ভয় দেখানোর এই অনাবশ্যক মূর্খতা, উচ্ছ্বাস, আর উন্মত্ত নাটকীয় ঢঙ ভদ্রমহিলার কাছে জীবনটাকে আরো স্মৃষ্ট করে তুলল। এইরকম একটি আবহাওয়ার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। এই আবহাওয়ার তিনি আরো সহজ ভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারতেন; আর অনেক দিন পরে সেই প্রথম ছেলেকে তিনি সত্যি-সত্যিই প্রশংসা করলেন। উচ্ছ্বাসভরা এই পরিস্থিতি আরো কিছুক্ষণ কাটানোর ইচ্ছে ছিল তাঁর; কিন্তু সে-সুযোগ তিনি পেলন না; পুত্ৰই তাঁকে থামিয়ে। দিল। তখলো ট্রাঙ্কটা নামানো হয়নি; খোঁজা হয়নি ‘মাফলার’। বাস-করার অনেক টুকিটাকি জিনিস এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে ছিল। গাড়োযানের সঙ্গে দর কষাকষি করতে হল; খুঁটিনাটি কাজের অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেল। ছেলে গাড়িতে উঠে চলে যাওয়ার পরে, নতুন ব্যর্থতায ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানালা থেকে ছেঁড়া রুমালের একটা টুকরো নিয়ে নাড়তে লাগলেন। তিনি বেশ বুঝতে পারলেন একটা বড়ো রকমের সুযোগ নষ্ট হয়েছে। সাইবিলকে এই বলে তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন যে বর্তমানে তাঁর আর কাজ নেই, তিনি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন; কারণ, এখন লক্ষ রাখার মতো একটি সন্তানই তাঁর কাছে রয়েছে। ছেলের কথাটা তাঁর মনে ছিল। কথাটা তাঁকে খুশিই করেছিল। ছেলে যে ভয় দেখিয়েছিল সে-বিষয়ে মেয়েকে তিনি কিছুই বলেননি। কথাটা জিম বেশ সপষ্ট করে আর নাটকীয় ভঙ্গিতেই বলেছিল। তাঁর মনে হয়েছিল এই কথাটা নিয়ে একদিন সবাই তাঁরা হাসাহাসি করবেন।
.
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
ব্রিস্টল হোটেলের একটি ছোটো কামরায় সেদিন সন্ধ্যায় কেবল তিনজনের জন্যে ডিনার দেওয়া হয়েছিল। বেসিল হলওয়ারর্ডের সঙ্গে সেই ঘরে ঢুকতে-ঢুকতে লর্ড হেনরি ডিজ্ঞাসা করলেন: বেসিল, তুমি নিশ্চয় খবরটা শুনেছ?
একজন ওয়েটার মাথা নীচু করে তাঁদের অভিবাদন জানাল; সেই ওযেটারের হাতে টপি আর কোটটা দিয়ে আর্টিস্ট হলওয়ার্ড বললেন; না, হ্যারি। কী খবর বল তো? আশা করি রাজনীতির ব্যাপার কিছু নয়? ও-সব খবরে আমার আগ্রহ নেই। হাউস-অফ-কমনস-এ এমন একজন সদস্যও নেই যার প্রতিকৃতি আঁকা চলতে পারে; যদিও অবশ্য, কিছুটা পালিশ করলে তাদের ভালোই দেখায়।
লর্ড হেনরি বললেন: ডোরিয়েন গ্রে বিয়ে করতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।
চমকে উঠলেন হলওয়ার্ড; তারপরে ভ্রুকুটি করলেন, বললেন: কী বললে! ডোরিয়েন গ্রে বিয়ে করতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে? অসম্ভব, অসম্ভব!
না, সত্যি; যাকে বলে নির্ভেজাল সত্যি।
কাকে বিয়ে করবে?
একটি খুদে অভিনেত্রী বা ওই জাতীয় কোনো মেয়েকে।
আমি বিশ্বাস করতে রাজি নই। এসব ব্যাপারে ডোরিয়েন অনেক বেশি বুদ্ধিমান।
প্রিয় বেসিল, বরং বলতে পার মাঝে-মাঝে বোকার মতো কাজ না করার মতো ডোরিয়েন বুদ্ধিমান।
হ্যারি, মাঝে-মাঝে করার মতো কাজ বিয়েটা মোটেই নয়।
লর্ড হেনরি ক্লান্তভাবে বললেন: আমেরিকা ছাড়া। কিন্তু আমি বলিনি সে বিয়ে করেছে আমি বলেছি নিজের বিয়ে সে নিজেই ঠিক করে ফেলেছে। দুটোর মধ্যে পার্থক্য অনেক। আমার কথাই ধর না কেন। কবে আমার বিয়ে হয়েছে সেকথাটা আমার সপষ্ট মনে রয়েছে, কিন্তু কবে আমি বিয়ে করব বলে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলাম সেকথা আমি স্রেফ ভুলে গিয়েছি। আমার যেন। মনে হচ্ছে, বিয়ে করতে আমি কোনোদিনই চুক্তিবদ্ধ হইনি।
কিন্তু ডোরিয়েনের সম্পদ, জন্ম, আর সামাজিক প্রতিষ্ঠার কথাটা একবার চিন্তা করে দেখা তার সামাজিক পদমর্যাদার এত নীচের কাউকে বিয়ে করাটা তার পহেল্ক হাস্যকর হবে।
বেসিল, মেয়েটিকে সে বিয়ে করুক এটা যদি তুমি চাও, তাহলে সে কথাটা তাকে তুমি বলতে পার। তাহলে সে মেয়েটিকে নিশ্চয় বিয়ে করবে। যখনই মানুষ আকাট মূখের মতো কাজ করে তখনই বুঝবে তার পেছনে তার কোনো মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে।
আশা করি মেয়েটি ভালো। কোনো দুশ্চরিত্রাকে ডোরিয়েন বিয়ে করুক তা আমি চাই নে; তাতে তার চরিত্র নষ্ট হবে; নষ্ট হবে তার বুদ্ধি।
অরেঞ্জ-বিটার মেশানো ভারমুথের গ্লাসে চুমুক দিতে-দিতে লর্ড হেনরি বললেন: না, না; মেয়েটি ভালোর চেয়েও ভালো; সে সুন্দরী।ডোরিয়েন বলছে-মেয়েটি সুন্দরী। এসব ব্যাপারে সাধারনত তার ভুল হয় না। তুমি যে তার ছবিটি এঁকে তাই দেখে অন্য লোকের সৌন্দর্য তার চোখে ধরা পড়েছে। অনেক জিনিসের মধ্যে অপরের সৌন্দর্য উপলব্ধি করার মতো শক্তি তার রয়েছে। আর রাত্রিতে মেয়েটিকে দেখার কথা রয়েছে আমাদের, যদি অবশ্য ছোকরা এখানে আসার কথা বেমালুম ভুলে যায়।
তুমি কি সিরিয়াস?
নিশ্চয়, বেসিল। বর্তমানে আমি যতটা সিরিয়াস তার চেয়ে বেশি সিরিয়ান্স আর কখনো আমি হতে পারি একথা ভাবতেই আমার কষ্ট হচ্ছে
ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে-করতে ঠোঁটে কামড় দিয়ে বেসিল হলওয়ার্ড ডিজ্ঞাসা করলেন: কিন্তু এ-বিয়েতে কি তোমার মত রয়েছে? নিশ্চয় না। এটা একটা অর্থহীন মোহ ছাড়া আর কিছু নয়।
অনুমোদন অথবা অননুমোদন-বর্তমানে আমি কিছুই করিনে। জীবনের সম্বন্ধে এই ধরনের চিন্তা করাটা উদ্ভট। আমাদের নৈতিক কুসংস্কারকে ঢাক পিটিয়ে জাহির করার জন্যে পৃথিবীতে আমরা জন্মগ্রহণ করিনি। সাধারণে এ বিষয়ে কী বলে তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাই নে; আর মনোহর মানুষেরা যা করে তার মধ্যে আমরা নাক গলাই নে। মনোমুগ্ধকারী ব্যক্তি যে কাজ যে ভাবেই করুক না কেন আমি তাতে আনন্দ পাই। ডোরিয়েন একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছে। মেয়েটি জুলিয়েট-এর ভূমিকায় অভিনয় করে। মেয়েটিকে সে বিয়ে করার প্রস্তাব। দিয়েছে। তাতে আপত্তি কী? সে যদি মেসালিনাকে বিয়ে করত তাতেই বা কী ক্ষতি হত। তুমি। ডান বিয়ের সমর্থক আমি নই। বিয়ের সবচেয়ে অসুবিধে হচ্ছে এই যে বিয়ে করলে মানুষ। নিঃস্বার্থপর হয়; আর যে সব মানুষ স্বার্থের কথা চিন্তা করে না, চরিত্রের দিক থেকে তারা। বিবর্ণ। তাদের ব্যক্তিত্ব বলে কোনো বস্তু নেই। তবু এমন কয়েকটি মানসিক বৃত্তি রয়েছে বিয়ে যাদের ভটিলতর করে তোলে। এই সব মানুষরা তাদের অহমিকা বজায় রাখে; আর সেই অহমিকার সঙ্গে আরো অনেক দম্ভ মিশিয়ে দেয়। বিবাহিত ব্যক্তিরা একাধিক জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। বিয়ের পরে তারা বেশ ভালোভাবেই সংঘবদ্ধ হয় এবং আমার মতে, এই সংঘবদ্ধতাই হচ্ছে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য। তা ছাড়া, প্রতিটি অভিজ্ঞতারই দাম রয়েছে; এবং বিয়ের বিরুদ্ধে যে যাই বলুক, নিঃসন্দেহে এটি একটি অভিজ্ঞতা। আমি আশা করি ডোরিয়েন এই মেয়েটিকে বিয়ে করবে, দু’মাস পাগলের মতো ভালোবাসবে-তারপরে আর কেউ তাকে মোহগ্রস্ত করে ফেলবে। অনুশীলনের জন্যে ডোরিয়েন একটি অদ্ভুত চরিত্রে পরিণত হবে।
