অর্থের কথা বাদ দিলেও, মানুষকে অন্যভাবে দাম দিতে হয়।
কী ভাবে, বেসিল?
ধর, অনুতাপের দাম, দুঃখ-যন্ত্রণার দাম… নৈতিক অবনতির দাম।
কাঁধে স্রাগ করে লর্ড হেনরি বললেন, প্রিয় বন্ধু, মধ্যযুগের কথা খুব মনোমুগ্ধকর। কিন্তু মধ্যযুগের অনুভূতিগুলি বর্তমান যুগে অচল অবশ্য, সেই অনুভূতিগুলিকে নভেল-নাটকে চালানো যায়। কিন্তু নভেল-নাটকে স্থান পায় কারা? বর্তমান যুগের বাস্তব পটভূমিকায় যারা অচল। বিশ্বাস কর, এমন কোনো সভ্য মানুষ নেই যে আনন্দের জন্যে অনুতাপ করে, আর এমন কোনো সভ্য মানুষ নেই সত্যিকার আনন্দ বলতে কী বোঝায় সে-বিষয়ে যার বিন্দুমাত্র জ্ঞান রয়েছে।
ডোরিয়েন গ্রে বললেন, আমি জানি আনন্দ কাকে বলে। আনন্দ হচ্ছে কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসা।
লর্ড হেনরি ফুল নাড়তে নাড়তে বললেন, ভালোবাসা পাওয়ার চেয়ে ভালোবাসা অবশ্যই ভালো। কারো পুজো পাওয়াটা হচ্ছে জঘন্য জিনিস। মানুষরা দেবতাদের যে চোখে দেখে, নারীরাও সেই চোখে পুরুষদের দেখে থাকে। তারা সব সময় আমাদের পুজো করে; আর সেই অজুহাতে তাদের জন্যে কিছু করার জন্যে সব সময় আমাদের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে।
ডোরিয়েন একটু গম্ভীরভাবেই বললেনঃ আমার ধারণা, আমাদের চরিত্রে প্রেমের প্রতিষ্ঠা করে তারা; আমাদের কাছ থেকে সেই প্রেম চাওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে।
হলওয়ার্ড বললেন; খাঁটি কথা, ডোরিয়েন।
লর্ড হেনরি বললেন, কোনো জিনিষই চিরকাল খাঁটি নয়, বেসিল।
বাধা দিলেন ডোরিয়েন; অর্থাৎ, এ কথাটা তোমাকে স্বীকার করতেই হবে হ্যারি, যে নারীরা তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ জিনিস পুরুষদের উপহার দেয়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লর্ড হেনরি বললেন, সম্ভবত, কিন্তু টুকরো টুকরো করে সেইটাই তারা ফিরে পেতে চায়। আমাদের দুশ্চিন্তাটা সেখানেই। কোনো একজন ধীসম্পন্ন ফরাসি ভদ্রলোক একবার বলেছেন-বড়ো কাজ করার জন্যে মহিলারা সব সময় আমাদের উৎসাহিত করে। কিন্তু সেই কাজ আমরা যখন করতে যাই তখনই চরম বাধা আসে তাদের কাছ থেকে।
হ্যারি, তোমার কথাগুলি বড়ো ভয়ঙ্কর। আমি জানি নে তোমাকে আমি এত পছন্দ করি কেন।
তিনি বললেন, তুমি আমাকে সব সময় পছন্দ করবে ডোরিয়েন। একটু কফি চলবে? ওয়েটার, কফি নিয়ে এস; সেই সঙ্গে নিয়ে এস সেরা শ্যাম্পেন আর সিগারেট না, না, সিগারেট থাক। আমার কাছে কয়েকটা রয়েছে। বেসিল, আমি তোমাকে সিগার খেতে হবে না। একটা সিগারেট খাওয়া নিখুঁত আনন্দ তোমাকে একটি নিখুঁত সিগারেটই দিতে পারে। এই জিনিসটি অপরূপা খেয়েও তৃপ্তি পায় না মানুষ। আর কী চাই আমরা? হ্যাঁ, ডোরিয়েন, আমাকে তুমি সব সময় পছন্দ করবে। আজ পর্যন্ত যে সব পাপ করার সাহস তোমার হয়নি, তোমার কাছে সেই সব পাপের প্রতীক আমি।
সিগারেট ধরাতে-ধরাতে ডোরিয়েন বললেন; কী সব আবোল-তাবোল বকছো হ্যারি! চল, এবারে আমরা থিয়েটারের দিকে এগোই, সাইবিল স্টেজে এসে দাঁড়ালেই নতুন জীবনের মুখোমুখি এসে দাঁড়াবে তোমরা। সে এমন একটি জীবন তোমাদের সামনে তুলে ধরবে যা তোমরা আগে কোনোদিন দেখনি।
ক্লান্ত দৃষ্টি মেলে লর্ড হেনরি বললেন, আমি সব জানি, কিন্তু সব সময় আমি নতুন-নতুন অনুভূতি সংগ্রহ করার জন্যে প্রস্তুত হয়ে থাকি। অথচ, বলতে আমি ভয় পাচ্ছি, সেবকম। কোনো অনুভূতির সাক্ষাৎ আমি পাইনি। তবু হয়তো তোমার এই অপরুপা আমার মধ্যে কিছুটা উদ্দীপনার সৃষ্টি করতে পারে। আমি অভিনয় ভালোবাসি। বাস্তব জীবনের চেয়ে এ অনেক বেশি সত্য। চল, আমরা যাই। ডোরিয়েন, তুমি আমার সঙ্গে এস। আমি দুঃখিত। বেসিল, কিন্তু আমার গাড়িতে দুজনের বেশি জায়গা হবে না। গাড়িতে করে আমাদের পিছুপিছু এস।
তাঁরা উঠে পড়লেন, কোট চাপালেন গায়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কফি খেতে লাগলেন। ইল চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন; কী যেন ভাবছিলেন তিনি। একটা বিষাদের ছায়া তাঁর ওপরে নেমে এসেছিল। এই বিয়েটাকে কেমন যেন মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি; অথচ তাঁর মনে হল ডোরিয়েনের জীবনে যেসব ঘটনা ঘটতে পারত তাদের অনেকের চেয়ে এটা ভালো। কয়েক মিনিট পরে, তাঁরা সবাই নীচে নেমে এলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি একাই গাড়িতে। উঠলেন; সামনে দেখলেন লর্ড হেনরির গাড়িতে আলো চকচক করে উঠল। অদ্ভুত একটা। স্কৃতির অনুভূতি তাঁকে গ্রাস করে ফেলল। তাঁর মনে হল আগের মতো ডোরিয়েন আর তাঁর নিজের হবেন না। তাঁদের মধ্যে নতুন একটি জীবন এসে দাঁড়িয়েছে। তাঁর চোখের দৃষ্টি কালো হয়ে এল; উজ্জ্বল আলোয় ভরা জনাকীর্ণ রাস্তাগুলি কেমন যেন ঝাপসা হয়ে এল তাঁর চোখে গাড়িটা থিয়েটারে এসে হাজির হলে তাঁর মনে হল তিনি যেন অনেকগুলি বছর পেরিয়ে এসেছেন।
.
সপ্তম পরিচ্ছেদ
কী জানি কেন সেদিন রাত্রিতে প্রেক্ষাগৃহ লোকে গিজগিজ করছিল। মেদবহুল ইহুদি ম্যানেজার দরজার সামনে এসে তাঁদের অভ্যর্থনা জানাল; চাটুকারের ভীরু হাসি তার মুখের একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত ঝলসে উঠল জোরে-ডোরে কথা বলতে-বলতে আর হিরের আংটি পরা হাত দোলাতে-দোলাতে বিনযের অবতার সেডে সে তাঁদের নির্ধারিত বকস-এ নিয়ে গেল। লোকটিকে ডোরিয়েন গ্রে-র কোনো দিনই ভালো লাগত না। সেদিন আরো খারাপ লাগল। তাঁর মনে হল মিরান্দার সন্ধানে এসে তিনি ক্যালিব্যানের মুখোমুখি পড়ে গিয়েছেন। লর্ড হেনরির অবশ্য তাকে ভালোই লাগল। অন্তত সেই রকমের একটা ইঙ্গিত করে তার সঙ্গে করমর্দন করার বারবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সেই সঙ্গে একথাটাও বলতে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না যে এমন একটি মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় তিনি গর্ববোধ করছেন যে সত্যিকার প্রতিভাময়ী একটি অভিনেত্রীকে আবিষ্কার করেছে এবং একজন কবির জন্যে যে দেউলিয়ার খাতায় নাম লিখিয়েছে। একতলায় গতে সমবেত দর্শকবৃন্দের মুখের দিকে তাকিয়ে হলওয়ার্ড দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে মজা করতে লাগলেন। অতিরিক্ত গরম আবহাওয়াটা সহ্য করতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল তাঁদের; বিরাট সূর্যটিকে মনে হচ্ছিল গাঢ় পীত রঙের দানবীয় আকৃতির একটি ডালিয়া ফুলের পাপড়ির মতো। গ্যালারিতে যে যুবকগুলি বসেছিল তাদের কোট আর ওয়েস্ট কোট খুলে হাতলের ওপরে রেখে। দিল। থিয়েটারের ভেতরে তারা নিজেদের মধ্যে চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে কথা বলাবলি করছিল, জমকালো পোশাক পরে তাদের পাশে যে সব মেয়েরা বসেছিল তাদের সঙ্গে তারা। কমলালেবু ভাগাভাগি করে খাচ্ছিল। গর্তের মধ্যে কয়েকটি মহিলা হাসছিল। তাদের গলার স্বর কেবল তীব্রই নয়, অনেকটা বেসুরো-ও মদের দোকান থেকে ছিপি খোলার শব্দও ভেসে আসছিল।
