হ্যারি, এতক্ষণ ধরে তুমি যা বললে তার একটি বর্ণ-ও তুমি নিজে বিশ্বাস কর না। বিশ্বাস যে কর না তা তুমি নিজেই জাল। ডোরিয়েন গ্রে-র জীবন যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তোমার চেয়ে বেশি দুঃখ আর কেউ পাবে না। তুমি যা দেখাও তার চেয়ে তুমি অনেক উঁচু।
লর্ড হেনরি হেসে বললেন: অন্য লোক যে ভালো একথা আমরা চিন্তা করি কেন জান? কারণ, নিজেরাই আমরা নিজেদের ভয় করি। অপরের ভালো দেখার ভিত্তি হচ্ছে নিছক ভীতি। আমাদের উপকারে আসতে পারে এই এইরকম কিছু গুণ অন্য লোকের মধ্যে খুঁজে বার করে আমরা তাদের প্রশংসা করি; ভাবি, এটাই আমাদের বিরাট একটা বদান্যতা। ব্যাঙ্কারকে আমরা প্রশংসা করি এই উদ্দেশ্যে যে আমরা প্রয়োজনমতো আমাদের সঞ্চিত অর্থের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যাঙ্ক থেকে তুলতে পারব। দস্যুদের বীরত্বের প্রশংসা করি এই ভরসায় যে তারা আমাদের পকেটটা রেহাই দেবে। আমি যা বললাম তা আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। মানুষের ভবিষ্যৎ উজ্জল–এই আশাবাদকে আমি যথেষ্ট ঘৃণা করি। আর জীবন নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা যদি বল তাহলে এটুকু আশ্বাস তোমাকে আমি দিতে পারি যে যে-জীবনের গতি রুদ্ধ হয়নি তার বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মানুষের প্রকৃতিকে যদি তুমি ধ্বংস করতে চাও তাহলে তাকে শুধু সংস্কার করে দাও। বিয়ের কথা যদি বল তাহলে অবশ্য মূর্খত হবে; কিন্তু বিয়ে বাদ দিয়েও নর-নারীর মধ্যে অনেক রকম সম্পর্ক গড়ে ওঠে; এই সম্পর্কগুলি। কেবল যে মনোরম তাই নয়, এগুলি আমাদের কৌতূহল-ও উদ্রেক করে যথেষ্ট। এইগুলি যারা গড়ে তোলে তাদের নিশ্চয়ই আমি উৎসাহিত করব। ফ্যাশানেবল বলে স্বীকৃতি পাওয়ার যথেষ্ট যোগ্যতা রয়েছে তাদের। কিন্তু ডোরিয়েন সশরীরে হাজির হয়েছে, আমার চেয়ে অনেক দক্ষতার সঙ্গে সে তোমাকে ব্যাপারটা বোঝাতে পারবে।
সার্টিনের পালক-দেওয়া টুপিটা মাথা থেকে খুলে এবং দুজনের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে করমর্দন করে ডোরিয়েন উৎসাহের আতিশয্যে বলে উঠল: প্রিয় হ্যারি, প্রিয় বেসিল, তোমরা নিশ্চয়। আমাকে অভিনন্দন জানাবে। এত আনন্দ জীবনে আর কোনোদিনই আমি পাইনি। অবশ্য এর জন্য কোনোরকম প্রস্তুতি ছিল না; সত্যিকার সুখের জিনিসগুলি এইরকম। আকস্মিকভাবেই আমাদের কাছে হাজির হয়। তবু মনে হয় এইরকম একটি আনন্দকেই আমি এতদিন ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
উত্তেজনায় আর আনন্দে তার চোখমুখ লাল হয়ে উঠল; দেখতে তাকে অপরূপ দেখাল।
হলওয়ার্ড বললেন, আশা করি, ডোরিয়েন, সব সময়েই তুমি খুব সুখী হবে। কিন্তু তোমার বিয়ে যে ঠিক হয়ে গিয়েছে একথা তুমি আমাকে জানাওনি বলে আমি তোমাকে মা করতে পারব না। সে-সংবাদ হ্যারিকে তুমি দিয়েছ।
ছোকরাটির কাঁধে হাত রেখে হাসতে-হাসতে লর্ড হেনরি বললেন: এবং ডিনারে আসতে দেরি করার জন্যে আমি তোমাকে ক্ষমা করব না ডোরিয়েন। এখন এস, বসে পডি। এখানকার খাবার কীরকম খেতে তাই পরীক্ষা করি এস। তারপরে তোমার কাহিনি বলো।
ছোটো টেবিলের চারপাশে গোল হয়ে বসতে-বসতে ডোরিয়েন বলল: বেশি বলার সত্যিই কিছু নাই। কী হয়েছিল সেইটাই সোজা কথায় বলছি। গতকাল সন্ধ্যায় হ্যারি তোমার ঘর থেকে বেরিয়ে আমি পোশাক বদলালাম; রুপার্ট স্ট্রিটের যে রেস্তোরাঁতে আমাকে তুমি নিয়ে গিয়েছিলে সেখানে ডিনার খেতে ঢুকলাম। ডিনার সেরে রাত প্রায় আটটা নাগাদ আমি থিয়েটারে হাজির হলাম। রোজালিনড-এর ভূমিকায় অভিনয় করছিল সাইবিলা অবশ্য দৃশ্যপট একদম জঘন্য ছিল; আর প্রায় সেইরকম ছিল অরল্যানডো। কিন্তু সাইবিল! সে-অভিনয় তোমরা দেখলে খুশি হতাম আমি। ছেলের পোশাক পরে সে যখন স্টেজে এসে নামল তখন তাকে যা দেখাচ্ছিল কী আর বলব! শ্যাওলা রঙের ফতুয়ার সঙ্গে সরু পায়জামা পরেছিল সে; মাথায় ছিল দামি পাথর বসানো বাজপাখির একটা পালক গায়ের ওপরে। উড়ানো ছিল ফিকে লাল লাইনটানা একটা ঢিলে জামা। এমন অপরুপ সাজে আর কখনো। তাকে আমি দেখিনি। বেসিল, তোমার স্টুডিওতে তানাগ্রা যুবতীর যে অপরুপ ছবি রয়েছে। ঠিক সেইরকম দেখতো একটা বিবর্ণ গোলাপের চারপাশে ঘন কালো পাতার আচ্ছাদনের মতো তার ভ্রমরকৃষ্ণ চুলের রাশি তার মুখের চারপাশে জড়ানো ছিল। তার অভিনয়ের কথা যদি বল তা সে নিজেদের চোখেই আজ তোমরা দেখতে পাবে। একেবারে ভাত আর্টিস্ট। বলতে যা বোঝা যায় সাইবিল সেই জাতীয় অভিনেত্রী। সেই ছোটো ঘিঞ্জি জাযগায় আমি তো একেবারে অভিভূতের মতো বসে রইলাম। আমি যে ঊনবিংশ শতাব্দীর লন্ডনে বসে রয়েছি সেকথা আমি একেবারে ভুলেই গেলাম। যে-অরণ্য কেউ কোনোদিন দেখেনি, মনে হল সেই অরণ্যের ভিতরে আমি আমার প্রেমিকার সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অভিনয় শেষ হওয়ার পরে আমি নীচে নামলাম; তারপরে সাজঘরে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বললাম। আমরা যখন দুজনে পাশাপাশি বসেছিলাম তখন হঠাৎ তার চোখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন অবাক হয়ে। গেলাম। তার চোখের ওই রকম চাহনি আগে কোনোদিন আমার চোখে পড়েনি। আমার ঠোঁট দুটি তার দিকে এগিয়ে গেল। দুজনেই দুজনকে গভীর আবেগের সঙ্গে চুমু খেলাম। সেই মুহূর্তে আমি যে কেমন বিভোর হয়ে গেলাম সে কথা তোমাদের আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না। মনে হল, আমার সমস্ত জীবন, সমস্ত যৌবন গোলাপী আনন্দের একটি মুহূর্তে কেন্দ্রীভূত হল। সাদা নর্সিসাস ফুলের মতো সে থরথর করে কাঁপতে লাগল। তরপরে সে হাঁটু মুড়ে বসে। আমার হাতে চুমু খেল। এসব কথা অবশ্য তোমাদের বলে লাভ নেই, তবু না বলে আমি পারছি নে। অবশ্য আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা এখনো খুব গোপন রয়েছে। এমন কি, সে তার মাকেও একথা জানায়নি। জানি নে, আমার অভিভাবকরাই বা কী বলবেন। লর্ড ব্র্যাডলি নিশ্চয় খুব চটে যাবেন। আমার তাতে কিছু আসে যায় না। সাবালক হতে আমার আর এক বছর-ও নেই; তারপরে খুশিমতো যা ইচ্ছে তাই করতে পারবা বেসিল, তোমার কি মনে হয় কাব্যলোক থেকে প্রেমিকাকে সরিয়ে এনে আমার স্ত্রীকে শেকসপীয়রের নাটকে অভিনয় করার সুযোগ দেওয়াটা আমার পষ্কে উপযুক্ত হবে না? শেকসপীয়রের বাণী যে গোপনে। আমার কানের কাছে ফিস ফিস করে বলছে। রোজালিনড-এর দুটি বাহু যে আমার গলা জড়িয়ে ধরেছে, আমি যে জুলিয়েটের ঠোঁটে চুমু খেয়েছি।
