বৎসে, প্রেমে পড়ার কথা চিন্তা করার মতো ব্যস তোমার এখনো হয়নি। তাছাড়া এই ছেলেটির সম্বন্ধে কতটুকুই বা তুমি ডান? তার নামটা কি তা-ও পর্যন্ত তুমি জান না। এসব কথা আলোচনা করার এতটুকু সময়, বিশেষ করে জেমস এখন অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছে কত জিনিস ভাবতে হচ্ছে আমাকে। আশা করেছিলাম ঠিক এখনি তুমি বুঝে শুনে চলবে। যাই হোক, তোমাকে আমি আগেই বলেছি, ছেলেটি যদি ধনী হয়…
মা, মা। টাকা-পয়সার কথা ছাড়, আমাকে সুখী হতে দাও।
মিসেস ভেন মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, এবং নকল নাটকীয় ভঙ্গিমায়, যে ভঙ্গিমাটি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের স্টেডের ওপরে স্ববাবসিদ্ধ কলাকৌশলের সঙ্গে প্রকাশ করতে হয়, তিনি মেয়েকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজাটা খুলে গেল। ঘরের মধ্যে ঢুকে এল একটি যুবক, মাথার চুলগুলি তার উসকো-খুসকো, কটা রঙের। চেহারার বাঁধুনি শক্ত, হাত আর পা বেশ লম্বা, চলার ভঙ্গিমাটা বেশ সাবলীল নয়। বোনের মতো পরিচ্ছন্ন ভাবে সে মানুষ হয়ে ওঠেনি। দুজনের মধ্যে যে একটা নিকট সম্পর্ক রয়েছে হঠাৎ দেখলে তা বোঝা বেশ কষ্টকর। মিসেস ভেন ছেলেটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, মুখের ওপরে ছড়িয়ে। পড়ল সিটি। মনে মনে ছেলেটিকে তিনি রঙ্গমঞ্চের দর্শকদের ভূমিকাতে দেখতে লাগলেন। তিনি নিশ্চিত হলেন যে মূকনাটকটি ভালোই জমেছে।
ছেলেটি মিষ্টি সুরে একটু বিক্ষোভ জানিয়ে বলল, তোমার কয়েকটা চুমু আমার জন্যে রেখো, সাইবিল।
সাইবিল বলল, তাই বুঝি! কিন্তু কেউ তোমাকে চুমু খেলে তো তোমার ভালো লাগে না। তুমি। একটি দুষ্ট বৃদ্ধ ভালুক।
এই বলে মেঝের ওপর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরল।
জেমস ভেন তার বোনের দিকে সস্নেহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, বলল, আমার সঙ্গে একটু বেড়িয়ে আসবে চল, সাইবিল। মনে হচ্ছে, এই বিতিকিচ্ছিরি লন্ডলে আমি ফিরব না। আমি তোমাকে নিশ্চয় করে বলতে পারি, এখানে ফিরে আসার ইচ্ছে আমার নেই।
একটা জমকালো থিয়েটারের পোশাক তুলে নিয়ে ভাঁজ করতে করতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিসেস ভেন বললেন, ওরকম ভয়ংকর কথা বলো না বাচ্চা।
ছেলেটি যে থিয়েটারে নামল না এতে তিনি খুবই হতাশ হয়েছিলেন, নামলে নাটকটা জমত ভালোই।
কেন বলব না, মা? সত্যিই বলছি, ফিরে আসার ইচ্ছে আমার নেই।
তোমার কথা শুনলে আমার বড়ো কষ্ট হয় বাচ্চা। আমি বিশ্বাস করি প্রচুর অর্থ নিয়েই তুমি। অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে আসবে। সমাজ বলতে কলোনিতে কিছু নেই, যা রয়েছে বলে শুনেছি তাকে আমরা সোসাইটি বলতে পারি না। সেই জন্যে যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করার পর আর তোমার সেখানে থাকার দরকার নেই। এখানে ফিরে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে তুমি।
ছেলেটি প্রতিবাদের সুরে বিড় বিড় করে বলল, সোসাইটি! ও নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামানোর সময় আমার নেই। আমার প্রথম কাজ হচ্ছে প্রচুর অর্থ রোজগার করা। তারপরে তোমাকে আর সাইবিলকে স্টেজ থেকে সরিয়ে আনা। স্টেজে অভিনয় করাকে আমি ঘৃণা করি।
সাইবিল হাসতে হাসতে বলল, ও জিম। কী নিষ্ঠুরের মতো কথা বলছ তুমি? কিন্তু সত্যিই কি তুমি আমার সঙ্গে বেড়াতে যাবে? খুব খুশি হব আমি আমার ভয় হচ্ছিল তুমি হয়তো তোমার কিছু বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিতে বেরিয়ে গিয়েছ, বিশেষ করে টম হার্ডি। যে। তোমাকে ওই বিচ্ছিরি পাইপটা দিয়েছ, অথবা নেড ল্যাঙটল, সেই পাইপ টানার জন্যে যে তোমাকে সব সময় ঠাট্টা করে। বিকেলটা আমার সঙ্গে বেড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে তুমি যে আমাকে ভালোবাস তারই প্রমাণ দিয়েছ। কোথায় যাবে বল তো? চুল, পার্কে যাই।
ছেলেটি একটু চটেই বলল, আমার পোশাক নোংরা। ধনী লোকরাই কেবল পার্কে যায়।
তার জামার হাতটা চাপড়াতে চাপড়াতে সাইবিল বলল, বোকা কোথাকার, জিম।
এক মুহূর্ত দ্বিধা করল জিম, তারপরে বলল, ঠিক আছে। কিন্তু আজতে বেশি দেরি করো না। চটপট সেরে নাও।
নাচতে নাচতে ঘরের বাইরে চলে গেল সাইবিলা গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে সে সিড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। সেই গানের সুর নীচেও শোনা গেল। মাথার ওপরে তার ছোট্ট পা দুটি অস্থিরভাবে ছোটাছুটি করতে লাগল।
জিম দু-তিনবার ঘরের মধ্যে পায়চারি করল, তারপরে চেয়ারের ওপরে নিশ্চলভাবে যে মূর্তিটি বসেছিল তার দিকে ঘুরে জিজ্ঞাসা করল, মা, আমার জিনিসপত্র সব ঠিক করে রেখেছ?
নিজের কাজের দিকে চোখ রেখে মা বললেন, হ্যাঁ, জিম। সব ঠিক রয়েছে।
এই রুক্ষ, কড়া মেজাজের পুত্রটির সঙ্গে যখনি তিনি একা থেকেছেন, বিশেষ করে শেষ কটি মাস, তখনি মনের মধ্যে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভোগ করেছেন। দুজনের চোখাচোখি হলেই, তাঁর গোপন সফরী-চরিত্রটা নিজেকে বিপদাপন্ন বলে মনে করত ছেলেটি কিছু সন্দেহ করছে নাকি এই কথাটাই প্রায় তিনি অবাক হয়ে ভাবতেন। ছেলেটি কথা বলত কম, চুপচাপ থাকত বেশি। এই সময়টাই তাঁর কাছে অসহ্য লাগত। ফলে তিনি অভিযোগ করতে শুরু করলেন। ওপরকে আক্রমণ করেই মহিলারা নিজেদের রক্ষা করে, ঠিক যেমন হঠাৎ এবং অদ্ভুতভাবে আত্মসমর্পণ করার উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে।
তিনি বললেন, জেমস, আমি আশা করি, নাবিকের জীবনে তুমি সন্তুষ্ট হয়েছা স্মরণ রেখ, এ-জীবন তুমি নিজেই বেছে নিয়েছ। তুমি কোনো সলিসিটরের অফিসে চাকরি নিতে পারতে, শ্রেণি হিসাবে সলিসিটরদের আমরা সম্মানাই বলে মনে করি, এবং এদেশে তারা বেশ উঁচু সম্প্রদায়ের সঙ্গে ডিনার খায়।
