রবিনের দিকে ঝুঁকল রোজার। ইঁদুরের বাচ্চা, ভাব…ভেবে বের কর, কোথায় রেখেছ রূপালী মাকড়সা। জনতা আমার মত নরম মনের মানুষ নয়। ওদের হাতে তুলে দিলে জ্যান্ত ছাল ছাড়িয়ে নেবে।…মাকড়সাটা অবশ্য দরকার নেই আমার, আলবার্তো বলেছে। তবু, ওটা গলায় পরে সিংহাসনে বসতে বেশ ভালই লাগবে। প্রিন্সের মতই মনে হবে নিজেকে।
কাছে এসে দাঁড়িয়েছে প্রহরীরা।
ওদের দিকে চেয়ে বলল রোজার, নিয়ে যাও।
.
১২.
পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল ওদেরকে দুজন প্রহরী। আবার সেই ডানজনে, পাতালের কয়েদখানায়।
আগে একজন প্রহরী, পেছনে রবিন, কিশোর, তাদের পেছনে মরিডো। চলতে চলতে মরিডোর গা ঘেঁষে এল পেছনের প্রহরী। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, নর্দমায় বন্ধু ইঁদুর আছে। বলেই সরে গেল।
মাথা ঝোকাল মরিডো।
ডানজনের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল ওরা। ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলল প্রহরী। ঠেলে বন্দিদেরকে ঢুকিয়ে দিল পাথরের ছোট্ট ঘরে। দেয়ালের কাছে জ্বলছে মোমবাতি, আলতো বাতাস লেগে কেঁপে উঠল শিখা। ছায়ার নৃত্য শুরু হল দেয়ালে।
পেছনে শব্দ তুলে বন্ধ হয়ে গেল আবার লোহার দরজা। তালা আটকানর আওয়াজ হল। বাইরে দরজার দুপাশে দাঁড়িয়ে গেল দুই প্রহরী। কড়া পাহারার আদেশ আছে তাদের ওপর।
দীর্ঘ কয়েকটা মুহূর্ত নীরব হয়ে রইল ওরা। নিস্তব্ধ পরিবেশ। কানে আসছে অতি মৃদু চাপা একটা কুলকুল ধ্বনি। পানি বইছে কোথাও। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে মরিডোর দিকে তাকাল দুই গোয়েন্দা।
প্রাসাদের নিচেই আছে ড্রেন, জানাল মরিভে। ডেনজো নদীতে গিয়ে পড়ছে পানি। বাইরে নিশ্চয় তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। থামল সে। ডেনজোর ওই ড্রেনগুলো শত শত বছরের পুরানো। পাথরের তৈরি পাতাল-খাল বলা চলে ওগুলোকে। তলাটা চ্যাপ্টা, ছাত ধনুকের মত বাঁকানো। মাটির তলায় মাইলের পর মাইল জুড়ে রয়েছে ওই ড্রেন। শুকনোর সময় হেঁটেই যাওয়া যায় ওর ভেতর দিয়ে। বর্ষায় পানিতে যদি একেবারে ভরে না যায়, নৌকা বাওয়া যায় অনায়াসে।
চুপ করে মরিডোর কথা শুনছে দুই গোয়েন্দা। চোখে মুখে আগ্রহের ছাপ।
ওদের দিকে চেয়ে হাসল মরিডো। আজকাল খুব কম লোকেই ঢোকে এর ভেতর। পথ হারিয়ে মরার ভয় আছে। তাছাড়া রয়েছে ইঁদুর। বেড়ালের সমান বড় একেকটা। কায়ামত পেলে ধরে জ্যান্ত মানুষ খেয়ে ফেলতেও দ্বিধা করে না। তবে আমি আর মেরি ভয় করি না ওসবকে। ভালমতই চিনি ভেতরটা। অনেকবার ঢুকেছি। ওর ভেতরে গিয়ে কোনমতে ঢুকতে পারলে ঠিক চলে যেতে পারব আমেরিকান এমব্যাসির তলায়। ম্যানহোল দিয়ে উঠে যেতে পারব বাইরে।
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর, মাথা ঝোঁকাল আস্তে করে। বুঝলাম। কিন্তু আমরা বন্দি রয়েছি ডানজনে, দরজায় তালা। বাইরে প্রহরী। নর্দমায় পৌঁছব কি করে?
মিনিটখানেকের জন্যেও যদি সময় পাই, বলল মরিডো। পৌঁছে যেতে পারব। বাইরে যে করিডরুটা আছে, তার শেষ মাথায় রয়েছে ম্যানহোল। ওটা দিয়ে সহজেই ঢুকে পড়া যাবে ড্রেনে।
কিন্তু সেজন্যে বেরোতে হবে আগে, আবার নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে শুরু করল কিশোর।
ওখানে আমাদেরকে সাহায্য করার জন্যে লোক রয়েছে। এক প্রহরী মেসেজ দিয়েছে আমাকে।
তা দিয়েছে, কথা বলল রবিন। কিন্তু ওই যে, কিশোর বলল। ডানজন থেকে বেরোব কি করে আমরা?
হুউ! ধীরে ধীরে মাথা ঝোকাল মরিডো। চুপ করে গেল।
আচ্ছা, বলল রবিন। ওই বুড়ো জাদুকরটা আসলে কে? আমাদের মনের কথা জানল কি করে? থট রীডার গোছের কিছু?
হয়ত, মাথা ঝোঁকাল মরিডো। জানি না ঠিক। ভ্যারানিয়ায় এখনও কিছু জিপসি রয়েছে। তাদের সর্দার ওই বুড়ো। একশোর বেশি বয়েস। আশ্চর্য কিছু ক্ষমতার অধিকারী। কি সে ক্ষমতা, জানে না কেউই। বুঝতে পারে না। আমার তো মনে হয়, বুড়ো ঠিক জানতে পেরেছে, কোথায় আছে রূপালী মাকড়সা। কিন্তু বলেনি রোজারকে। তবে, একটা ব্যাপারে খারাপ হয়ে গেছে মনটা। ও বলেছে, বিজয়ের ঘণ্টা শুনতে পাচ্ছে। কখনও ভুল হয়নি ওর কথা! ফালতু কথা বলে না। তারমানে, সিংহাসন রোজারের দখলেই যাবে! ধরা পড়বে সমস্ত মিনস্ট্রেলরা, মৃত্যুদণ্ড হবে। আমার বাপকে ধরে আনবে, বন্ধুদের ধরে আনবে। ধরে আনবে মেরিকে…চুপ করে গেল সে।
মরিডোর মনের অবস্থা বুঝতে পারছে রবিন। হাল ছেড়ে দেব না আমরা! দৃঢ় গলায় বলল সে। এক বুড়োর কথায় নিরাশ হয়ে ভেঙে পড়ার কোন মানে হয় না। কোনদিন ভুল করেনি বলেই যে সব সময় সত্যি হবে, এটা মানতে রাজি নই আমি। কিশোর, তোমার মাথায় কোন বুদ্ধি এসেছে?
অ্যাঁ! অন্য জগতে বিচরণ করছিল যেন এতক্ষণ গোয়েন্দাপ্রধান। হ্যাঁ, একটা বুদ্ধি এসেছে। এখান থেকে হয়ত বেরিয়ে যেতে পারব। প্রহরীদের দিয়ে আগে দরজা খোলাতে হবে। তারপর কাবু করে ফেলতে হবে ওদের।
দুটো অস্ত্রধারী লোককে কাবু করব? বলে উঠল মরিডো। কি জোয়ান একেকজন, দেখেছ? হাত দিয়ে চেপে ধরলে নড়তেই পারব। না। নাহ্, পারা যাবে বলে মনে হয় না! এেিদক ওদিক মাখা দোলাল সে।
পারতেই হবে, জোর দিয়ে বলল কিশোর। একটা কথা মনে পড়ছে। রহস্য কাহিনীতে পড়েছিলাম। ওটা নিছকই গল্প। তবে বুদ্ধিটা কাজে লাগাতে পারলে, মনে হয় কাবু করে ফেলতে পারব।
কি? আগ্রহে সামনে ঝুঁকল রবিন।
আমাদের মতই বন্দি করে রাখা হয়েছিল একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে, বলল কিশোর। বিছানার চাদর ছিঁড়ে দড়ি পাকিয়েছিল ওরা। ফাস তৈরি করে ফেলে রেখেছিল দরজার কাছে। তারপর মেয়েটা মেঝেয় পড়ে চেঁচাতে শুরু করেছিল পেট ব্যথা পেট ব্যথা বলে।
