নিচে নেমে তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে নিল। দুধের গেলাসে সবে মুখ লাগিয়েছে, এই সময় বাজল টেলিফোন। প্রফেসর কেইন।
কিশোর? গুহাটার কথা অনেক ভাবলাম। কি করে চেনা…।
গুহা-টুহা নেই, স্যার। জবাব এখন আমার জানা।
কী? এত জোরে চিৎকার করে উঠলেন -প্রফেসর, কান থেকে রিসিভার সরাতে হল কিশোরকে। গুহা নেই? তাহলে কোথায়, কিশোর? জলদি বল।
ফ্যান্টম লেকে চলে আসুন। আমরাও যাচ্ছি। ওখানেই বলব।
দশ মিনিট পরেই এসে হাজির হল রবিন আর মুসা। আগেই ট্রাক বের করে রেখেছে বোরিস। সামনের সিটে গাদাগাদি করে বসল চারজন।
বল, কিশোর, রবিন বলল।
হ্যাঁ, বল, প্রতিধ্বনি করল যেন রবিন।
মুচকি হাসল কিশোর। ঘুমিয়ে ছিলাম। রবিনের একটা কথা ভাবছিলাম ঘুমানোর আগে। সকাল বেলা হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে গেল সব।
কি বলেছিল রবিন?
বলেছিল, কোন বিশেষ গাছ লাগিয়েছে বাওরাড। হ্যাঁ, তা-ই করছে।
গাছ? বুঝতে পারছে না মুসা।
গাছ। যেটা দেখে বাড়ির কথা নোরিয়ার মনে পড়বে ভেবেছিল বাওরাড। ক্যাবরিলো আইল্যাণ্ড নিয়ে এসেছিল ওটা, বাঁকামেরা ভূতের মত দেখতে এক সাহপ্রেস। ভূতুড়ে হ্রদে ভূত এনে লাগিয়েছিল।
তারমানে, ফ্যান্টম লেকে গিয়ে এখন পুরানো ভূতটাকে খুঁজে বের করলেই হল? রবিন বলল।
কিন্তু কোথায় খুঁজব? মুসা বলল। গাছ কি একটা দুটো? ফ্যান্টম লেকে গাছের জঙ্গল।
ভাব ভালমত, মাথা খাটাও, হাসল কিশোর। খনি-শ্রমিক, সুস, টিম্বার, পাউডার গালচ। তুমিই তো বললে, ওরা সবচেয়ে ভাল পারে মাটি খুঁড়তে। গর্ত। আর মূস টিম্বারের ব্যাপারে একটা অতি জরুরি তথ্য উপেক্ষা করে গেছি আমরা। কেন ওই জিনিস আনতে গেল বাওরাড? কেন সাধারণ তক্তা নয়, বা মাইনিং টিম্বার নয়?
কেন, বল?
কারণ, স্লূস টিম্বার বিশেষ ভাবে কাটা হয়, পানি ধরে রাখার জন্যে। চতুর বাওরাড করেছে উল্টোটা। পানি ঠেকিয়ে রাখার জন্যে ব্যবহার করেছে।
কোথায়? উত্তেজনায় প্রায় কাঁপছে রবিন।
বিরাট গর্তটায়, শ্রমিকরা যেটা খুঁড়েছে। খোঁড়ার সময় পানি ওঠে, সেটা ঠেকানোর জন্যেই ব্যবহার হয়েছে মূস টিম্বার। পাথরগুলোকে ধাপে ধাপে সাজিয়ে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে। মুসা, তোমার কথাই ঠিক। ডাইক কোম্পানি থেকে লণ্ঠনই কেনা হয়েছে।
দ্বীপটা! একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল রবিন আর মুসা।
হ্যাঁ। এটাই নোরিয়ার চমক। সবাই ভেবেছে, দ্বীপওয়ালা পুকুরটা দেখেই বাওরাড জায়গা পছন্দ করেছে, বাড়ি করেছে, স্কটল্যাণ্ডের বাড়ির মত দেখায় বলে। আসলে তা নয়। দ্বীপটা বানানো হয়েছে, স্কটল্যাণ্ডে যেটা আছে সেটার নকল।
নিশ্চয় ছোট একটা উপদ্বীপ মত ছিল প্রথমে, পুকুরে নেমে এসেছিল ওটা। সেটা কেটে মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করার সময়ই ব্যবহার হয়েছে ক্ষুস টিম্বার, কাটা জায়গায় পাথরগুলো ফেলে আবার ছেড়ে দেয়া হয়েছে পানি। দ্বীপে একটা দণ্ডের মাথায় লণ্ঠনটা লাগিয়ে দিয়েছে বাওরাড। সাইপ্রেসটা পুঁতেছে স্কটল্যাণ্ডের ভূতের গুজব মনে করিয়ে দেয়ার জন্যে, অবশ্যই নোরিয়াকে।
বাড়িতে যা ভালবাসত বাওরাড, সেটারই একটা খুদে সংস্করণ তৈরি করেছে ফ্যান্টম লেকে। ওটাই নোরিয়ার জন্যে চমক। একটানা এতগুলো কথা বলে দম নেয়ার জন্যে থামল কিশোর। তারপর, লিটল মারমেইডের ক্যাপ্টেন আর দোসররা যখন উদয় হল, দ্বীপটাতে গুপ্তধন লুকিয়ে ফেলল সে। সূত্র হিসেবে রেখে গেল চিঠি, আর দ্বিতীয় জার্নালটা।
বাওরাডের ধাধা, আর কিশোরের সমাধান ক্ষমতা স্তব্ধ করে দিয়েছে দুই সহকারীকে। কে বেশি চালাক? বাওরাড, না কিশোর পাশা, ভেবে ঠিক করতে পারছে না ওরা।
দ্বীপটা প্রাকৃতিক নয় কেউ বুঝতে পারেনি? অবশেষে বলল রবিন।
না। খনির শ্রমিকেরা ছিল ভাসমান, আজ এখানে কাল ওখানে। যেখানেই কাজ পেত, চলে যেত, অনেকটা যাযাবর। আমার স্থির বিশ্বাস, ওদের কাছ থেকে কেউ কোন সাহায্য পায়নি-যারা পরে গুপ্তধন খুঁজেছে। হয়ত কোন শ্রমিকেরই দেখা পায়নি তারা। বাওরাডের বংশধরেরাও ভেবেছে দ্বীপটা প্রাকৃতিক, ফলে নজর দেয়নি ওটার দিকে। শ্রমিকদের কথা ভাবতে পারেনি, কারণ, দ্বিতীয় জার্নালটাই হাতে পড়েনি কারও।
আমরা পেয়েছি! বুকে চাপড় মারল মুসা। এবার গুপ্তধনও খুঁজে বের করব।
হ্যাঁ, করব, ঘোষণা করল কিশোর।
একটা কথা এখনও বুঝতে পারছি না, কিশোর, রবিন বলল। আয়নার মধ্যে দেখ বলে কি বোঝানো হয়েছে? …
পুকুরটাকে আয়না বোঝানো হয়নি তো? বলল মুসা। পানিতেও তো প্রতিবিম্ব দেখা যায়।
ওখানে গেলেই বুঝতে পারব, কিশোর বলল। পুকুর, না…।
হঠাৎ ব্রেক কষল বোরিস। পেছনে বুকে গেল ছেলেদের মাথা। আলোচনায় এতই মগ্ন ছিল, পথের দিকে চোখ ছিল না কারও। এখন দেখল। দেখেই পাশের দরজা খুলে হুড়াহুড়ি শুরু করে দিল বেরোনোর জন্যে। বোরিস ইতিমধ্যে বেরিয়ে গেছে।
পথের আর একটা মোড় ঘুরলেই ডাই লজ। মোড়ের ওপাশে না গেলে বাড়িটা দেখা যায় না। ওখানে, পাহাড়ের পাথুরে কাধে একগুচ্ছ পাইন গাছের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রফেসরের স্টেশন ওয়াগন। ড্রাইভারের পাশের দরজা খোলা, সিটে বসে আছেন প্রফেসর। তার গায়ের ওপর প্রায় ঝুঁকে দাঁড়িয়েছে এড।
কি হয়েছে, প্রফেসর? উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল বোরিস।
নাহ, তেমন কিছু না, চোয়ালে হাত বোলালেন প্রফেসর। ছেলেদের দিকে তাকালেন। টিক বানাউ। কয়েক মিনিট আগে এসেছি, দেখি, রাস্তার ওর দাঁড়িয়ে আছে। তার সঙ্গে কথা বলতে গেলাম। কিছুই শুনল না, ঘুসি মেতে আমাকে ফেলে দিয়ে বনে ঢুকে পড়ল।
