রাত্রি সাড়ে বারোটার সময় বাড়ি ফিরলেন তিনি, দেখলেন, টেবিলের ওপরে একখানা টেলিগ্রাম পড়ে রয়েছে। তিনি সেটি খুললেন, দেখলেন টেলিগ্রামটি ডোরিয়েনের কাছ থেকে এসেছে। সংক্ষিপ্ত সংবাদ: ডোরিয়েন আর সাইবিল বিয়ে করার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন।
২. একটি বিবর্ণা শীর্ণকায়া মহিলা
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
মা, মা, আমি আজ খুশি–আনন্দে আমার মন-প্রাণ ভরে উঠেছে।
একটি বিবর্ণা শীর্ণকায়া মহিলার কোলের ওপরে মুখ লুকিয়ে মেয়েটি আনন্দে যেন ফেটে পড়ল। দেখে মনে হয়, ব্যস্থা মহিলাটি সংসার-যাঁতার মধ্যে পড়ে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ছোটো বসার ঘর, আলো-হাওযার বালাই সেখানে নেই বললেই ইয। সেই ঘরের একমাত্র আসবাব ছোটো একটি আর্মচেয়ারের ওপরে বসে ছিলেন। উজ্জ্বল আলোর ধকল সহ্য করতে পারছিলেন না বলেই হয়তো আলোর দিকে বসেছিলেন পেছন করে।
মেয়েটি আবার বলল, আনন্দ রাখার আর জায়গা পাচ্ছি না আমি তোমারও আনন্দ হচ্ছে নিশ্চয়।
মিসেস ভেন ভ্রূকু টি করলেন, কিন্তু তাঁর রক্তশূন্য ফ্যাকাশে রঙের একটি হাত তাঁর মেয়ের মাথার ওপরে রাখলেন।
আনন্দ! তোমাকে যখন অভিনয় করতে দেখি আমার আনন্দ হয় তখনি। অভিনয় ছাড়া বর্তমানে অন্য তোমার চিন্তা করা উচিত নয়। মিঃ আইস্যাকস আমাদের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করেছেন। তিনি যে আমাদের ধার দিয়েছেন সে ধার এখনো শোধ হয়নি।
মেয়েটি ওপরের দিকে মুখ তুলে বলল, মা, টাকার কথা বলছ? টাকায় কি যায় আসে! ভালোবাসার টাকার চেয়ে অনেক বেশি।
ভুলে যেও না, ঋণ শোধ আর ভেমেস-এ পোশাক তৈরি করার জন্যে মি; আইসকস আমাদের পঞ্চাশ পাউন্ড অগ্রিম দিয়েছেন। সেকথা ভুলে যেও না সাইবিলা পঞ্চাশ পাউন্ড অনেক টাকা। এদিক থেকে মিঃ আইস্যাকসকে সুবিবেচক না বলে আমি পারছি না।
দাঁড়িয়ে উঠল মেয়েটি, তারপরে জানলার ধারে গিয়ে বলল, মা, ও ভদ্রলোক নয়। আমার সঙ্গে ও যেভাবে কথা বলে তাতে ওকে আমার ঘৃণা হয়।
স্বরে কিঞ্চিৎ ঝাঁকানি দিয়ে বর্ষীয়সী মহিলাটি বললেন, তাঁর সাহায্য ছাড়া কী করে যে আমাদের চলত তা আমি জানি না।
সাইবিল ভেন নিজের মাথাটা নাড়িয়ে হাসল, আর তাকে আমাদের দরকার নেই মা। এখন থেকে প্রিন্স চার্মিং-ই আমাদের সব ভার নেবেন।
এই বলে সে থামল। একটা লজ্জার ঢল নামল তার ধমনীতে, সে একটু কেঁপে উঠল, সেই রঙে ধীরে ধীরে রাঙা করে দিল তার দুটি কপোলকে। দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের ফলে তার পদ্মপাতার মতো নরম দুটি ঠোঁট বিভক্ত হল-কাঁপতে লাগল ঠোঁটের দুটি পাপড়ি দুহিষ্কণে বাতাস ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপরে, সুন্দর পোশাকের ভাঁজগুলি দিল খুলে। সে শুধু বলল, আমি তাকে ভালোবাসি।
টিয়াপাখির মতো তাঁর মা চিৎকার করে উঠলেন–বোকা, বোকা মেয়ে! কথার সঙ্গে সঙ্গে নকল হিরে-বসালো আংটি পরা আঙুলটি তাঁর অদ্ভুতভাবে নড়তে লাগল।
মেয়েটি আবার হেসে উঠল। খাঁচায় পোরা পাখির আনন্দ তার স্বরে ধ্বনিত হল। সেই সুর ধরা। পড়ল তার চোখের মণিতে। দৃষ্টির আলোতে বিচ্ছুরিত হল তারই দ্যুতি। তারপরে তার। চোখের পাতাগুলি মুহূর্তের জন্যে বুজে এল, মনে হল, সে কিছু গোপন রহস্যকে ঢেকে রাখতে চায়। যখন সে চোখ খুলল তখন স্বপ্নের কুয়াশা কেটে গিয়েছে।
সেই জীর্ণ চেয়ার থেকে রগ্ন ভদ্রমহিলাটি তার সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। তিনি তাকে বিত্ত হওয়ার উপদেশ দিলেন, উপদেশ দিলেন সমঝে চলার জন্যে। কাপুরুষদের জন্যে যে সব বই লেখা হয়েছে এবং যেখানে লেখক সাধারণ জ্ঞান’ বলে শব্দটা না বুঝে বারবার উচ্চারণ করেছেন, সেই বই থেকে কিছু উপদেশ বাণী উদ্ধৃত করে তিনি তাকে শোনালেন। মেয়েটি সেদিকে কান দিল না। কামনার কারাগারে সে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তখন। তার রাজকুমার প্রিন্স চার্মিং, তার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে তখন। তাকে মনের মতো সৃষ্টি করার চেষ্টায় সে তখন মশগুল। তাকে খুঁজে বার করার জন্যে সে তার আত্মাকে দূত করে পাঠিয়েছে, সেই দূত তাকে ডেকে নিয়ে এসেছে। রাজকুমারের জ্বালাময় চুম্বন আবার তার ঠোঁট দুটিকে সম্পশ করেছে। তার নিশ্বাসে মেয়েটির চোখের পাতাগুলি গরম হয়ে উঠেছে।
তারপর বিজ্ঞতা চিন্তার পদ্ধতি পরিবর্তন করল। এই যুবকটি ধনী হতে পারে। তাই যদি হয়, বিয়ের কথা চিন্তা যেতে পারে। তার কানের উপকূলে সাংসারিক জ্ঞানের ঢেউ আছাড় খেয়ে। পড়ল। ছলনার তীর ছুঁডল মেয়েটি। সে দেখতে পেল পাতলা ঠোঁটগুলি তার নড়ছে। সে হাসল।
হঠাৎ কথা বলার তাগিদ এল তার। সে চেঁচিয়ে বলল, মা, মা, সে আমাকে এত ভালোবাসে কেন? আমি তাকে কেন ভালোবাসি তা আমি জানি। তাকে আমি ভালোবাসি এই জন্যে যে সে নিজেই ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক। কিন্তু আমার মধ্যে সে কী দেখেছে? আমি তো তার যোগ্য নই। কিন্তু তবু কেন জানি না, যদিও তার কাছে আমি অনেক ছোটো তবু তার প্রেমের অযোগ্য মনে হয় না নিজেকে। তার ভালোবাসা পেয়ে গর্বে আমার বুকটা ভরে ওঠে। মা, আমি যেমন আমার প্রিন্স চার্মিং-কে ভালোবাসি, তুমিও কি বাবাকে সেই রকমই ভালোবাসতে?
অল্প দামের প্রসাধনের নীচে বয়স্কা মহিলার গণ্ড দুটি হঠাৎ বিবর্ণ হয়ে গেল। একটা যন্ত্রণার আকস্মিক আবেগে তাঁর শুকনো ঠোঁট দুটি বিকৃত হল। সাইবিল ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল এবং গালে একটা চুমু খেয়ে বলল, মা আমাকে মা কর। বাবার সম্বন্ধে কোনো কথা বলতে গেলে যে তোমার কষ্ট হয় তা আমি জানি। কারণ, তুমি তাঁকে ভালোবাসতে, খুব ভালোবাসতে। দুঃখ করো না মা। বিশ বছর আগে তুমি একদিন যেমন সুখী হয়েছিল আড আমি তেমনি সুখী। আমাকে চিরকাল সুখী থাকতে দাও।
