হ্যাঁ, এটা তো একটা অভিজাত-বোধ বটেই, ডোরিয়েন, বড়ো রকমের অভিজাত-বোধ। অনেক মানুষ গদ্যময় জীবন নিয়ে ফাটকাবাজি খেলতে গিয়ে দেউলিয়া হয়েছে। কাব্যের জন্যে নিজেকে ধ্বংস কার একটা সম্মান বৈকি! কিন্তু মিস সাইবিল ভেন-এর সঙ্গে তোমার প্রথম আলাপ হল কবে?
তৃতীয় রাত্রিতো সেদিন সে রোজালিনড-এর অভিনয় করেছিল। আমি তার কাছাকাছি না গিয়ে পারিনি। আমি তাকে কিছু ফুল ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে দেখল। অন্তত, সেই রকমই মনে হল আমার। বৃদ্ধ ইহুদিও তার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার জন্যে আমার কাছে ঘ্যান ঘ্যান করছিল। আমাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে সে বদ্ধপরিকর। হয়েছিল। আমিও তাই শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলাম। তার সঙ্গে আমি যে আলাপ করতে চাইনি সেটা অস্বাভাবিক, তাই না?
না, আমি তা মনে করি না।
কেন?
এর উত্তর আর একদিন তোমাকে আমি দেব। এখন মেয়েটির সম্বন্ধে আমি কিছু শুনতে চাই।
সাইবিল? ওঃ, সে বড়ো লাজুক মেয়ে, আর কি ভদ্র! একেবারে যাকে বলে শিশু।তার অভিনয় সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা হয়েছিল সেকথা আমার মুখ থেকে শুনে সে অবাক হয়ে চোখ দুটি বড়ো বড়ো করে সোৎসাহে আামার দিকে তাকিয়েছিল। নিজের দক্ষতার সম্বন্ধে কোনো ধারণাই তার ছিল না। মনে হয়, আমরা দুজনেই কেমন আমতা আমতা করতে লাগলাম। সেই ধূলিমলিন সাজঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বুড়ো ইহুদি পরম কৌতুকের সঙ্গে তাকিয়ে রইল, তারপরে আমাদের দুজনের ওপরে লম্বা টানা বক্তৃতা দিল। আর আমরা নির্বাক হয়ে শিশুর মতো পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ইহুদিটি বার বার আমাকে ‘দি লার্ড’ বলে সম্বোধন করতে লাগল। সেই জন্যে সাইবিলকে নিশ্চিন্ত করতে হল যে আমি আদৌ ও-শ্রেণির মানুষ নই। সে আমাকে শুধু বলল, আপনি রাজকুমারের চেয়ে দেখতে সুন্দর, আপনাকে আমি ‘প্রিন্স চার্মিং’ বলে ডাকব।
সত্যি বলছি ডোরিয়েন, কী ভাবে মানুষকে প্রশংসা করতে হয় সাইবিল তা জানে।
হ্যারি, তুমি তাকে বুঝতে পারছ না। নাটকের একটি অভিনেতা বলেই সে আমাকে ধরে নিয়েছিল। বাস্তব জীবনের সমন্ধে কোনো ধারনাই তার নেই। সে তার মায়ের সঙ্গে থাকে, সংসারের চাপে পড়ে ভদ্রমহিলা বিবর্ণ হয়ে গিয়েছেন। পরিশ্রমের ক্লান্তিতে স্বাস্থ্য তাঁর ভেঙে পড়েছে। কিন্তু সুদিন তাঁর জীবনে এসেছিল।
আঙুলের আংটি খুঁটতে খুঁটতে লর্ড হেনরি মন্তব্য করলেন, ওদের মুখের চেহারা কি তা আমি ভানি। ওদের দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়।
ইহুদিটি তার কাহিনি বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমি তাকে বলতে দিইনি, কারণ তাতে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না।
তুমি ঠিকই করেছ, অন্য লোকের দুঃখের কাহিনির মধ্যে সব সময় অসম্ভব রকমের নীচতা রয়েছে।
সাইবিলই একমাত্র জিনিস যার ওপরেই আমার আগ্রহ রয়েছে। সে কোথায় জন্মেছে তা ডেলে আমার লাভ নেই। সেই ছোটো মাথা থেকে ছোটো পা পর্যন্ত সবটাই তার স্বর্গীয়। প্রতিদিন রাত্রিতেই তার অভিনয় আমি দেখতে যাই, আর প্রতিদিনই সে আমার চোখে অপরূপা হয়ে দেখা দেয়।
আমার মনে হয় সেই জন্যেই তুমি আজকাল আমার সঙ্গে ডিনারে যাওয়ার সময় পাও না। আমি ভেবেছিলাম তুমি বোধহয় কারো সঙ্গে রোমান্স করছ। করছ ঠিকই, কিন্তু আমি তোমার সম্বন্ধে যা ভেবেছিলাম তা করছ না।
শোন হ্যারি, প্রতিদিন আমরা হয় লাঞ্চ না হয় ডিনার খাই। আর তোমার সঙ্গে এর ভেতরে অনেকবারই আমি অপেরায় গিয়েছি-তাই না! অবাক হয়ে দুটি নীল চোখ বিস্তারিত করে ডোরিয়েন হেনরির মৃদু অভিযোগ নস্যাৎ করে দিলেন।
তুমি প্রায়ই অনেক দেরি করে আস।
অবশ্য সাইবিলের অভিনয় না দেখে আমি পারি না। একটা অঙ্কের জন্যে হলেও আমাকে থিয়েটারে যেতে হয়। তাকে দেখার জন্যে অস্থির হয়ে উঠি আমি। যখন ভাবি তার ওই হাতির দাঁতের মতো কারুকার্যমণ্ডিত ছোটো দেহটির মধ্যে অত্যাশ্চর্য একটি আত্মা লুকিয়ে রয়েছে তখন আমি ভয় পেয়ে যাই।
আজ তুমি আমার সঙ্গে ডিনার খাবে চল, ডোরিয়েন। যাবে না?
ডোরিয়েন মাথা নাড়ল, আজ সে ইমোজেন-এর অভিনয় করবে। আগামীকাল সাজবে জুলিয়েট।
কখন সে সাইবিল ভেন-এর অভিনয় করবে?
কোনোদিন না।
আমি তোমাকে অভিনন্দন জানাই।
কী ভয়ঙ্কর তুমি হ্যারি! বিশ্বের সমস্ত নায়িকাকে এক করলে যা দাঁড়ায় সাইবিল হচ্ছে তাই। ব্যক্তির চেয়ে অনেক বড়ো সে। তুমি হাসছ? কিন্তু আমি তোমাকে বলছি সে একটি জিনিয়াস। আমি তাকে ভালোবাসি। সে যাতে আমাকে ভালোবাসে সে চেষ্টা আমাকে অবশ্যই করতে হবে। তুমি তো জীবনের অনেক গোপন রহস্যের সন্ধান ভান। কেমন করে। সাইবিলকে আমি মুগ্ধ করব, কী করলে সে আমাকে ভালোবাসবে সে-কথাটা আমাকে তুমি। বলে দাও। রোমিওকে বাধ্য করব সে যাতে আমাকে হিংসে করে। আমি চাই বিশ্বের মৃত প্রেমিকদের আত্মা যেন আমাদের দ্বৈত হাসির শব্দ শুনতে পায়, শুনতে পেয়ে বিষণ্ণ হয়। আমি চাই আমাদের উন্মাদ ভালোবাসার নিশ্বাস ধূলায় মেশানো তাদের মৃত আত্মাগুলিকে যেন সঞ্জীবিত করে তোলে, তাদের ছাইগুলিকে বেদনার আঘাতে জর্জরিত করে। ভগবানের দিব্যি, হ্যারি, আমি তাকে পুজো করি।
এই কথা বলতে বলতে তিনি ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগলেন, তাঁর গাল দুটি লাল টকটকে করতে লাগল। বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন তিনি।
