জিম গম্ভীরভাবেই বলল: তিনি ভদ্রলোক…
গানের ঢঙে সাইবিল বলল: ভদ্রলোক কি বলছ–বল-রাজকুমার-প্রিন্স। আর বেশি তুমি কী চাও?
তিনি তোমাকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধতে চান।
তার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার আশঙ্কায় আমি কাঁপি।
আমি চাই তাঁকে তুমি এড়িয়ে চল।
তাকে দেখা পাওয়ার অর্থই হচ্ছে তাকে পুজো করা; তাকে যে ভানে সে তাকে বিশ্বাস না করে। পারে না।
সাইবিল, তুমি উন্মাদের মতো কথা বলছ।
সাইবিল হেসে তার একটা হাত ধরে বলল: ভাই জিম, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে বয়স। তোমার একশো বছরের কাছাকাছি সময় আসবে যেদিন তুমি নিজেকেই নিজে ভালোবেসে। ফেলবে। তখন তুমি বুঝতে পারবে ভালোবাসা কী বস্তু। অতটা মুখ গম্ভীর করে রেখো না। যদিও তুমি চলে যাচ্ছ, তবু যাওয়ার সময় এই কথাট ডেনে যাও যে আগের চেয়ে এখন আমি অনেক সুখী। তোমাকে এবং আমাকে দুজনকেই বেশ কষ্টের ভিতর দিয়ে জীবন কাটাতে হয়েছে। কিন্তু এখন সেই কষ্টের সমাপ্তি। তুমি পেযে একটি নতুন জগতের সন্ধান, আমি পেযেছি একটি নতুন জীবনের সন্ধান। দুটি চেয়ার আমাদের সামনে রয়েছে পাতা। এস, আমরা এদের ওপরে বসে চালাক-চতুর মানুষদের আসা-যাওয়া দেখি।
একদল উৎসুক দর্শকদরে চোখের সামনে তারা দুটি চেয়ার দখল করে বসল। রাস্তার ওপরে একরাশ আগুন রঙের লাল ফুল গোল করে কাঁপছে। মহিলাদের চকচকে রৌদ্রনিবারণী ছাতাগুলি বাতাসে কাঁপছে দেখে মনে হচ্ছে যেন বিরাট-বিরাট প্রভাপতির দল নেচে-নেচে বেড়াচ্ছে।
সাইবিলের অনুরোধে জিম তার ভবিষ্যতের অনেক আশা-ভরসার কথা বলতে লাগল। বেশ কষ্ট করেই সে ধীরে-ধীরে মুখ খুলল। তারপরে দুজনেই কথায় মেতে উঠল। বেশ অস্বস্তি বোধ করছিল সাইবিল। নিজের আনন্দের কথা কিছুতেই খুলে বলতে পারছিল না। ভাই-এর কাছ থেকে কোন সহানুভূতির কথা সে শুনতে পায়নি। তার কথা শুনে সে মাঝে-মাঝে একটু আধটু ভ্রূকুটি করছিল মাত্র। কিছুক্তণ পরে সাইবিল নিজেই চুপ করে গেল। হঠাৎ ডোরিয়েন গ্রে-র সোনালি চুল আর হাসিমাখা মুখখানা তার চোখ পড়ল। একটা খোলা গাড়িতে চেপে দুটি মহিলার সঙ্গে গ্রে তাদের পাশ দিয়ে চলে গেল।
সাইবিল উত্তেজনায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে বলল: ওই যে সে।
জিম জিজ্ঞাসা করল: কার কথা বলছ?
অপসৃয়মান গাড়িটির দিকে তাকিয়ে সাইবিল বলল: প্রিন্স চার্মিং।
জিম লাফিয়ে উঠল; তারপর সাইবিলের একটা হাত ধরে জোরে নাড়া দিয়ে বলল: কোথায়, কোথায়? কোনটি তোমার প্রিন্স চার্মিং? বল-বল। তাকে আমি দেখবই।
কিন্তু দেখা বা দেখানোর সুযোগ কোনোটাই হল না। ঠিক সেই মুহূর্তে বারউইকসএর ডিউকের চার ঘোড়ার গাড়িটি দু’দলের মাঝখানে এসে হাজির হল। পথ যখন পরিষ্কার হল তখন ডোরিয়েনের গাড়িটি পার্কের এলাকা ছাড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।
দুঃখের সঙ্গে সাইবিল বলল: সে চলে গিয়েছে। তাকে যদি তুমি দেখতে পেতে আমি তাহলে খুব খুশি হতাম।
দেখতে পাওয়া উচিত ছিল আমার, কারণ, ভগবানের দিব্যি করে বলছি, ওর হাতে যদি তোমার কোনো ক্ষতি হয় তাহলে ওকে শেষ করে ছাড়ব।
কথাটা শুনে সাইবিল তার ভাই-এর দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইল। জিম সেই কথাটাই আবার বলো ধারালো ছুরির মতো কথাগুলি বাতাসের বুকে কেটে-কেটে বসল। আশপাশের লোকেরা তাদের দিকে তাকিয়ে রইল হাঁ করে। সাইবিলের পাশে দাঁড়ানো একটি মহিলা তো মুখ চিপে ফিক ফিক করে হেসেই উঠল।
চারপাশের অবস্থা দেখে সাইবিল ফিসফিস করে বলল: জিম, চলে এস।
জিম ভিড়ের ভিতর দিয়ে সাইবিলের পিছু পিছু এগোতে লাগল। সে যে ওই কথাগুলি বলতে পেরেছে তাতেই সে খুশি।
অ্যাকিলিস-এর মূর্তির কাছাকাছি আসার পরে, সাইবিল ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখের মধ্যে এতক্ষণ করুণার একটা ছায়া লুকিয়ে ছিল; সেইটাই এবারে তার ঠোঁট দুটির ওপরে হাসির। ছটায় রূপান্তরিত হল। জিম-এর দিকে তাকিয়ে মাথায় ঝাঁকানি দিয়ে সে বলল: জিম, তুমি বোকা; শুধু বোকাই নও, একেবারে যাকে বলে নিরেট গর্দভ, বদমেজাজী। এসব কথা তুমি উচ্চারণ কর কেমন করে? কী বলছ তা তুমি জান না! তুমি কেবল হিংসুটেই নও, বড়ো কঠিন। আমি চাই তুমিও প্রেমে পড়া একমাত্র প্রেমই মানুষকে ভালো করে। এইমাত্র তুমি যা বললে সে-সব কথা দুষ্ট লোকেরা বলে থাকে।
জিম বলল: আমার বয়স ষোল। আমি কি বলছি তা আমি জানি। কোনোদিন দিয়ে মা তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারছে না। তোমাকে কী ভাবে মানুষ করতে হবে সে-সম্বন্ধে মায়ের কোনো ধারণা-ও নেই। ঠিক এই সময় অস্ট্রেলিযা না যেতে পারলেই খুশি হতাম আমি। সব জিনিসটা বেশ ভালো করে তলিয়ে দেখার ইচ্ছা ছিল আমার। কিন্তু কাগজপত্র সব সই হয়ে গিয়েছে। বিপদটা সেইখানেই।
না, না জিম। অত ভাববার দরকার নেই। মা যে সব রম্য-নাটক অভিনয় করতে ভালোবাসত, তুমি সেই সব নাটকেরই নায়কের মতো কথা বলছ তোমার সঙ্গে ঝগড়া আমি করব না। আমি তাকে দেখছি, তাকে দেখেই আমার মন-প্রাণ আনন্দে ভরে উঠেছে। কোনোদিনই আমরা ঝগড়া করব না। আশা করি, আমি যাকে ভালোবাসি তার কোনো ক্ষতি করবে, না। আমার এ ধারণা ঠিক তো?
জিম গম্ভীরভাবে বলল:অবশ্য যতক্ষণ তুমি তাকে ভালোবাসবে ততক্ষণ।
সাইবিল একটু চেঁচিয়ে আর বেশ জোর দিয়েই বলল; আমি তাকে চিরকাল ভালোবাসব।
