লর্ড হেনরি বললেনঃ প্রিয়তমা খুঁজে বার করার জায়গাই বটে! বাপরে, বাপ!
ডোরিয়েন গ্রে বললেনঃ ঠিকই বলেছ। এইখানেই তাকে আমি খুঁজে বার করেছি এবং আমার কাছে সমস্ত জীবন্ত প্রাণীর চেয়ে সে অনেক বেশি স্বর্গীয়। তার অভিনয় দেখলে তোমরা সব ভুলে যাবে। সে স্টেজে নামলেই এই সব সাধারণকর্কশ স্বভাব এবং পাশবিক চরিত্রের মানুষগুলির হাবভাবও পালটিয়ে যাবে। তাদের চেঁচামেচি বন্ধ হয়ে যাবে; চুপ করে বসে তার
অভিনয় তারা দেখবো তারই ইচ্ছেমতো এই সব মানুষগুলি হাসবে, কাঁদবো সে তাদের বেহালার তারের মতো সুরময় করে তুলবে। তাদের আত্নিক ভাতে সে তুলবে সুর। নিজেদের রক্তমাংসের কথা ভুলে যাবে তারা।
অপেরা-কাচ চোখে বসিয়ে লর্ড হেনরি একতলার দর্শকদের দিকে এতক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন, ডোরিয়েনের কথা শুনে তিনি বললেন, ভুলে যাবে! অর্থাৎ নিজেদের রক্তমাংসের কথা।
এবিষয়ে তোমার সঙ্গে আমি একমত নই।
হলওয়ার্ড বললেনঃ ওর কথা শোনো না, ডোরিয়েন। তুমি কী বলছ তা আমি বুঝতে পারছি। এই মেয়েটির ওপরে আমার আস্থা রয়েছে। অপরূপা ছাড়া আর কাউকেই তুমি ভালোবাসতে পার না। মেয়েটির সম্বন্ধে এইমাত্র তুমি যা বললে সেই সমস্ত গুণ যার মধ্যে রয়েছে সে নিশ্চয় চরিত্রের দিক থেকে সুন্দরী এবং বুচিসম্পন্না। নিজের যুগকে উন্নত করা নিশ্চয় একটা সৎ কাভ। আত্মা বলে যাদের কিছু নেই তাদের মধ্যে মেয়েটি যদি আত্মার প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যারা চিরকাল ঘৃণ্য আর কুসিত পরিবেশের মধ্যে বাস করে এসেছে তাদের মনে মেয়েটি
যদি সৌন্দর্যের পরশ বুলিয়ে দিতে সক্ষম হয়, মেয়েটি যদি তাদের স্বার্থপরতার উর্ধে তুলে ধরতে, আর অপরের দুঃখে তাদের চোখে জল আনাতে পারে তাহলে বুঝতে হবে সে তোমার ভালোবাসার যোগ্য–শুধু তুমি নয়, সারা পৃথিবী। তোমাদের এই বিয়ের বিরুদ্ধে বলার কিছু নেই। প্রথমে এতটা আমি ভাবিনি; কিন্তু এখন আমি বেশ বুঝতে পারছি যে তোমার নির্বাচনের মধ্যে কোনো গলদ নেই। কেবল তোমার জন্যেই ভাবান সাইবিল ভেনকে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। ওকে বাদ দিলে তোমার জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
তাঁর হাতের ওপরে চাপ দিয়ে ডোরিয়েন বললেনঃ ধন্যবাদ। আমি জানতাম যে তুমি আমাকে বুঝতে পারবে। হ্যারি বড়ো সিনিক। বিশ্বের কোনো ভালোই ওর চোখে পড়ে না। ওর। কথা শুনলে আমি কেমন ভয় পেয়ে যাই। কিন্তু ওই অরকেস্ট্রা শুরু হয়েছে, বাপরে, বাপ; কী। ভয়ঙ্কর শব্দ! তবে পাঁচ মিনিটের বেশি নয়; তারপরেই ওটা থেমে যাবে। তারপরেই যবনিকা। উঠবে; স্টেডের ওপরে দেখতে পাবে সেই মেয়েটিকে যাকে আমার সমস্ত জীবন আর যৌবন সমপর্ণ করতে যাচ্ছি আমার মধ্যে যা কিছু ভালো আর সুন্দর রয়েছে যাকে আমি আগেই সব দিয়ে দিয়েছি।
মিনিট পনেরো পরে ঘন-ঘন করতালির মধ্যে সাইবিল ভেন স্টেজের ওপরে এসে দাঁড়াল। হ্যাঁ; কথাটা ঠিক। মেয়েটির বড়ো চমৎকার দেখতে লর্ড হেনরির মনে হল এমন সুন্দর মেয়ে। জীবনে তিনি খুব কমই দেখেছেন। তার সেই লাজুক ভঙ্গিমা আর চকিত চাহনির মধ্যে একটা মাদকতা রয়েছে। উৎসাহী দর্শকে পরিপূর্ণ প্রেক্ষগৃহের দিকে একবার তাকাতেই একটা মৃদু লজ্জার আভাস তার মুখের ওপরে ছড়িয়ে পড়ল; মনে হল, রুপোর আনার ওপরে একটা। গোলাপ ফুলের ছায়া পড়েছে। সামনে থেকে কয়েক পা সে পিছিয়ে গেল, মনে হল তার ঠোঁট দুটো কাঁপছে। বেসিল হওয়ার্ড দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিতে লাগলেন। তার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন ডোরিয়েন গ্রে; মনে হল তিনি যেন স্বপ্ন দেখছেন। চশমার ভেতর দিয়ে তাকাতে-তাকাতে লর্ড হেনরি বলে উঠলেনঃ চমৎকার, চমৎকার!
দৃশ্যটা ছিল ক্যাপুলেত-এর বাড়ির বড়ো একখানা বসার ঘর। মারকসিযো আর কিছু বন্ধুবান্ধব নিয়ে দরবেশের পোশাক পরে রোমিযা সেখানে ঢুকল। স্টেজের পেছনে বাজনা বেজে উঠল, শুরু হল নাচ। একদল অতি সাধারণ, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নোংরা মলিন। পোশাক পরা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মাঝখানে সাইবিল ভেন লোকান্তরের মানুষের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগল। জলের মধ্যে বেতস লতা যেমনভাবে দোলে নাচের তালে-তালে, তার দেহটাও সেইরকম দুলতে লাগল, কখনো সামনে, কখনো পেছনে। তার গলার আদলটা সাদা শালুকের গলার মতো বাঁকানো; মৃদু হিল্লোলে দুলতে লাগল। মনে হল, হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি হয়েছে তার হাত দুটি।
তবু কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল সাইবিল। রোমিযাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ডলিযেট-এর মলে যে আনন্দের সঞ্চার হয়েছিল সে রকম কোনো আনন্দ সাইবিলের চোখে-মুখে, চলনে-বলনে ফুটে উঠল না। কিছু কথা তাকে অবশ্য বলতে হল হে দরবেশ, হাত দুটির ওপরে তুমি যথেষ্ঠ অন্যায় করছ। এই হাত দুটি দিয়ে মানুষ তার মনের ভক্তি জানায়। কারণ, তাদের হাত দুটি সাধুদের হাত স্পর্শ করে এবং তীর্থযাত্রা শেষ করে এসে তীর্থযাত্রীরা সেই হাত ভক্তিভরে চুম্বন করে।
এর পরেও কয়েকটি কথা তার বলার ছিল; সেগুলি-ও সে বলল; কিন্তু সেই বলার মধ্যে আবেগ। দেখা গেল না–মনে হল সবটাই কৃত্রিম। কথাগুলি অপরূপ মিষ্টি; কিন্তু আবেগ প্রকাশের দিক থেকে সেগুলি ব্যর্থ, ব্যঞ্জনার দিক থেকে দ্যুতিহীন। কাব্যের সমস্ত মাধুর্যই নষ্ট হয়ে গেল তাতে, অবাস্তব মনে হল জুলিয়েতের উচ্ছ্বাস।
