খারাপ অভিনয় আজ তুমি করেছ। তুমি কি অসুস্থ? কী রকম জঘন্য অভিনয় আজ তুমি করেছ সে সম্বন্ধে। কোনো ধারণাই তোমার নেই। সেই অভিনয় দেখে আমি কত কষ্ট পেয়েছি তা-ও তুমি জান না।
মেয়েটি হেসে বললঃ ডোরিয়েন, কেন আমি খারাপ অভিনয় করেছি তা তোমার বোঝা উচিত ছিল। কিন্তু এখন তুমি বুঝতে পারছ তাই না?
তিনি রেগেই জিজ্ঞাসা করলেনঃ কী বুঝব?
আজ রাত্রিতে আমি এত খারাপ অভিনয় করলাম কেন? কেন আমি সব সময় খারাপ অভিনয় করব? কারণ আর আমি অভিনয় করব না।
কাঁধে একটা স্রাগ করলেন তিনি; বললেনঃ আমার ধারণা তোমার শরীর আভ্য ভালো নেই। অসুস্থ শরীর নিয়ে অভিনয় করতে আসাটা উচিত হয়নি তোমার এইভাবে অভিনয় করে তুমি সকলের হাসির খোরাক জুগিয়েছ। আমার বন্ধুরা বিরক্ত হয়েছেন, বিরক্ত হয়েছি আমি।
মনে হল, এই সব কথা মেয়েটির কানে ঢুকল না; আনন্দে আবেগে সে তখন মাতোয়ারা। একটা অপরূপ আনন্দের উচ্ছ্বাস তাকে গ্রাস করে ফেলেছে।
তারপরে সে বললঃ ডোরিয়েন, তোমাকে জানার আগে অভিনয়টাই আমার জীবনে ছিল সত্য। এই থিয়েটারেই আমি বেঁচে ছিলেম। ভেবেছিলেম, এটাই পরম সত্য। এক রাত্রিতে
আমি রোজালিনড, আর এক রাত্রিতে পোশিয়া। পোর্শিয়ার আনন্দ, কোর্ডিলায়ার দুঃখ-সব আমার নিজস্ব। সবার উপরেই বিশ্বাস ছিল আমার। যারা আমার সঙ্গে অভিনয় করত সেই সব সাধারণ মানুষকে আমি দেবতার মতো মনে করতাম। স্টেডোর চিত্রিত দৃশ্যগুলিই ছিল আমার জগৎ। ছায়া ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনি। সেইগুলিকেই আমি বাস্তব বলে মলে। করতাম। তারপরে তুমি এলে–ভালোবাসলে আমাকে মুক্ত করে আনলে যার কারাগার। থেকে; বাস্তুব কী জিনিস তুমি আমাকে তাই শেখালে। আজকের রাত্রিতেই–আমার জীবনে এই প্রথম–আমি সপষ্ট বুঝতে পারলাম যে জীবনের মধ্যে দিয়ে আমি এতদিন কাটিয়েছি । কতটা অন্তঃসারহীন, লজ্জাকর এবং ঘৃণ্য। আজকের রাত্রিতেই এই প্রথম আমি বুঝতে পারলাম রোমিঘো কত ভয়ঙ্কর; কত বৃদ্ধ এবং প্রসাধনের আড়ালে যে মানুষটা লুকিয়ে রয়েছে তার দেহ কতটা কুৎসিত। আজকেই আমি প্রথম বুঝতে পারলাম বাগানের এই চাঁদের আলো কত মিথ্যে, দৃশ্যটি কত কদর্য এবং যে কথাগুলি আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল। সেগুলি যে কেবল অবাস্তব তাই নয়, সেগুলি আমার মনের কথা নয়–সে কথাগুলি মন থেকে আমি বলতে চাইনি! তুমি আমার মধ্যে এমন একটা জিনিস এনে দিয়েছ যা অনেক উঁচু-যার কাছে সমস্ত কলাই প্রতিবিম্ব বিশেষ। ভালোবাসা কী তুমি আমাকে তা শিখিযে। প্রিয়তম, তুমিই আমার রূপকথার রাজকুমার। ছায়ার পেছনে ঘুরে-ঘুরে আমি ক্লান্ত। বিশ্বের সমস্ত কলার চেয়ে আমার কাছে তোমার দাম অনেক বেশি। মঞ্চে সাক্ষীগোপালের অভিনয় করে কী লাভ হবে আমার? আজকে যখন আমি অভিনয় করতে এলাম তখন আমি বুঝতেই পারিনি কেমন করে আমার ভেতর থেকে পূর্বের সব আবেগ আর আকাণ্ডহষ্কা নির্বাসিত হয়েছে। ভেবেছিলেম আমি অপরুপ অভিনয় করব; শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলাম যে কিছুই করার হুমতা আমার নেই। এই পরিবর্তন বা অমতার কারণটা কী তা যেন হঠাৎ আবিষ্কার করলাম। আবিষ্কারটি আমার কাছে নিঃসন্দেহে অপরুপ; কানের কাছে কেবলই সে গুনগুন করতে লাগল। আমি হাসলাম। আমাদের প্রেম যে কত গভীর তা তাছাড়া ডানবে কেমন করে? আমাকে তুমি নিয়ে চল ডোরিয়েন, যেখানে আমরা দুজনে একলা থাকতে পারি এমন। একটা জায়গায় আমাকে তুমি নিয়ে চলা রঙ্গমঞ্চকে আমি ঘৃণা করি। যে আবেগ আমাকে মাতায না, এখানে আমি তারই একটা ব্যর্থ অনুকরণ করতে পারি মাত্র কিন্তু যে আবেগ। আমার মনের মধ্যে আগুনের মতো জ্বলছে তাকে আমি অনুকরণ করতে পারিনে। ডোরিয়েন, ও ডোরিয়েন, এর অর্থকী তা কি তুমি বুঝতে পারছ? প্রকাশ করতে পারলেও, স্টেজে অন্য লোকের সঙ্গে সত্যিকার প্রেমের অভিনয় করাটা আমার কাছে নিছক ব্যভিচার ছাড়া আর। কিছু নয়। এই সহজ কথাটা বুঝতে শিখিয়েছ তুমি।
