আর সে?
সেও চিরকাল।
স্বার্থের খাতিরে তাই তার করা উচিত। সাইবিল তার কাছ থেকে একটু সরে গেল; তারপরে হেসে তার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে ধরলা ভিম সত্যিই বড়ো ছেলেমানুষ।
মার্বেল আর্চের কাছে এসে তারা একটা বাস ধরল। এসটেন রোড-এ বাডির কাছাকাছি একটা জায়গায় নেমে গেল তারা। বিকাল পাঁচটার পরেই তারা ফিরে এল। থিয়েটারে যাওয়ার আগে ঘন্টা-দুই সাইবিলকে বিশ্রাম নিতে হবে, স্রেফ বিছানার ওপরে গড়াগড়ি দিতে হবে তাকে। বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে জিমও বারবার তাকে চাপ দিল। সে বলল তার মা একটু সরে গেলেই সে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাবে। অন্যথায়, মা কান্নাকাটি করে শেষ পর্যন্ত একটা কাণ্ড করে তুলবে। কান্নাকাটি করে হইচই করাটাকে সে একদম বরদাস্ত করতে পারে না।
সাইবিলের ঘরেই তারা পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিল। ছেলেটির মনের মধ্যে হিংসার একটা বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল, তাদের দুজনের মধ্যে এই তৃতীয় ব্যক্তিটির আগমন সে মোটেই বরদাস্ত করে উঠতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, আগন্তুকটির সঙ্গে দেখা হলে সে তাকে খুন করে ফেলতে পারত। তবু, যখন সাইবিল দুটি হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল, তার চুলের ভেতর দিয়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তাকে চুমু খেল তখনই তার মনটা নরম হয়ে গেল; সত্যিকার ভালোবাসা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল; সেও আদুরে ভাই-এর মতো বোনকে চুমু খেল। সিড়ি দিয়ে নীচে নেমে এল তারা; চোখের জলের ভেতর দিয়ে বিদায় নিল।
তার জন্যে নীচে তার মা অপেক্ষা করছিলেন। সে ঘরে ঢুকতেই, দেরি করার জন্যে মা গজ গজ করতে লাগলেন। কোনো উত্তর না দিয়ে জিম খেতে বসল। খাওয়ার আয়োজন এমন কিছু ছিল না। কিন্তু তা-ও তার খুব ভালো লাগল বলে মনে হল না। চারপাশে মাছি ভন ভন করতে লাগল; দু’চারটে টেবিলের ওপরে লাগল ঘুরতো রাস্তায় যানবাহনের হট্টগেল; এদের মধ্যে দিয়েই তার বিদাযের শেষ কটি মুহর্ত ধীরে-ধীরে নিঃশোষিত হতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে সে খাবারের থালাটা সরিয়ে রাখল; মাথাটাকে দুটো হাতের চেটো দিয়ে চেপে ধরল। তার মনে হল ওদের মধ্যে কী ঘটছে তা বিশেষভাবে জানার অধিকার তার রয়েছে এ ব্যাপারটা তাকে আরো আগেই ডানানো উচিত ছিল। তাহলে সে বুঝতে পারত সে যা সন্দেহ করেছে সেটা সত্যি কি না। ছেলের অকস্মাৎ এই ভাবালুতায় মা ভয় পেয়ে তার দিকে তাকিয়ে। রইলেন। যান্ত্রিকভাবেই তাঁর কথা বন্ধ হয়ে গেল, একটা ছেঁড়া ন্যাকড়ার রুমাল তিনি আঙুলে জড়াতে লাগলেন। ঘড়িতে ছটা বাজল। জিম ধীরে ধীরে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তারপরে সে ঘুরে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে তাকাল। চোখাচোখি হল দুজনের। জিম দেখল মা তাকে সব জিনিসটা হন্ডুমার চোখে দেখতে অনুরোধ করছেন। এই মনে হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সে চটে উঠল।
মা, তোমাকে কিছু বলার রয়েছে আমার।
মা-র চোখ দুটি ঘরের মধ্যে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল। কোনো উত্তর দিলেন না তিনি।
মা, আমাকে সত্যি কথা বলা কথাটা জানার অধিকার রয়েছে আমার বাবার সঙ্গে কি তোমার বিয়ে হয়েছিল?
ভদ্রমহিলা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। বুকের বোঝা অনেকটা হালকা হয়ে গেল তাঁর। এতদিন ধরে, দিনে আর রাতে, সপ্তাহ আর মাস ধরে সে মুহর্তটির জন্যে আতঙ্কিত হৃদয়ে তিনি অপেক্ষা করে দিন গুনছিলেন সেই চরম মুহূর্তটি তাঁর সামনে এসে হাজির হয়েছে। যতই কদর্য হোক, প্রশ্নটি সোডা, সোডা উত্তরই দিতে হবে তাঁকে। এই রকম একটি অবস্থার। জন্য কোনোরকম প্রস্তুতি ছিল না। জিম-এর প্রশ্নটি অকস্মাৎ; কেবল অকস্মাৎ-ই নয়, একেবারে যাকে বলে অমার্জিত; অনেকটা নাটকের খারাপ রিহার্সালের মতো।
ভীবনের সহজ বর্বর গতির কথা চিন্তা করে অবাক হয়েছিলেন তিনি। এটাই যেন জীবনের একমাত্র সত্য; কিন্তু কেন যে এই বর্বরতা মানুষ মেনে নেয়, বা মেনে নিতে বাধ্য হয়, তা ডানার মতো দই→তা তাঁর ছিল না, অনেক সহজ ডিলিসের মতো এটাও একটা বর্বর সত্য।
না; বিয়ে হয়নি।
দুটো হাত শক্ত করে ঘুষি পাকিযে ছেলেটি চিৎকার করে উঠল: আমার বাবা তাহলে একটি স্কাউনড্রেল।
ঘাড় নাড়লেন তিনি বললেন: না, আমি জানতাম, সামাজিকভাবে বিয়ে তিনি আমাকে করতে পারতেন না। সেদিকে থেকে যথেষ্ট অসুবিধে ছিল তাঁর। কিন্তু আমরা দুজনেই দুজনকে ভালোবাসতাম। বেঁচে থাকলে, নিশ্চয় তিনি আমাদের জন্যে ব্যবস্থা করে যেতে পারতেন। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করো না, বাছা; তিনি তোমার বাব এবং ভদ্রলোক। তাছাড়া, অভিজাত ছিলেন তিনি।
ভ্রুকুটি করল জিম: আমার জন্যে কিছুই আমি গ্রাহ্য করিনে। কিন্তু সাইবিলকে তুমি কিছুতেই…এও তো একজন ভদ্রলোক-তাই ন্য-ওই যে লোকটি সাইবিলকে।
ভালোবাসে–অথবা, বলে সে ভালোবাসে? তাছাড়া, মনে হচ্ছে–বেশ অভিজাত সমপ্রদায়ের মানুষ-তাই না?
হঠাৎ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা। একটা ভয়ঙ্কর রকমের ক্লেদাক্ত অপমান তাঁকে স্তব্ধ করে দিল। লজ্জায় মাথাটা নুয়ে পড়ল তাঁর। হাত দুটো কাঁপতে লাগল। সেই কাঁপানো হাত দিয়ে চোখ দুটো তিনি মুছলেন, বললেন: সাইবিলের মা রয়েছে। আমার মা ছিল না।
মায়ের কথা শুনে জিমের মন নরম হয়ে গেল, সে তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে নীচু হয়ে তাঁকে চুমু খেল; বলল: বাবার কথা জিজ্ঞাসা করে তোমাকে যদি কষ্ট দিয়ে থাকি তার জন্য আমি দুঃখিত, মা। কিন্তু জিজ্ঞাসা না করে পারলাম না। এখন আমাকে যেতেই হবে। ভুলে যেয়ো না যে এখন থেকে লক্ষ রাখার মতো একটি সন্তানই তোমার কছে রইল; আর এটাও তুমি বিশ্বাস। করো যে সেই লোকটা আমার বোনের যদি এতটুকু ক্ষতি করে, আমি নিশ্চয় খুঁজে বার করব। তাকে, তারপর কুকুরের মতো গুলি করে মারা প্রতিজ্ঞা করছি আমি।
