আমি তাকে ভালোবাসব না কেন? হ্যারি, তাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। আমার জীবনে সে একটি আবিষ্কার ছাড়া আর কিছু নয়। দিনের পর দিন আমি তার অভিনয় দেখতে যাই একদিন সে রোজালিনড-এর অভিনয় করে, আর একদিন ইমোডেন-এর। প্রিয়তমের। বিষমাখা ঠোঁটে চুম্বন করে, ইটালিয়ান কবরখানার অন্ধকারে তাকে মারা যেতে আমি দেখেছি। আর্ডেন-এর বনপ্রদেশ কিশোরের পোশাক পরে কিশোরের বেশে ঘুরে বেড়াতে তাকে আমি দেখেছি। সে উন্মাদ হয়ে অপরাধী রাজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে তাঁকে তাঁর কৃতকার্যের জন্যে অনুশোচনা করতে বাধ্য করেছে। হিংসার কালো কুটিল হাত সেই অপাপবিদ্ধা মেয়েটির শরগাছের মতো নরম গলা চিপে ধরেছে। প্রতিটি বয়সের অভিনয় করতে নানান যুগের পোশাক পরা তাকে আমি স্টেজের ওপরে দেখেছি। সাধারণ মেয়েরা। কারো চিন্তার জগতে আবেদন জাগায় না। তাদের যুগে তাদের ক্রিয়াকলাপ অত্যন্ত সীমিত। কোনো জাঁকজমকই তাদের সৌন্দর্য বাড়ায় না, তাদের চিনে নিতে মানুষের বিন্দুমাত্র কষ্ট হয় না। তাদের মধ্যে কোনো রহস্য নেই। সকালে গাড়িতে চড়ে তারা পার্কে বেড়াতে যায়, বিকালে চায়ের টেবিলে কিচমিচ করে। তাদের মুখের হাসি আর চমকপ্রদ পোশাক গতানুগতিকতার ছাপ মারা। তারাই অত্যন্ত সাধারণ
কিন্তু অভিনেত্রীদের কথা স্বতন্ত্র। সাধারণের কাছ থেকে তাদের পার্থক্য কত! পৃথিবীতে ভালোবাসার একমাত্র উপযুক্ত নারী যে অভিনেত্রী, একথা আগে তুমি আমাকে কেন বলনি হ্যারি?
কারণ, আমি অনেক অভিনেত্রীকে ভালোবেসেছি, ডোরিয়েন।
হ্যাঁ, নিশ্চয়। তুমি সেই সব অভিনেত্রীদের ভালোবেসেছ যারা চুলে কলপ দিয়ে আর মুখে প্রসাধনের ছোপ লাগিয়ে বিতিকিচ্ছির দেখায়।
চুলের কলপ আর মুখের প্রসাধন ওভাবে নাকচ করে দিও না। মাঝে মাঝে তাদের ভেতরে অসাধারণ মহিলা লুকিয়ে থাকে।
এখন ভাবছি, সাইবিল ভেন-এর কথা তোমাকে না শোনালেই ভালো হত।
তার কথা আমাকে না বলে তুমি পারতে না, ডোরিয়েন। সারা জীবন ধরে যা করবে তার সবটুকুই তুমি আমাকে বলবো
হ্যাঁ, হ্যারি। মনে হচ্ছে তুমি সত্যি কথাই বলেছ। তোমাকে কোনো কিছু না বলে আমি থাকতে পারি না। আমার ওপরে তোমার প্রভাব বিস্ময়কর। যদি আমি কোনোদিন কোনো অন্যায় কাজ করি, তা-ও তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা আমার নেই। তুমি। আমাকে বুঝতে পারবে।
ডোরিয়েন, তোমার মতো সুন্দর মানুষ ইচ্ছে করে ভুল করে না। কিন্তু তুমি এইমাত্র যা বললে তার জন্যে তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এখন বল দেখি-তার আগে দেশলাইটা এগিয়ে দাও, লক্ষী ছেলে, এখন বল সাইবিল ভেন-এর সঙ্গে তোমার আসল সম্পর্কটা কোথায়?
হঠাৎ চটে উঠলেন ডোরিয়েন, চোখমুখ লাল হয়ে উঠল তাঁর, তড়াক করে লাফিয়ে উঠে তিনি বললেন, হ্যারি, সাইবিল ভেন পবিত্র, নিষ্পাপ।
কথার মধ্যে অদ্ভুত একটা দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে লর্ড হেনরি বললেন, ডোরিয়েন, পবিত্র জিনিসকেই মানুষের স্পর্শ করা উচিত। কিন্তু তুমি এত বিরক্ত হচ্ছ কেন? আমি ধরে নিচ্ছি। একদিন সে তোমারই হবে। প্রেমে পড়লে মানুষ নিজের সঙ্গে প্রতারণা করতে শুরু করে, আর সব সময়ে শুরু করে অপরকে প্রতারণা করতো এই প্রতারণাকেই আমরা বলি রোমান্স। যাই হোক, ধরে নিচ্ছি তুমি তাকে চিনতে পেরেছ!
হ্যাঁ নিশ্চয়। তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। প্রথম যেদিন আমি থিয়েটারে গিয়েছিলাম। সেইদিন নাটক ভাঙার পরে সেই ভীষণদর্শন বৃদ্ধ ইহুদি এসে আমার সঙ্গে দেখা করল, তারপরে সাজঘরে নিয়ে গিয়ে সাইবিলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিল। আমি খুব চটে উঠে তাকে বললাম, জুলিয়েট কয়েকশো বছর আগে মারা গেছে, তার মৃতদেহ এখন ভেরোনার মার্বেল কবরখানার মধ্যে শুয়ে রয়েছে। সে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তার চাহনি দেখে মনে হল বেটা ভেবেছিল আমি প্রচুর পরিমাণ শ্যাম্পেন বা অন্য কোনো মাদকদ্রব্য পান করে বেহেড হয়ে গিয়েছি।
তোমার কথা শুনে আমি আশ্চর্য হইনি, ডোরিয়েন।
তারপরে সে জিজ্ঞাসা করল আমি কোনো খবরের কাগজে লিখি কিনা, আমি তাকে বললাম, লেখা দূরের কথা কোনো খবরের কাগজই আমি পডি না। আমার কথা শুনে মনে হল সে বেশ হতাশ হয়ে পড়েছে। তারপরে সে আমাকে গোপনে ভাল যে সমস্ত নাট্য সমালোচকরা। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। এখন ব্যবসা চালাতে গেলে তাদের সবাইকে কিনে নিতে হবে।
লোকটি যে ঠিক কথা বলেছে সেদিক থেকে আমার কোনো রকমসন্দেহ নেই। তবে একথাও আমি বলতে চাই যে, তাদের চেহারা আর হাবভাব দেখে আমার মনে হয় তাদের কিনতে বেশি কিছু খরচ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ডোরিয়েন হেসে বললেন, তার কথা শুনে মনে হল সে সামর্থ্যও তার নেই। এই সময় থিয়েটারে আলো লেবানোর সময় হয়ে এল, কয়েকটা বাতি নিবেও গেল। সুতরাং আমাকেও বেরিয়ে আসতে হল। তার ইচ্ছে আমি তার দেওয়া দু’একটা সিগার খাই, আমি তার উপহার প্রত্যাখ্যান করলাম। পরের রাত্রিতেও আমি আবার সেই আগের আসনটি দখল করলাম। আমাকে দেখেই সে মাথাটা নীচু করে অভিবাদন জানিয়ে বলল, আমার মতো অর্থশালী এবং দিলদরিযা পেট্রল তার আর নেই। লোকটা একটা দুর্বিনীত পশু, মানুষকে বৃঢ় কথা বলতে ওস্তাদ। কিন্তু শেকসপীয়রকে সে অসাধারণ ভালোবাসো একবার সে বেশ বুক ফুলিয়ে গর্ব করে আমাকে বলেছিল যে ওই ‘চারণকরিটির জন্যে সে পাঁচবার দেউলিয়ার খাতায় নাম। লেখাতে বাধ্য হয়েছিল। শেকসপীয়রকে সে চারণকবি ছাড়া অন্য কোনো নামে ডাকতে রাজি নয়। এই নামে ডাকার মধ্যে সে তার আভিজাত্য খুঁজে পেয়েছে।
