অথবা, না। জিম আদৌ হয়তো সোনার খনির দিকে যাবে না। এই খনিগুলি বড়ো খারাপ জাযগা। এসব জায়গায় যারা কাজ করে তারা সব সময়ে মদ খেয়ে চুর হয়ে থাকে। সেই মত্ত। অবস্থায় সরাইখানায় তারা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে, মুখ খিস্তি করে। হয়তো সে যাবে কোনো মেষপালকের খামারে। কোনো কোনো এক সন্ধ্যায় যখন সে ঘোড়ায় চড়ে খামারে। ফিরবে এমন সময় সে হয়তো দেখতে পাবে কোনো দস্যু কালো পোশাক পরে একটা কালো ঘোড়ার পিঠে চডিযে একটি ধনীর অপরুপ সুন্দরী মেয়েকে চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছে। সেই দেখে সে দস্যুকে তাড়া করবে, উদ্ধার করে আনবে মেয়েটিকে। তারপরে নিশ্চয় মেয়েটি তার প্রেমে পড়ে যাবে, জিমও ভালোবেসে ফেলবে তাকে। শেষ পর্যন্ত সেই মেয়েটিকে বিয়ে করে প্রচুর সম্পদ নিয়ে ফিরে আসবে জিম, লন্ডনে বিরাট একটি প্রাসাদ নিয়ে বসবাস করবে। হ্যাঁ, নিশ্চয় অনেক প্রাচুর্য, অনেক আনন্দ জিমের জন্যে অপেক্ষা করে রয়েছে কিন্তু তাকে চরিত্রের দিক থেকে ভালো হতে হবে, মেজাজটিকে রাখতে হবে শরিফ; মুখের মতো অর্থনষ্ট করলে তার চলবে না, জিমের চেয়ে সে মাত্র এক বছরের বড়ো; কিন্তু সাংসারিক অভিজ্ঞতা তার অনেক, অনেক বেশি। প্রতিটি ডাকে সে যেন তাকে চিঠি দে, আর প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে সে যেন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে। ভগবান খুব ভালো, তিনি নিশ্চয় তাঁর দিকে লক্ষ্য রাখবেন। সে নিজেও তার ভাই-এর জন্যে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানাবে। কয়েকটা বছরের মধ্যে জিম বেশ ধনী আর সুখী হয়ে ফিরে আসবে।
ছেলেটি গম্ভীর হয়ে তার কথা শুনছিল; কিন্তু কোনো উত্তর দিল না। বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার চিন্তায় তার মনটা খুব খারাপ হয়েছিল।
তবু ওই একটা ব্যাপারই তাকে বিষণ্ণ করেনি। সাংসারিক অভিজ্ঞতা তার যথেষ্ট না থাকলেও, সাইবিলের পেশায় যে বিপদ রয়েছে সে-সম্ভাবনাটাও কেমন যেন তাকে বিব্রত করে তুলেছিল। ওই যে ভদ্রবেশধারী যুবকটি তার সঙ্গে প্রেম করে চলেছে সেটা তার কাছে মঙ্গলজনক না-ও হতে পারে। যুবকটি ভদ্রলোক; বিশেষ করে সেই জন্যেই জিম তাকে ঘৃণা করে, যদিও এর পেছনে ঠিক কী কারণ রয়েছে তা সে বুঝতে পারে না; হয়তো শ্রেণিবিদ্বেষই এর মূল কারণ। তার মায়ের বুদ্ধি আর চিন্তাশক্তি যে যথেষ্ট কম সে-বিষয়েও তার সন্দেহ কম ছিল না। বিশেষ করে সেই কারণে বিপদে পড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা সাইবিলের রয়েছে বলে সে মনে করত। শিশুরা তাদের বাবা-মাকে ভালোবেসেই জীবন শুরু করে। ব্যস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা তাঁদের বিচার করতে শুরু করে; কখনো-কখনো তাঁদের দোষ তারা ক্ষমাও করে।
তার মা! একটা প্রশ্ন মাকে তার করার ইচ্ছা ছিল, অনেক দিন ধরে এই প্রশ্নটা সে মনের গভীরে লুকিয়ে রেখেছিল থিয়েটারে একদিন হঠাৎ কথাটা তার কানে গিয়েছিল, একদিন সে যখন থিয়েটারের দরজায় অপেক্ষা করছিল সেই সময় কিছু লোক কথাটা নিয়ে হাসাহাসি। করছিল। সেই হাসির টুকরো সে শুনতে পেয়েছিল। মনে হল, কে যেন তার মুখের ওপরে সুপাং করে একটা চাবুক কষিয়ে দিয়েছে। তার কপালে কুঞ্চিত হল এবং একটা মারাত্মক রকমের যন্ত্রণাকে সহ্য করার জন্যে সে তার নীচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেছিল।
সাইবিল; আমার কথা কিছুই তোমার কানে ঢুকছে না, জিম। তোমার ভবিষ্যৎ জীবনের কী সুন্দর পরিকল্পনাই তোমার জন্যে আমি তৈর করে দিচ্ছি। কিছু বল।
কী শুনতে চাও তুমি?
সাইবিল ভাই-এর দিকে চেয়ে হেসে বলল: তুমি বেশ লক্ষ্মী ছেলে হবে, আর আমাদের ভুলে যাবে না।
জিম তার কাঁধে একট স্রাগ করল, তারপরে বলল: তুমিই বরং আমাকে তাড়াতাড়ি ভুলে যাবে সাইবিল; অন্তত সেদিক থেকে যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
সাইবিলের মুখ লাল হয়ে উঠল: তুমি ঠিক কী বলতে চাচ্ছ জিম?
শুনছি, তোমার একটি নতুন বন্ধু হয়েছে। সে কে? তার বিষয়ে তুমি আমাকে কিছু বলনি কেন? তাকে দিয়ে তোমার কোনো মঙ্গল হবে না।
সাইবিল চেঁচিয়ে উঠল: জিম, তুমি থাম, তার বিরুদ্ধে কোনো কথা তুমি বলবে না, আমি তাকে ভালোবাসি।
জিম বলল: ভালোবাসা? সাবাস! তুমি তার নামটা পর্যন্ত জান না। কে সে? তার পরিচয় কী? এসব জানার অধিকার আমার রয়েছে।
তাকে সবাই প্রিন্স চার্মিং বলে ডাকে। এ-নামটা তোমার পছন্দ হয় না? বোকা ছেলে কোথাকার। এ নামটা ভুলে যাওয়া তোমার উচিত নয়। তাকে একবার চোখে দেখলে তোমার মনে হত অমন সুন্দর, অপরূপ মানুষ পৃথিবীতে আর বুঝি নেই। একদিন তার সঙ্গে তোমার। দেখা হবে; অবশ্য অস্ট্রেলিয় থেকে ফিরে আসার পূরে; খুব ভালো লাগবে তোমার। সবাই তাকে পছন্দ করে; আর আমি…আমি তাকে ভালোবাসি। তুমি যদি আজ থিয়েটারে আসতে পারতে! সে আজ আসছে। আজ আমি ভুলিযেট-এর ভূমিকায় অভিনয় করব। উঃ, কী রকম অভিনয় করব বল তো? ডিমি, ভেব দেখ, সত্যিকার প্রেমে পড়ে জুলিয়েট-এর অভিনয় করব আমি। সে থিয়েটারে বসে আমার অভিনয় দেখবে তাকে আনন্দ দেওয়ার জন্য অভিনয় করব আমি। ভয় হচ্ছে, আমি হয়তো দর্শকদের ভয় পাইয়ে দেব; প্রেমে পড়লেই মানুষ তার স্বাভাবিকতার বেড়া ডিঙিয়ে কিছুটা অস্বাভাবিক হয়ে যায়। আর ওই হতভাগ্য বদমেজাজী আইস্যাকস তার বার-এ যে সব তৃতীয় শ্রেণির মানুষরা মদ খেতে ঢোকে তাদের কাছে আমার অভিনয়ের প্রশংসা করে বলবে–একটি প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী। এতদিন সে আমাকে প্রচার করেছিল গোঁড়া বলে এখন সে প্রচার করে আমি একটি ঐশ্বরিক শক্তিধারিণী প্রতিভা বিশেষ। আমি তা বেশ বুঝতে পারছি। আর এ-সমস্তই কেবল তারই জন্যে–সেই প্রিন্স চার্মিং-এর। কিন্তু তার উপযুক্ত আমি নই? দরিদ্র আমি! দরিদ্র? তাতে কী যায় আসে? ঘরের। দরজা দিয়ে যখন দারিদ্র্য হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে আসে, প্রেম তখন ডানালার ভেতর দিয়ে উড়ে যায়। আমাদের এই প্রবাদ বচনটিকে নতুনভাবে লিখতে হবে। মানুষের দুঃখের দিনে এই প্রবচনটি রচিত হয়েছিল; এখন সুখের দিন আমার-বসন্তের মাতাল করা দিন; নীল আকাশের বুক ফুলের সমারোহ জাগার দিন।
