তিনি তা জানতেন। যে চিন্তাটা তাঁর কটা চোখের মধ্যে আনন্দের সামান্য একটু রশ্মি ফুটিয়ে তুলল–ডোরিয়েনের যে মিষ্টি কথাগুলি তাঁর কানে গিয়েছিল সেইগুলি থেকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ডোরিয়েন গ্রে-র হৃদয় এই শ্বেতাঙ্গিনীর দিকে ঝুঁকেছে, তাকেই তিনি পুজো করছেন। ছেলেটি অনেকখানি তাঁর নিজেরই সৃষ্টি। তিনিই তাকে নাবালক করে রেখেছেন। এটা অবহেলার বস্তু নয়। জীবন তার রহস্য প্রকাশ করে না দেওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষে অপেহষ্ক করে। কিন্তু এমন মানুষের সংখ্যা খুব কমই রয়েছে আর এরাই হচ্ছেন নির্বাচিত কিছু জনপ্রতিনিধি-যবনিকা তুলে নেওয়ার আগেই যাঁদের কাছে জীবনের রহস্য ফাঁস হয়ে যায়। কখনো কখনো জীবনের এই ব্যঞ্জনাটি ফুটে ওঠে চিত্রকলার মাধ্যমে, বিশেষ করে সাহিত্যকলায। কারণ, উচ্ছ্বাস এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার সমন্বয় ঘটানোই সাহিত্যের কাভ। কিন্তু মাঝে মাঝে কখনো-সখনো কোনো জটিল ব্যক্তিত্ব বিচারকের স্থান অধিকার করে বসে এবং আর্টের দায়িত্ব গ্রহণ করে। কবিতা, ভাস্কর্য অথবা চিত্রকলার মতো মানুষের জীবনও আর্টের একটি বিস্তৃত লীলাক্ষেত্র ছাড়া আর কী?
সত্যি কথাই। ছোকরাটির বুদ্ধি এখনো পর্যন্ত পোক্ত হয়নি। বসন্তকালেই সে শস্য কাটার আয়োজন মেতে উঠেছে। যৌবনের সমস্ত উন্মাদনা তাঁর মধ্যে রয়েছে, কিন্তু তিনি আজকাল আত্মসচেতন হয়ে উঠেছেন। তাঁর গতিবিধি লক্ষ করাটা বেশ আনন্দের। সেই সুন্দর মুখ, আর সুন্দর আত্মা-দুই-এ জড়িয়ে তাঁর যে সত্তাটি গড়ে উঠেছে তার দিকে অবাক হয়েই চেয়ে। থাকতে হয়। কী ভাবে এই জীবনের পরিণতি আসবে তা ভেবে লাভ নেই কিছু। অভিনয়ের মঞ্চে তিনি সেই ধরনের একজন আদর্শ অভিনেতা যাঁর ব্যক্তিগত সুখের সন্ধান রাখার কোনো সম্ভাবনা আমাদের নেই, অথচ যাঁর দুঃখবোধ আমাদের অভিভূত করে তোলে। যাঁর দেহের ক্ষত তাজা গোলাপের মতো লাল টকটকে।
আত্মা এবং দেহ, দেহ আর আত্মা–কী অদ্ভুত সৃষ্টি ভগবানের! আত্মার মধ্যে পশুত্ব রয়েছে দেহের মধ্যে মাঝে মাঝে অধ্যাত্ম জগতের প্রতিফলন ঘটে। আমাদের প্রবৃত্তিগুলি সুন্দর হতে পারে, এবং অধঃপতন ঘটতে পারে ধীশক্তির। জৈব উচ্ছ্বাসের সমাপ্তি কোথায় অথবা কোথা থেকে আমাদের দৈহিক সংবেদনের সৃষ্টি হয়–এ প্রশ্নের উত্তর দেবে কে? সাধারণ। মনস্তত্ত্ববিদরা নিজেদের ইচ্ছামতো যে সব ব্যাখ্যা দিয়ে গিয়েছেন সেগুলি কত অগভীর। এবং বিভিন্ন চিন্তাশীল ব্যক্তিরা যে বিভিন্ন মত আর পথের সৃষ্টি করেছেন তাদের মধ্যে কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা সে কথা কে বলবে? পাপের ঘরে যে আত্মা বসে রয়েছে সেটা কি ছায়া মাত্র? অথবা দেহটা সত্যি সত্যিই আত্মার অন্তভ? বস্তু থেকে তার শক্তির বিচ্যুতি সত্যিই বড়ো রহস্যময। আর বস্তুর সঙ্গে তার শক্তির সংহতি একই রকম রহস্যে ঘেরা। কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক এ সম্বন্ধে শেষ কথা কে বলবে।
আচ্ছা, মনস্তত্ত্বই কি শেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যার মধ্যে দিয়ে মানুষের অবচেতন মনের সমস্ত কিছু ছোটোখাটো চিন্তাধারা প্রতিফলিত হয়? তিনি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন। ব্যাপারটা যাই হোক, আমরা সব সময় নিজেদের আর সেই সঙ্গে অপরকে ভুল বুঝেছি, নীতির দিক থেকে অভিজ্ঞতার কোনো দাম নেই। মানুষ যে সমস্ত ভুল করে সেগুলিকেই তারা অভিজ্ঞতা বলে চালিয়ে দিয়েছে। নীতিবাগীশরা যথারীতি এটিকে সতর্কবাণা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন, তাঁদের মতো চরিত্র গঠনে এর নৈতিক দক্ষতা অনস্বীকার্য, তাঁরা এর প্রশংসা করেছেন এই জন্যে যে কী করা উচিত আর কী বর্জন করা উচিত সে বিষয়ে এ আমাদের শিক্ষা দেয়। কিন্তু পরিচালনা করার মতো কোনো শক্তি অভিজ্ঞতার নেই। বিবেকের মতো এরও কর্মক্ষমতা। নেই বললেই হয়। এ যেটুকু বলে দেয় তা হচ্ছে এই যে আমাদের ভবিষ্যতের সঙ্গে অতীতের। কোনো পার্থক্য নেইষ যে পাপ আমরা একবার করেছি এবং অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গেই করেছি সেই পাপ ভবিষ্যতে আবার আমরা করব, আর বেশ আনন্দের সঙ্গেই।
এটা তাঁর কাছে বেশ পরিষ্কার হয়ে গেল যে প্রায়োগিক পদ্ধতিটাই হচ্ছে একমাত্র পদ্ধতি যার সাহায্যে জীবনের সমস্ত আবেগ আর উচ্ছ্বাসের বৈজ্ঞানিক অনুশীলন সম্ভব। সেদিক থেকে ডোরিয়েনকে নিয়ে কিছুটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে পারে, এবং সম্ভবত সেই পরীক্ষায় বিশেষ ফলোভেরও সম্ভাবনা রয়েছে। সাইবিল ভেন্যকে তিনি যে হঠাৎ উন্মাদের মতো ভালোবেসে। ফেললেন, মনস্তত্ত্বের দিক থেকে এটা কম কৌতূহলোদ্দীপক নয়। অবশ্য এর মূল কারণ যে কৌতূহল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই কৌতূহলই নিছক নয়, নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের আকাঙ্খা বটে। তবু এটা সাধারণ উচ্ছ্বাস নয় এ উচ্ছ্বাস সত্যিই বড়ো জটিল। যে অনুভূতিটা প্রাথমিক পর্যায়ে নিছক শিশুসুলভ একটা কৌতূহল ছিল, সেইটাই হঠাৎ তার নিজের কাছেই ইন্দ্রিয় অনুভূতি থেকে বিচ্যুত হয়ে গেল, পরিণত হল কামনায়, ভোগ-সম্ভাবনার অতৃপ্তিতে। এইটাই তার কাছে বিপজ্জনক। এই কামনাগুলিই আমাদের ওপর চিরকাল প্রভাব বিস্তার করে। এসেচ্ছে, অত্যাচার করে এসেছে আমাদের। অথচ এদের আসল বুপটি সম্বন্ধে আমরা সব সময় ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে প্রবঞ্চিত করেছি আমাদের।
লর্ড হেনরি যখন এই সব আলোচনা করছিলেন, এমন সময় দরজায় একটা টোকা পড়ল, তাঁর। চাকর ঘরে ঢুকে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিল যে ডিনারে যাওয়ার সময় হয়েছে। তিনি উঠে পড়লেন, তাকিয়ে দেখলেন রাস্তার দিকে। বিপরীত দিকে বাড়িগুলির ডানালার ওপরে। অস্তগামী সূর্যের লাল আলো ছড়িয়ে পড়েছে। জানলার কাঁচগুলি আগুনে পোড়ানো ধাতুর মতো লাল টকটকে করছে। মাথার ওপরে আকাশের রঙ বিবর্ণ গোলাপের মতো। বন্ধুর আগুনের মতো রঙিন জীবনের কথা মেন পড়ে গেল তাঁর। কেমন করে কোথায় কোন পথ দিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন এগিয়ে চলবে তা কে বলবে?
