লর্ড হেনরি তাঁকে লক্ষ করলেন, মনে মনে খুশিই হলেন তিনি। বেসিল হলওয়ার্ডের স্টুডিওতে যে লাজুক, নম্র, আর ভীতচকিত যুবকটিকে তিনি দেখেছিলেন, আজকের এই মানুষটির সঙ্গে পার্থক্য তার কত। তাঁর স্বভাবটি ফুল হয়ে ফুটে উঠেছে, রক্তবর্ণ কুসুমস্তবকে ভরে উঠেছে তাঁর আবেগ। গোপন বিবর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এসেছে তাঁর আত্মা, তার সঙ্গে মিতালি করার জন্যে বিবর থেকে এগিয়ে এসেছে আকাঙ্খা।
শেষকালে লর্ড হেনরি জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে কি করতে চাও তুমি?
আমি চাই একদিন তুমি আর বেসিল আমার সঙ্গে তার অভিনয় দেখতে এস। এর ফল কী হবে সে-সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহ আমার নেই। অভিনয়ে তার দক্ষতা যে তর্কাতীত সেকথা স্বীকার করতে তোমরাও বাধ্য হবে। তারপরে তাকে আমরা ইহুদির হাত থেকে ছাড়িয়ে আনব। তিন বছরের জন্যে, আজ থেকে মোটামুটি দু’বছর আট মাসের মতো চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাকে ওখানে থাকতে হবে। অবশ্য তাকে ছাড়িয়ে আনতে গেলে ইহুদিকে কিছু দিতে হবে। সব চুকেচুকে গেলে, ওযেস্ট এন্ডে আমি একটা থিয়েটার খুলব, সেইখানে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে অভিনয় করাব। আমাকে যেমন সে উন্মাদ করে সেই রকম উন্মাদ সারা বিশ্বকে সে করে তুলবে।
প্রিয় বালক, তোমার ও-আশা পূর্ণ হবে না।
হ্যাঁ, সে করবে। অভিনয় কলাটাকে সে যে বিশেষভাবে রপ্ত করেছে তা-ই নয়। ব্যক্তিত্বও তার খুব জোরালো এবং তুমি আমাকে অনেকবারই বলেছ যে আধুনির যুগকে যা নাচাতে পারে তা মানুষের নীতি নয়, ব্যক্তিত্ব।
ঠিক আছে। কবে আমরা যাচ্ছি?
দাঁড়াও, দেখি। আজ হচ্ছে মঙ্গলবার। আগামীকাল যাই চলা কাল সে জুলিযেটের অভিনয় করবে।
বহুৎ আচ্ছা। ব্রিস্টল-রাত আটটা। বেসিলকে আমি আনানোর ব্যবস্থা করব।
আটটা নয়, প্রিন্স হ্যারি। সাড়ে ছটা। পর্দা ওঠার আগেই আমাদের সেখানে পৌঁছতে হবে। প্রথম অঙ্কেই রোমিওর সঙ্গে তার দেখা হবে। সেই সময়েই তাকে তোমাদের দেখা উচিত।
সাড়ে ছটা! যা বাব্বা। ওই সময় তো লোকে হয় ‘মিট টি’ খায়, অথবা ইংরেজি নভেল পডে। সাতটা কর অন্তত। রাত্রি সাতটার আগে কোনো ভদ্রলোকই ডিনার খেতে বেরোয় না। এর মধ্যে বেসিলের সঙ্গে কি দেখা হবে তোমার? না, আমি তাকে চিঠি লিখে ডানিয়ে দেব?
প্ৰিয় বেসিল। সাত-সাতটা দিন তাকে আমি দেখিনি। কাডটা আমার খুব খারাপ হয়েছে। এর মধ্যে একটি অদ্ভুত সুন্দর ফ্রেমে বাঁধাই করে, ফ্রেমের ডিজাইন কী হবে সেটা সে নিজেই ঠিক করে দিয়েছে–সে আমার প্রতিকৃতিটা পাঠিয়ে দিয়েছে। যদিও আমার বয়স একমাস বেড়ে যাওয়ার ফলে ছবিটাকে আমি হিংসে করি তবু একথাও আমি স্বীকার না করে পারব না যে ছবি দেখে আমি আনন্দ পেযেছি। তুমি ও বরং তাকে চিঠি দিয়ে দাও একটা। একা তার সঙ্গে আমি দেখা করতে চাই না। তার কথা শুনতে বিরক্ত লাগে আমারা। সে আমাকে কেবল সৎ উপদেশ দেয়।
লর্ড হেনরি হাসলেন, নিজেদের যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেইটাই বিলিয়ে দিতে মানুষ বড়ো আনন্দ পায। এই অভ্যাসটাকে আমি বলি বদান্যতার গভীরতা।
কিন্তু বেসিল আমাদের বন্ধু হিসাবে সেরা। তবে আমার মনে হয় চরিত্রের দিক থেকে মানুষটি একেবারে গোঁয়ার গোবিন্দ। তোমার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পরেই হ্যারি এ জিনিসটা আমি। বুঝতে পেরেছি।
বেসিলের সব কিছু মাধুর্য সবই তুমি তার কাজের মধ্যে দেখতে পাবে। ফলে নিজের বলতে কুসংস্কার, নীতিবোধ, আর যাকে আমরা কমনসেন্স’ বুলি এগুলি ছাড়া তার আর কিছু নেই। ব্যক্তিগত পরিচযের ফলে আমি জানি নিম্নমানের আর্টিস্টরাই হচ্ছে সত্যিকারের আলাপী। তাদের সঙ্গে কথা বলে আনন্দ পাওয়া যায়। সত্যিকার ভালো আর্টিস্টরা বেঁচে থাকে তাদের সৃষ্টির মধ্যে, ফলে ব্যক্তিগত জীবনে তারা কাউকেই আকর্ষণ করতে পারে না। বড়ো কবি, অর্থাৎ যাঁকে আমরা সত্যিকার বড়ো কবি বলি-হচ্ছেন ব্যক্তিগত জীবনে বিশ্বের সবচেয়ে অকবি। কিন্তু নিম্নমানের কবিদের সঙ্গে মিশলে চমৎক্ত হতে হয়। তাদের ছন্দ যত খারাপ, ৩৩ই তারা সুন্দর করে নিজেদের প্রকাশ করে। যে কবি একটিমাত্র দ্বিতীয মানের চতুর্দশপদী কবিতার বই ছাপিয়েছেন, নরকুলে বাহবা পাওয়ার যোগ্য একমাত্র তিনিই। যে কাব্য-সৌরভ পরিবেশন করা তাঁর সাধ্যাতীত, মজার কথা হচ্ছে সেই সৌরভের মধ্যে তিনি নিজে বাস করেন। অপরে কবিতা লেখে বটে, কিন্তু সেই কাব্যরস পান করার মতো সাহস তাদের নেই।
টেবিলের ওপরে বড়ো একটা বোতলে আতর ঢালা ছিল, রুমালে সেই আতর কিছুটা ছিটিযে ডোরিয়েন বললেন, হ্যারি, তুমি যা বললে তাই কি সত্যি? তুমি যদি বল, তাহলে তাই সত্যি হতে বাধ্য। আমি এখন চললাম। ইমোডেল আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। আগামীকালের কথা ভুলে যেও না। বিদায়।
ডোরিয়েন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। লর্ড হেনরির ভারী ভারী চোখের পাতাগুলি নেমে এল। তিনি ভাবতে লাগলেন। সত্যি কথা বলতে কি ডোরিয়েন গ্রে তাঁকে যেমন করে আকর্ষণ করেছিলেন তেমন আকর্ষণ আর কেউ তাঁকে করতে পারেনি। তবু ছোকরা যে একজনকে পাগলের মতো প্রশংসা করে তা তিনি যেন সহ্য করতে পারছিলেন না, তাঁর মনের কোথায়। যেন একটা কাঁটা খচখচ করে বিধছিল। তিনি খুশিও হয়েছিলেন। এর ফলে, ডোরিয়েনকে আর ভালো করে বিশ্লেষণ করার সুযোগ হল তাঁর। প্রকৃতি বিজ্ঞানকে তিনি কোনোদিনই অস্বীকার করতে পারেননি, কিন্তু বিজ্ঞানের সাধারণ শাখাগুলি কোনোদিনই তাঁকে আকর্ষণ করতে পারেনি, সেগুলিকে তিনি অর্থহীন বলেই মনে করতেন। সেই জন্যে শুরু করেছিলেন তিনি নিজেকে ব্যবচ্ছেদ করতে, শেষ করলেন অন্য লোককে ব্যবচ্ছেদ করে। মানুষের জীবন-তিনি মনে করতেন মানুষের জীবনটাই হচ্ছে বিচার করার, বিশ্লেষণ করার একমাত্র উপযুক্ত জিনিস। এর সঙ্গে তুলনা করলে আর সব বস্তুই তাদের ভেল্লা হারিয়ে ফেলে, হারিয়ে ফেলে তাদের মূল্যবোধ। এটা সত্যি যে মানুষ যখন এই বেদনা আর আনন্দের আধারটিকে বিশেষভাবে লক্ষ করল তখন মুখে কাঁচের মুখোশ পরে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়নি দগ্ধমান সালফারের ধোঁয়া সরিয়ে রাখা, সে ধোঁয়া কেবল মস্তিষ্ককেই জখম করে ক্ষান্ত হলি, আমাদের চিন্তার জগতে বিপর্যয় ডেকে এনেছে, স্বপ্নকে করেছে বিকৃত। এমন কয়েকটি বিষয় রয়েছে তাদের চরিত্র কী ভালোভাবে জানতে গেলে নিজেদের অসুস্থ করতে হয়। এমন কয়েকটি ব্যাধি রয়েছে যাদের ভালোভাবে জানতে গেলে আপনাকে অসুস্থ হতে হবে। কিন্তু তবু কী পুরস্কারই না মানুষে পায়! তার কাছে পৃথিবী কী আশ্চর্য রকমের সুন্দরই না দেখায? মানুষের মনে কেন উচ্ছ্বাস ভাগে, তার চরিত্রটাই বা কী, বুদ্ধিজীবীদের রঙিন জীবনের উচ্ছ্বাস বলতেই বা কী বোঝা যায়, কোথায় তাদের মিল রয়েছে, অমিলটাই বা কোথায়, এই সব পর্যবেক্কণ করা, বিশ্বেষণ করার মধ্যে একটা আনন্দ রয়েছে। তার জন্যে মানুষকে কী দাম দিতে হবে তা নিয়ে কেউ চিন্তা করে না। কোনো সংবেদনের জন্যেই মানুষ খুব বেশি একটা দাম দিতে পারে না।
