হলওয়ার্ড আস্তে-আস্তে বললেন: হ্যাঁ, ডোরিয়েন, মনে হয় তুমি ঠিক কথাই বলেছ।
লর্ড হেনরি জিজ্ঞাসা করলেন: তোমার সঙ্গে তার কি আড় দেখা হয়েছে?
ডোরিয়েন গ্রে মাথা নাড়লেন; আমি তাকে আর্ডেনের বনভূমিতে ছেড়ে এসেছি, ভেরোনার উদ্যানে আমি আবার তাকে খুঁজে পাব।
গভীর মনোনিবেশ সহকারে লর্ড হেনরি তাঁর শ্যাম্পেনের গ্লাসে চুমুক দিতে লাগলেন।
ঠিক কোন মুহূর্তে তুমি বিয়ের কথাটা উচ্চারণ করলে ডোরিয়েন? সেই বা কী উত্তর দিল? সম্ভবত, কিছুই মনে নেই তোমার।
প্রিয় হ্যারি, বিয়েটাকে আমি ব্যবসাদারী চোখে দেখিনি; আর এ-বিষয়ে কোনো প্রস্তাবও আমি তাকে দিইনি তাকে যে আমি ভালোবাসি এই কথাটাই কেবল তাকে আমি বলেছি। সে বলেছে, আমার স্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা তার নেই। যোগ্যতা নেই! শোনো কথা! আমার কাছে পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যাকে আমি তার সঙ্গে তুলনা করতে পারি।
লর্ড হেনরি বিড়বিড় করে বললেন, বাস্তববুদ্ধিতে নারীজাতির সঙ্গে কারও তুলনাই চলে না। আমাদের চেয়ে তারা অনেক বেশি বুদ্ধিমতী। ওইরকম অবস্থায় বিয়ের কথাটা বলতে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই–তারা আমাদের সেই কথাটাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
হলওয়ার্ড তাঁর হাতের ওপরে একটা হাত চাপিযে বললেন: থাক হারি। ডোরিয়েনকে বিরক্ত করছ তুমি। অন্য পুরুষদের সঙ্গে ওর তুলনা করো না। ও কারো জীবনে দুঃখ ডেকে আনবে না। ওরে চরিত্রটি বেশ সুন্দর, মার্জিত।
টেবিলের উলটো দিকে তাকিয়ে লর্ড হেনরি বললেন: ডোরিয়েন কোনোদিনই আমার ওপরে বিরক্ত হয় না। আমার প্রশ্নের মধ্যে কোনোরকম কুটিলতা নেই; অথবা, প্রশ্নটা আমি করছি খোলা মনে। প্রশ্নের কারণটা হচ্ছে নিছক কৌতূহল। আমার ধারণা, বিয়ের ব্যাপারে মহিলারাই আমাদের কাছে প্রস্তাব তোলে প্রথম। আমরা তাদের কাছে কোনো প্রস্তাব রাখিনে। অবশ্য মধ্যবিত্ত সম্প্রদাযের কাছে এ-রীতিটা খাটে না। কিন্তু মধ্যবিত্ত সম্প্রদাযকে আমরা আধুনিক বলিনে।
হেসে মাথা নাড়লেন ডোরিয়েনঃ তোমাকে নিয়ে পারা গেল না, হ্যারি; কিন্তু তোমার কথায় আমি কিছু মনে করিলে। তোমার ওপরে রাগ করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। সাইবিল। ভেনকে দেখলে তুমি বুঝতে পারবে, একমাত্র জানোয়ার ছাড়া আর কেউ তাকে দুঃখ দিতে পারে না। আমি তাকে সোনার চৌকিতে দাঁড় করিয়ে দেখতে চাই আমার স্ত্রীকে বিশ্বের লোক পুজো করছে। বিয়েটা কী বল তো? একটা চুক্তি, একটা প্রতিজ্ঞা–যাকে কোনো অবস্থাতেই ভাঙা যায় না। তুমি আমার কথা শুনে হাসছ? না, না, হেস না। একটি অপরিবর্তনীয় চুক্তিই তার সঙ্গে আমি করতে চাই। ভালোবাসাকে মানুষ কী করে যে অপমান করে তা আমি। ভঘনিলে। আমি সাইবলি ভেনকে ভালোবাসি। তার আস্থা আমাকে বিশ্বাসী করে তুলেছে, করে তুলেছে সৎ। তার পাশে বসে থাকলে তুমি আমাকে যা শিখিযে তার জন্যে অনুতাপ করি আমি। তোমরা আমাকে যা জান আমি তখন আর ঠিক সে রকমটি থাকিনে। আমার সব কিছু পালটে যায়। সাইবিল ভেন-এর একটু ছোঁওযা আমাকে সব ভুলিয়ে দেয়; ভুলিয়ে দেয় তোমার মনোমুগ্ধকর চিত্তাকর্ষী, বিষাক্ত, মুখরোচক নীতিগুলি।
কিছু স্যালড নিজের দিকে টেনে নিয়ে লর্ড হেনরি জিজ্ঞাসা করলেন, এবং ওগুলি কি…
ওই জীবন, প্রেম, এবং আনন্দের ওপরে তোমার নীতিগুলির কথাই বলছি। হ্যারি, কেবল ওইগুলি নয়, তোমার যাবতীয় নীতি।
আস্তে-আস্তে সুরেলা কণ্ঠে লর্ড হেনরি বললেন, আনন্দই হচ্ছে একমাত্র জিনিস যার সম্বন্ধে কিছু নীতিকথা বলা যায়। কিন্তু এ-নীতি আমার নিজস্ব নয–প্রকৃতির। প্রতি এই আনন্দের মারফতেই মানুষকে যাচাই করে যে আনন্দ করতে ভানে তাকেই প্রকৃতি সমর্থন করে। সুখী হলেই আমরা সৎ হব, কিন্তু সৎ হলেই যে আমাদের সব সময় সুখী হতে হবে এমন কোনো কথা নেই।
বেসিল হলওয়ার্ড জিজ্ঞাসা করলেন; কিন্তু “সৎ হওয়া” কথাটার অর্থ কী বল তো?
টেবিলের ওপরে টবে রাখা ঘন ফুলগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে লর্ড হেনরির দিকে চোখ চিরে তাকাতে-তাকাতে চেয়ারের গায়ে হেলান দিয়ে ডোরিয়েন গ্রে বললেনঃ ঠিক, ঠিক, “সৎ হওয়া” বলতে কী বোঝ তুমি তাই আমাদের বল।
গ্লাসের পাতলা কাচের ওপরে নিজের সুন্দর একটি আঙুলের চাপ দিয়ে লর্ড হেনরি বললেন, সৎ-হওয়া আর নিজের আত্মার সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেওয়া একই কথা অন্য লোকের সঙ্গে যে একাত্মতা তারই মধ্যে বিভেদের বীজ লুকিয়ে থাকে। মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় হল তার নিজের জীবন। প্রতিবেশীদের কথা যদি ধর, তাহলে প্রযোভল হলে তাদের লক্ষ্ণ করে তুমি অনেক নৈতিক উপদেশের বাণী ছাড়তে পার। তা ছাড়া, উঁচু আদর্শ বলতে আমরা যা বুঝি। তা রয়েছে একমাত্র ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রের। যুগের মাণদণ্ডই হচ্ছে আধুনিক নীতিজ্ঞানের মাপকাঠি। আমার মনে হয় কোনো মানুষের পহেই তার যুগের মাপকাঠি মেনে নেওয়াটা হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অনৈতিক কাজ।
বেসিল হলওয়ার্ড বললেনঃ অত্যি কথা বলতে কি হ্যারি, কেউ যদি নিছক নিজের জন্যেই, বেঁচে থাকে তাহলে কি তাকে যথেষ্ট মূল্য দিতে হয় না?
নিশ্চয়। আজকাল প্রতিটি জিনিসের জন্যই আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়। আমার ধারণা, দরিদ্রদের সত্যিকার ট্র্যাজিডি হচ্ছে নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকেই তারা বঞ্চিত করতে পারে না। সমস্ত কিছু সুন্দর জিনিসের মতোই সুন্দর পাপ করার অধিকার আর সুযোগ একমাত্র ধনীদেরই রয়েছে।
