টিক বানাউ? কিশোর বলল। তাহলে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা যাবে। আর! এড, চল। কুইক।
২০
বৃষ্টির মধ্যেই ওদেরকে পুকুরটার দিকে যেতে দেখলেন মিসেস ডাই। প্রফেসরের কাঁধে গাঁইতি, বেলচা। ডেকে বললেন, এড, সাবধানে থাকিস, বেশি ভিজিস না।
মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানাল ছেলেরা। দ্রুত ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে এসে দাঁড়াল পুকুরের পাড়ে। পানিতে পড়ে থাকা মসৃণ পাথরগুলো মৃদু চকচক করছে, এগুলো দিয়েই সিঁড়ি বানিয়েছে বাওরাড। এক সারিতে পাথরগুলোর ওপর দিয়ে। এগিয়ে চলল দলটা, দ্বীপে উঠল। পাইন গাছে ছাওয়া খুদে দ্বীপ। চওড়ায় বড়জোর শখানেক ফুট হবে। তার মধ্যেই দুটো ছোট পাহাড়, তিরিশ ফুট, আর চল্লিশ ফুট উঁচু।
গুজব রয়েছে, কিশোর বলল। পাহাড়ে দাঁড়িয়ে লেকের ওপর চোখ রাখে ভূত। কাজেই দ্বীপের ওই ওদিকটায় গাছ খুঁজতে হবে। যেহেতু পাহাড়ের ওপর দাঁড়ায় ভূত, সেহেতু ভূতের মত দেখতে গাছটাও রয়েছে কোন উঁচু জায়গায়।
ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়ছে ওদের হ্যাট, কোর্ট থেকে, গলা বেয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে পানি। দ্বীপের একেবারে প্রান্তে যে পাহাড়টা, ওটার ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করল ওরা। বীকনটা রয়েছে চূড়ায়, দণ্ডের মাথায় ঝুলছে লণ্ঠন।
লণ্ঠনটা পরীক্ষা করল মুসা। চেঁচিয়ে উঠল, এই তো, আছে। পিতলের প্লেট, ডাইক কোম্পানির নাম খোদাই করা।
গাছটা খোঁজ, কিশোর বলল।
খোঁজার প্রায় দরকারই পড়ল না, তাকাতেই চোখে পড়ল। হাত তুললেন প্রফেসর। ওই তো।
বীকন থেকে পনের ফুট দূরে। বাঁকাচোরা সাইপ্রেস, ক্যাবরিলো আইল্যাণ্ডে যে-রকম দেখে এসেছে ওরা, সে-রকম। বৃষ্টির মধ্যে সত্যিই যেন একটা ভূত, কিংবা বলা উচিত ভূতুড়ে মানুষ–কিত মাথা, শুকনো লম্বা একটা হাত তুলে। রেখেছে। সাগর থেকে এসে চ্যানেলে ঢুলে পড়া ভাইকিংদের দেখাচ্ছে যেন।
দেখ, দ্বীপের যে অংশটা মূল ভূখণ্ড থেকে কেটে খাল বানানো হয়েছে সেদিকে দেখাল মুসা। পাড়ে কত বড় বড় গাছ। এজন্যেই বাড়ি থেকে সাইপ্রেসটা দেখা যায় না।
এখন যায় না, কিশোর বলল। তবে বাওরাড যখন লাগিয়েছিলেন তখন পুকুর পাড়ে গাছ এত বড় ছিল না। ছিল কিনা, তাতেও সন্দেহ আছে। তখন নিশ্চয় দেখা যেত। তবে সাইপ্রেস বাড়ে খুবই কম। একেবারে বামন-গাছ বলা চলে এগুলোকে। এক ফুট লম্বা হতেই একশো বছর লাগে।
হয়েছে, হাত নাড়ল মুসা। উদ্ভিদ বিজ্ঞানে আগ্রহ নেই আমার। কোন জায়গা থেকে খুঁড়ব? সাইপ্রেসটার চারপাশে ঘুরল রবিন। খোঁড়ার চিহ্ন নেই, কিশোর। টিক বানাউ আসেনি।
চল, মুসা, বোরিসের কাঁধ থেকে গাইতি নেয়ার জন্যে হাত বাড়াল এড গাছের গোড়ার চারপাশে…।
বাধা দিল কিশোর, না এখানে নয়।
সবগুলো চোখ একযোগে ঘুরে গেল তার দিকে।
কিন্তু চিঠিতে বলা হয়েছেঃ ভাব লকের গোপন রহস্যের কথা, প্রফেসর বললেন। তারমানে ভূত ভূতটার কাছেই দেখতে বলা হয়েছে।
চিঠিতে তো আয়নার মধ্যেও দেখতে বলা হয়েছে, মনে করিয়ে দিল কিশোর। ভূতটাকে আয়নার মধ্যে দেখতেই বলা হয়েছে, আমার বিশ্বাস।
কিন্তু এখানে আয়না কই! চারপাশে তাকাতে লাগল মুসা।
নেই। আয়না বলে আসলে আয়নার মত বোঝাতে চেয়েছে। আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখা যায়। ওই প্রতিবিম্বকে ব্যবহার করেই হয়ত গুপ্তধন বের করতে বলেছে। গাছটার দিকে তাকিয়ে আছে কিশোর। ভূত নির্দেশ করছে পুকুরের দিকে। দেখা যাক, পুকুরে ভূতের প্রতিবিম্ব, বা ছায়া দেখা যায় কিনা।
সাইপ্রেসের কাছে দাঁড়িয়ে, ওটার নির্দেশিত দিকে তাকাল ছেলেরা।
যা বৃষ্টি, রবিন বলল। কিছুই তো দেখি না।
দেখি, এড, তোমার টর্চটা, হাত বাড়াল কিশোর।
সাইপ্রেসের লম্বা বাহুটায় আড়াআড়ি ভাবে টর্চটা ধরল সে, সুইচ টিপল। বৃষ্টির চদর খুঁড়ে যেন বেরিয়ে গেল উজ্জ্বল আলোকরশ্মি। পড়ল গিয়ে সমতল একটা জায়গার ওপর, ঘন ঝোপ ওখানে। সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল সে, চল! জলদি চল।
প্রতিবিম্ব কোথায়…। মুসা কথা শেষ করতে পারল না।
চেঁচিয়ে উঠল গোয়েন্দাপ্রধান, প্রতিবিম্ব চুলোয় যাক, জলদি এস, বলেই ঢাল বেয়ে দৌড় দিল জায়গাটার দিকে। ঘন ঝোপঝাড়ের ভেতরে সমতল জায়গাটা এমনই, এমনিতে দেখে বোঝার কোন উপায় নেই, ওখানে মাটির নিচে কিছু লুকানো রয়েছে। এখন দেখা গেল, ডালপালা ভাঙা, মাটিতে একটা গর্ত। সদ্য খোঁড়া।
নিয়ে গেছে! কেঁদে ফেলবে যেন এড।
তোমার আগেই কেউ আন্দাজ করে ফেলেছিল, কিশোর, গুঙিয়ে উঠল মুসা।
গর্তের কিনার থেকে পিতলের একটা বোতাম কুড়িয়ে নিলেন প্রফেসর। টিক বানাউ। এজন্যেই আমাকে মেরে দৌড়ে পালিয়েছে। নিয়ে গেছে গুপ্তধন।
পুলিশকে জানানো দরকার, বলেই দৌড় দিল বোরিস।
লজে ফিরে এল ওরা। ইয়ান ফ্লেচারকে ফোন করতে বলল মিসেস ডাইকে কিশোর। প্রফেসরকে বলল, স্যার, চলুন। যেখানে আপনাকে মেরেছিল, সেখানে ভালমত খুঁজে দেখি। কিছু ফেলেটেলে গেল কিনা। কোথায় গেছে হয়ত আন্দাজ করা যাবে।
প্রফেসরের গাড়ির কাছে খুঁজতে লাগল ওরা। মাঝে মাঝে টর্চ জ্বালছে, ভাল করে দেখার জন্যে। কিছুই পাওয়া গেল না। গাড়ি থেকে খানিক দূরে একটা জায়গা দেখালেন তিনি। কাদা হয়ে আছে, তাতে বুটের ছাপ, চলে গেছে সোজা হাইওয়ের দিকে।
জোরে নিঃশ্বাস ফেললেন প্রফেসর। নিশ্চয় গাড়ি রেখে এসেছিল। গেল বোধহয়! আর ধরা যাবে না।
