তার অভিনয়ে এই জড়তা দেখে ডোরিয়েনের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। কেমন যেন মাথাটা গুলিয়ে গেল তাঁর; উদ্বেগে ভরে উঠল তাঁর মূল। তাঁকে লক্ষ করে বন্ধুরাও তাঁর সঙ্গে কথা বলতে সাহস করলেন না। তাঁদের মনে হল, জুলিয়েত-এর ভূমিকায় অভিনয় করার যোগ্যতা মেয়েটির নেই। নিরাশ হয়ে পড়লেন তাঁরা। এই রকম একটি অভিনয় দেখার জন্যে এখানে। আসার প্রয়োজন ছিল না তাঁদের।
তবু তাঁরা ভাবলেন যে জুলিয়েত-এর শ্রেষ্ঠ অভিনয় হচ্ছে দ্বিতীয় অংকের “বারান্দার দৃশ্যে”। সেই দৃশ্যটি দেখার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন তাঁরা। সেই দৃশ্যটি যদি সাইবিল জমিয়ে তুলতে না পারে তাহলে তাকে কোনোমতেই অভিনেত্রী বলা যেতে পারবে না।
চাঁদের আলোতে জুলিয়েত-এর বেশে সাইবিল যখন বেরিয়ে এল তখন তাকে সুন্দর দেখাচ্ছিল। সেবিষয়ে সন্দেহ করার অবকাশ ছিল না কিছু। কিন্তু তার অভিনয়ের ভডতা অসহ্য মনে হল। দৃশ্যটি যতই এগোতে লাগল ততই খারাপ হতে লাগল তার অভিনয়। তার চাল-চলন, হাত আর মুখ নাড়ার ভঙ্গিমা শুধু কৃত্রিমই হল না, হাস্যকর হয়ে দাঁড়াল। সব কথাই অনাবশ্যক জোর দিয়ে সে বলতে শুরু করল।
তুমি জান আমার মুখের ওপরে রাত্রির
ছায়া এসে নেমেছে; অন্যথায় কিশোরীর
কুমারী লজ্জা আমার মুখের ওপরে ছড়িয়ে পড়বে।
আজ রাত্রিতে আমার মুখ থেকে এই মাত্র তুমি যা শুনলে
তার পরে আমি আমার লজ্জা ঢাকব কেমন করে!
এমন সুন্দর কথাগুলি সে উচ্চারণ করল যান্ত্রিক পদ্ধতিতে মনে হল সে কোনো বিদ্যালয়ের ছাত্রী; একটি দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষকের কাছে আবৃত্তি করার শিক্ষা নিয়েছে। তারপরে সে বারান্দার ওপরে ঝুঁকে পড়ে বললঃ
যদিও তোমাকে দেখে আমার আনন্দ হচ্ছে
তবু আমি বলব, আজকের এই মিলনে আমার
কোনো আনন্দ নেই, রাত্রির এই মিলন হঠকারী,
যুক্তিহীন এবং অকস্মাৎ এ-মিলন বিদ্যুতের মতো।
চমকপ্রদ, কিন্তু ক্ষণস্থায়ীঃ ‘অন্ধকার দূর হল’
বলতে না বলতেই আবার তা অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
প্রিয়তম, বিদায়;
আবার আমাদের যখন দেখা হবে তখন
এই বসন্তে প্রেমের যে কোরক অঙ্কুরিত হয়েছে।
তা যেন ভালোবাসার তাজা ফুল হয়ে ফুটে ওঠে।
প্রেমিকের প্রতি প্রেমিকার এই সংযত অথচ গভীর প্রেমোচ্ছাস মাখা কথাগুলি গড়গড় করে মুখস্থ বলে গেল সাইবিল; যেন কেবল বলার জন্যেই বলা; সেগুলি জুলিয়েত-এর নয়; সেগুলির মধ্যে প্রেমিকার হৃদয়-মাধুর্য নেই। দেখে মনে হল না, সে হঠাৎ ভয় পেয়ে নিজের ওপরে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে দেখে মনে হল, সে আস্থা, কী বলছে, কী করছে তা সে জানে। অভিনয়কলার দিক থেকে ব্যাপারটা কদর্য ছাড়া আর কিছু নয। অভিনয় করার কোনো যোগ্যতা তার নেই।
গ্যালারির দর্শক, এমন কি সস্তা দামের টিকিট কেটে নীচে যারা বসেছে সেই সব অশিক্ষিত মানুষরাও কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল। নাটক জমছে না। কদর্য অভিনয়ের আলোচনায় মুখর হয়ে উঠল তারা, চেঁচামেচি করতে লাগল; দিতে লাগল শিসা ইহুদি ম্যানেজার এতক্ষণ সাজঘরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ব্যাপারটা দেখে রাগে গরগর করতে-করতে সে পা ঠুকতে লাগল। এত গোলমাল আর হই-চই-এর মধ্যে যে মানুষটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে হচ্ছে সাইবিল নিজে। প্রেক্ষাগৃহের কোনো বিশৃঙ্খলাই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।
দ্বিতীয় অংক শেষ হওয়ার পরে চারপাশ থেকে আবার হিস-হিস শব্দ উঠল। লর্ড হেনরি উঠে দাঁড়ালেন, তারপরে কোটটা কাঁধে ফেলে বললেন, মেয়েটি দেখতে সুন্দরী–সেদিকে থেকে তোমার সঙ্গে আমি একমত; কিন্তু ও অভিনয় করতে জানে না। এবার আমরা চলে যাই–এস।
ডোরিয়েন বললেন; শেষ পর্যন্ত আমি নাটকটা দেখব।
স্বটা তাঁর তিক্ত কর্কশ।
তোমাদের সন্ধেটা নষ্ট করে দিলাম বলে আমি খুব দুঃখিত, হ্যারি। তোমাদের দুজনের কাছেই আমি ক্ষমা চাইছি।
হলওয়ার্ড বাধা দিয়ে বললেনঃ আমার বিশ্বাস, মিস ভেন অসুস্থ। আর এক রাত্রিতে আসব আমরা।
ডোরিয়েন বললেনঃ ও অসুস্থ হলেই খুশি হব আমি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে অভিনয়ে তার। আজ মন নেই। ও সম্পূর্ণভাবে পালটিয়ে গিয়েছে। গত রাত্রিতে ও একজন উঁচু দরের অভিনেত্রী ছিল। আজ সে অতি সাধারণের পর্যায়ে।
ডোরিয়েন, যাকে তুমি ভালোবাস তার সম্বন্ধে ওভাবে কথা বলো না; বলার চেয়ে ভালোবাসা অনেক উঁচু দরের।
লর্ড হেনরি বললেনঃ আঙ্গিকের দিক থেকে ও-দুটিই হচ্ছে অনুকরণের বিশেষ রূপ। কিন্তু চল। ডোরিয়েন, তোমারও এখানে ওর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করা উচিত নয। খারাপ অভিনয় দেখা। নীতির দিক থেকে কারও উচিত নয়। তাছাড়া আমার ধারণা, তোমার স্ত্রী অভিনয় করুক এটা তুমি চাইবে না। সুতরাং কাঠপুতুলের মতো সে জুলিয়েতের অভিনয় করুক, বা না করুক, তাতে তোমার কি যায় আসে? মেয়েটি দেখতে বড়ো মিষ্টি। সুতরাং অভিনয়ের মতো। জীবনের সম্বন্ধেও যদি তার জ্ঞানটা না থাকে, তাহলে তাকে নিয়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। সঞ্চযের সুযোগ তুমি পাবে। সেই অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে তোমাকে আনন্দ দেবে। পৃথিবীতে দু’ভাতের মানুষ রয়েছে যারা সত্যিকারের আকর্ষণীয়ঃ একদল সব ডানে, একদল কিছুই জানে না। হায় ভগবান, তুমি এতটা বিষণ্ণ হয়ে উঠলে কেন? যৌবনের রহস্য কী জান? যৌবনের গোপন কথা হচ্ছে অশোভনীয় কোনো উচ্ছ্বাসকেই সে বরদাস্ত করে না। এস আমরা ক্লাবে যাই। সেখানে মেম্পন আর সিগারেট খেতে-খেতে সাইবিলের সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা করিগে চলা মেয়েটি সত্যিকারের সুন্দরী। আর কি চাও তুমি।
