জেমস উত্তর দিল, চাকরির জীবনটাকে আমি ঘৃণা করি, বিশেষ করে কেরানির চাকরি। কিন্তু তুমি ঠিক কথাই বলেছ। নিজের পেশা আমি নিজেই ঠিক করে নিয়েছি। মোদ্দা কথাটা হচ্ছে, সাইবিলের ওপরে লক্ষ রেখো। তার যেন কোনো ক্ষতি না হয় মা, তার দিকে নজর রেখো।
জেমস, তোমার কথা শুনে অবাক হচ্ছি। তার ওপরে নিশ্চয় আমি লক্ষ রাখি।
শুনলাম একটি ভদ্রলোক নাকি প্রতিদিন থিয়েটারে আসেন, আর তার সঙ্গে কথা বলার জন্যে। স্টেডের পিছলে যান। এ সংবাদ কি সত্যি? এ বিষয়ে কী বল তুমি?
জেমস, তুমি কি বলছ তা তুমি নিজেই জান না। আমাদের পেশায় আমাদের যাঁরা গুণমুগ্ধ তাঁদের অভ্যর্থনা জানাতে আমরা অভ্যস্ত। একসময় আমি নিজেও অনেক ফুলের তোড়া। উপহার পেয়েছি। সে-যুগে সত্যিকার অভিনয় কাকে বলে মানুষ তা বুঝত। সাইবিলের কথা যদি বল, আমি জানি না ওদের এই আলাপ সত্যিকার সিরিয়াস, কি সিরিঘাস নয়। কিন্তু যুবকটি যে সত্যিকার ভদ্র সেদিক থেকে আমার কোনো সন্দেহ নেই। আমাকে সে খুব শ্রদ্ধা করে। তাছাড়া দেখলে মনে হয় ছেলেটি ধনী, যে সব ফুল সে আমাদের পাঠায় সেগুলিও খুব সুন্দর।
জেমস কর্কশ স্বরেই বলল, যদিও তুমি তার নাম জান না।
মুখের চেহারা কোনো রকম বিকৃত না করেই মা বললেন, না। ছেলেটি তার আসল নামটা পর্যন্ত আমাকে এখনো বলেনি। মনে হচ্ছে, এই না-বলাটাই তার একটা আনন্দ ছেলেটি সম্ভবত অভিজাত শ্রেণির
নিজের ঠোঁট কামড়াল জেমস, শুধুমাত্র বলল, ওর দিকে লক্ষ রেখো মা, ওর ওপরে লক্ষ রেখো।
বাছা, তোমার কথা শুনে আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি। সাইবিল সব সময় আমার বিশেষ নজরের মধ্যে রয়েছে। অবশ্য এই ছেলেটি যদি ধনী হয় তাহলে, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতেই বা সাইবিল ইতস্তত করবে কেন? আমার বিশ্বাস ছেলেটি অভিজাত সম্প্রদায়ের পাত্র হিসাবে সাইবিলের পহেল্ক ছেলেটি হবে পয়লা নম্বরের। দুজনে মিলবেও ভালো, যাকে বলে রাজযোটক মিলা ছেলেটি দেখতেও বেশ ভালো। সবাই তা লক্ষ করেছে।
নিজের মনে মনে বিড় বিড করতে লাগল জেমস, তারপরে জানালার কাছে এগিয়ে গিয়ে শার্সির ওপরে আঙুলের টোকা দিতে লাগল। কিছু বলার জন্যে ঘুরে দাঁড়াতেই সে দেখল। দরজটা খুলে গিয়েছে, সেই খোলা দরজার ভেতর দিয়ে সাইবিল দৌড়ে আসছে।
সে বলল, তোমরা দুজেনি দেখছি বেশ গম্ভীর। বলি, ব্যাপারটা কী?
জেমস বলল, ও কিছু নয়। মাঝে মাঝে মানুষের কিছুটা সিরিয়াস হওয়া উচিত। মা, আমরা চললাম। সন্ধে পাঁচটার সময় আমি ডিনার খাব। একমাত্র শার্ট ছাড়া, আর সবই গোছানো হয়ে গেছে। তোমার কোনো অসুবিধে হবে না।
একটু কষ্টকল্পিত গাম্ভীর্যের সঙ্গে মা বললেন, এস।
জেমস যে ভাষায় তাঁর সঙ্গে কথা বলছিল তাতে তিনি সত্যিই বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তার চোখের মধ্যে এমন একটা জিনিস তিনি দেখছিলেন যেটা তাঁকে রীতিমতো শঙ্কিত করে তুলেছিল।
সাইবিল বলল, আমাকে একটা চুমু দাও, মা।
এই বলে সে তার ফুলের মতো নরম দুটি ঠোঁট দিয়ে তার মায়ের শুকনো গালের হাড়ের ওপর চুমু খেল। তাঁর ঠান্ডা গাল দুটিকে উষ্ক করে তুলল।
কাল্পনিক দর্শকের অন্বেষণে ওপরের দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিমায় মা বললেন, বাছা, বাছা আমার!
জেমস অস্থির হয়ে বলল, এস সাইবিল।
মায়ের এই স্নেহ প্রবণতাকে সে কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারল না।
বাতাসে কাঁপানো সূর্যের আলোতে তারা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, হাঁটতে লাগল। নিরানন্দ উসটন রোড ধরে। একটি সুন্দরী পোশাকে-চললে পরিচ্ছন রুচির মেয়ের পাশে ওই রকম। বেখাপ্পা পোশাক পরা গম্ভীর মোডের বিষণ্ণ একটি যুবককে হাঁটতে দেখে পথচারীরা একটু অবাক হয়েই তাদের দিকে তাকাতে লাগল। তাদের মনে হল যেন একটি গোলাপ ফুলের সঙ্গে একটা সাধারণ মালি হেঁটে চলেছে।
অপরিচিত কোনো মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টির ওপরে চোখ পড়ার ফলে অস্বস্তি বোধ করতে লাগল জিম, মাঝে মাঝে কুটিও করল। অদ্ভুত চেহারার মানুষদের কৌতূহলী দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাস সাধারণ মানুষরা কোনো দিনই ছাড়তে পারে না। শেষ জীবনে জিনিয়াসরা এই দৃষ্টির জ্বালায তিতিবিরক্ত হয়ে ওঠেন। সেই রকমের একটা অনুভূতি। জিমকেও আচ্ছন্ন করে ফেলল। সাইবিলের অবশ্য অন্য কথা। পথচারীদের ওপরে সে যে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে সে-বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিল না। প্রেমের আবেগ হাসির উচ্ছ্বাসে তার ঠোঁট দুটিকে কাঁপিয়ে তুলেছিল। সে তখন প্রিন্স চার্মিং-এর কথাই ভাবছিল। তার সম্বন্ধে বেশি চিন্তা করার জন্যে তাঁকে নিয়ে মুখে কোনো আলোচনা করল না। সাইবিল। আলোচনা করল কেবল জিম-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে, যে-জাহাজে চড়ে সে যাবে সেই জাহাজ নিয়ে, বিদেশে গিয়ে সে যে প্রচুর সোনা রোজগার করবে সেই সোনা নিয়ে, দুষ্টপ্রকৃতির রেড-ইন্ডিয়ানদের হাত থেকে যে অপরুপ সুন্দরী রাজকুমারীকে সে উদ্ধার করবে–সেই ভাবনা নিয়ে। কারণ, একটি সাধারণ নাবিক অথবা সুপার-কারগো অথবা এখন সে যে কাজের জন্যে যাচ্ছে সেইটুকু নিয়েই সে জীবন কাটাবে না। না, না, নিশ্চয় না। নাবিকের ভীবন বড়ো কষ্টকর। একটা ডাহাড়ের খোলের মধ্যে বন্ধ হয়ে থাকটা কি ভীষণ কষ্টকর। চারপাশে সমুদ্রের তরঙ্গ, হাডার হাডার সেই তরঙ্গ বিরাট বিরাট ঝুটি বাগিয়ে ফুলে-ফুঁসে চারপাশে সমুদ্রের তরঙ্গ, হাজার হাজার সেই তরঙ্গ বিরাট বিরাট ঝুটি বাগিয়ে ফুলে-ফুঁসে চারপাশ থেকে ধাক্কা দিচ্ছে জাহাঙটাকে। কখনো কখনো বা কালো কালো দৈত্যদানব ঝড়ের ঝাপটায় পাল ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। নাবিকের জীবন সে যে কত ভয়ঙ্কর, কত বিপজ্জঙ্ক তা একবার ভেবে দেখুন। মেলবোর্নে সে ডাহাজ থেকে নামবে, ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা সোনার খনিতে হাজির হবে। এক সপ্তাহ কাটার আগেই একতাল খাঁটি সোনা সে পেয়ে যাবে। আজ পর্যন্ত অত বড়ো তাল কেউ খুঁজে পায়নি। ছ‘জন সশস্ত্র অশ্বারোহী পুলিশের তত্ত্বাবধানে সেই তালটা রেলগাড়িতে চাপিয়ে। সমুদ্রোপকূলে নিয়ে আসা হবে। বনে-বাদাড়ে যে সব ডাকাতরা লুকিয়ে থাকে সেই সোনা। ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যে তারা অন্তত বার তিনেক গাড়িটাকে আক্রমণ করবে। কিন্তু তাদের আক্রমণ প্রতিহত হবে। অনেক হতাহতকে পেছনে গেলে পালিয়ে যাবে তারা।
