চটে উঠলেন ডোরিয়েন গ্রে, একটু চেঁচিয়েই বললেন, তোমার ধারণা আমার চরিত্র এতখানি খেলো, অগভীর?
না, আমার মনে হয় তোমার চরিত্র সত্যিকারের গভীর।
অর্থাৎ?
প্রিয় বালক, অবধান করা যারা জীবনে একবার মাত্র প্রেমে পড়ে সত্যিকারের অগম্ভীর হচ্ছে তারা। যে জিনিসটাকে তারা আনুগত্য অথবা আস্থা বলে, আমার মতে সেটা হয় সামাজিক আলস্য, অথবা সুস্থ চিন্তার অভাব। বুদ্ধিজীবীদের কাছে চারিত্রিক দৃঢ়তা যা, উচ্ছ্বাসম্য। মানুষের কাছে বিশ্বাসের দাম তাই। দুটিই পরাজযের কলঙ্ক ছাড়া অন্য কিছু নয়। বিশ্বাস! ওটা নিয়ে বিশদ আলোচনা একদিন আমাকে করতেই হবে। এর ভেতরে রয়েছে কিছু হাতিয়ে নেওয়ার প্রয়াস। পৃথিবীতে এমন অনেক জিনিস রয়েছে যেগুলিকে আমরা অবহেলায় ছুঁড়ে। ফেলে দিতে পারি, ফেলে দিই না এই ভয়ে যে অন্য লোকে হয়তো সেগুলি কুড়িয়ে নেবে। কিন্তু তোমাকে আমি বাধা দিতে চাই না তোমার গল্পটা বলে যাও।
হ্যাঁ, যা বলছিলাম: আমি একটা বিশ্রী ছোটো বক্সের ওপরে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বসলাম। একটা নোংরা পর্দা আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়েছিল। পর্দার আড়াল থেকেই ঘরটাকে আমি পরীক্ষা করে দেখছিলাম। বিবাহের নিকৃষ্ট কেকের মতো ঘরটা খুবই চটক দিয়ে সাজানো, গ্যালারি আর নীচেটা মোটামুটি ভর্তি ছিল কেবল খালি ছিল সরু সরু দু’সারি বিবর্ণ স্টল। আর ড্রেস সার্কেলে একজন দর্শকও আমার চোখে পড়েনি। কমলালেবু আর ডিনডার ব্যিার। নিয়ে মহিলারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। চারপাশে বাদামের ছাড়ানো খোলায় একেবারে ভরপুর। ব্রিটিশ নাটকের গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
আমারও তাই মনে হয়, কিন্তু মন-মেজাজ একেবারে বিগড়ে দেয়। নাটকের নাম শুনে তো আমি অবাক। এ কী কাণ্ড! কী অভিনয় হচ্ছিল বল তো, হ্যারি?
আমার ধারণা, নাটকের নাম হয় ‘ইডিযট বোয়’ অথবা ‘ডাম্ব বাট ইনোসেন্ট’। আমাদের পূর্বপুরুষেরা ওই রকম নাটকই পছন্দ করতেন বেশি। যতই দিন যাচ্ছে ডোরিয়েন, ততই বুঝতে পারছি বাপ-কাকা-জেঠাদের কাছে যেটা ভালো ছিল সেটা আর আমাদের কাছে ভাল নয়। আর্টই বল, অথবা রাজনীতিই বল–সর্বত্র ওই একই ব্যাপার।
না, হ্যারি, নাটকটা আমাদের পক্ষে ভালোই। নাটকের নাম হচ্ছে ‘রোমিও-জুলিয়েট’। এই রকম একটা গর্তের মধ্যে সেকসপীয়রের নাটক অভিনীত হচ্ছে বুঝতে পেরে সত্যি কথা বলতে কি প্রথমেই আমি খুব বিরক্ত হয়েছিলাম। তবু ভাবলাম, দেখাই যাক না শেষ পর্যন্ত কী রকম দাঁড়ায়। যাই হোক, প্রথম অঙ্কটা পর্যন্ত দেখতে আমি মনস্থির করে ফেলেছিলাম। আবহসঙ্গীত কী ভয়ানক রে বাবা! একটা ভাঙা পিয়ানোর সামনে দাঁড়িয়ে একটি ইহুদি যুবক সঙ্গীত পরিচালনা করছিল। এই দেখেই চম্পট দেব ভাবছি এমন সময় সিল উঠে গেল, শুরু হল অভিনয়। একটি মোটাসোটা বয়স্ক ভদ্রলোক রোমিওর অভিনয় করছিলেন, তাঁর ভুরু যুগল কিঞ্চিৎ উঁচু স্বর শ্রুতিকটু, ভারিক্কি–অনেকটা বিযোগান্ত ধাঁচের। চেহারাটা হচ্ছে বিয়ারের পিপের মতো। মারকিউরিযার চেহারাটা আরো খারাপ অভিনয় করল একটা নিম্নমানের বিদৃষকের মতে, পোশাক আর চালচলনে মনে হল মানুষটি এই গর্তের আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেকে বেশ খাপ খাইয়ে নিয়েছে। পারিপার্শ্বিক দৃশ্যাবলীর মতো তারাও কিম্ভুতকিমাকার, তাদের দেখে মনে হল এইমাত্র তারা যেন পাড়াগাঁয়ের কোনো অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসছে।
কিন্তু জুলিয়েট! হ্যারি, ভেবে দেখ–একটি মেয়ে, সতের ছুঁই-ছুঁই করছে তার বয়স, ফুলের মতো ছোটো তার মুখ, তামাটে রঙের ঘন চুলের স্তবকে যার মাথাটা গ্রিক ভাস্কর্যের নিপুণ কারুকার্যের মতো দেখাচ্ছিল, চোখ দুটি তার ঢল-ঢল, দেখলেই মনে হবে ভাবের উচ্ছ্বাসে যেন তারা উপছে পড়ছে। ঠোঁট দুটি যেন গোলাপের পাপড়ির মতো। জীবনে অত সুন্দর আর কোনো যুবতী আমার চোখে পড়েনি। তুমি একবার আমাকে বলেছিলে যে মানুষের দুঃখ তোমার মনে কোনো রেখাপাত করে না, কিন্তু একটি সুন্দর ডিজনিস, তা সে যত সামান্যই হোক, তোমার চোখ জলে ভরিয়ে দেয়। তোমাকে আমি সত্যি কথাই বলছি হ্যারি, মেয়েটিকে দেখে আমার চোখ দুটিও জলে ভরে উঠল, ফলে তার দিকে ভালো করে সেদিন আমি তাকিয়ে থাকতেই পারিনি।
আর তার কণ্ঠস্বর! ওরকম স্বর আর কখনো আমি শুনিনি। প্রথমে মৃদু সুরে সে কথা শুরু করল, ধীরে ধীরে সেই সুর পরিণত হল উদাত্ত স্বরে, তারপরে সঙ্গীতের মূৰ্ছনায় আবিষ্ট করে ফেলল তোমাকে। ধীরে ধীরে সেই স্বর উচ্চগ্রামে উঠে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। মনে হল অনেক দূরে কোথাও কোনো ফুট অথবা সানাই বাজছে। বাগানের দৃশ্যটাও একই রকমের উচ্ছ্বাসবিধুর, নাইটেল পাখির গানের মধ্যে দিয়ে ভোরের আলো ফুটে ওঠার কিছু আগে প্রেমিক-প্রেমিকারা আসন্ন বিচ্ছেদের আশঙ্কায় যেমন মুষড়ে পড়ে–এই দৃশ্যটিও ঠিক সেই রকমের বেদনার্ত হয়ে উঠেছিল। মাঝে মাঝে বিচ্ছেদ-উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সমতা রাখার চেষ্টায় বেহালার করুণ সুর বেশ চড়া গলায় ছড়িয়ে পড়ছিল চারপাশে তুমি জান, মাঝে মাঝে কারো কণ্ঠস্বর মানুষকে মাতাল করে দেয়, কানের ভেতর দিয়ে ঢুকে একেবারে মর্মস্থানে গিয়ে আঘাত করো তোমার স্বর আর সাইবিল ভেন-এর স্বর–এই দুটি স্বর জীবনে আমি কোনোদিনই ভুলতে পারব না, হ্যারি, চোখ বন্ধ করে থাকলেই আমি সেই স্বর দুটি শুনতে পাই। যদিও চরিত্রের দিক থেকে, ব্যঞ্জনার দিক থেকে তারা ভিন্ন জাতের। ওদের কোনটিকে আমি অনুসরণ করব তা আমি জানি না।
