এদিক ওদিক মুখ ঘুরিয়ে ধোয়া থেকে নাক বাঁচানর চেষ্টা করল ওরা। পারল না। নাকের ভেতর দিয়ে যেন মগজে ঢুকে গেল নীল ধোয়া। জ্বালা ধরিয়ে দিল মস্তিষ্কে, ফুসফুসে। তারপর হঠাৎ করেই আশ্চর্য এক পুলক অনুভব করল। আর জোরাজুরি করতে হল না, নিজেদের ইচ্ছেতেই টেনে নিল ধোয়া। ঢিল পড়ল স্নায়ুতে, ঘুম ঘুম লাগছে।
এবার…তাকাও আমার দিকে! ধীরে ধীরে মোলায়েম গলায় বলল আলবার্তো। আমার চোখের দিকে…
পুরোপুরি ভাবতে পারছে না ওরা, তবু চোখ সরিয়ে রাখার চেষ্টা করল বুড়োর চোখ থেকে। পারল না। প্রচণ্ড এক আকর্ষণ, এড়ানর উপায় নেই। নীল চোখের তারার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে মনে হল গভীর নীল সাগরে ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে…চারপাশ থেকে চেপে ধরেছে। যেন পানি…কেমন এক ধরনের উষ্ণ আবেশ….
এইবার বল! আদেশ দিল আলবার্তো। রূপালী মাকড়সা কোথায় ওটা?
জানি না, ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল মরিডো। তার দিকেই চেয়ে আছে এখন বুড়ো। নীল চোখের তারা থেকে আর সরিয়ে নিচ্ছে না চোখ। জানি না…জানি না…
অহ্! বিড়বিড় করল বুড়ো। শ্বাস নাও! আরও জোরে…আরও টেনে…!
একবার করে আবার তিন বন্দির নাকের সামনে কাপ ধরল আলবার্তো, ওদেরকে ধোয়া টেনে নিতে বাধ্য করল। রবিনের মনে হল, আর পানিতে নয়, আকাশে উঠে পড়েছে। সঁতরে চলেছে মেঘের ভেতর দিয়ে।
বাঁকানো আঙুল দিয়ে মরিডোর কপাল টিপে ধরল বুড়ো আলতো করে। ধরে রাখল কয়েক মুহূর্ত, তারপর ছেড়ে দিল। তর্জনীর মাথা ছোঁয়াল কপালের মাঝখানে। মুখ নিয়ে এল মুখের সামনে। স্থির চোখে তাকাল মরিডোর চোখের তারার দিকে।
এবার, ফিসফিস করল বুড়ো। এবার বল!…ভাব! ভাব, কোথায় রেখেছ রূপালী মাকড়সা। কোথায়!…অহ!
দীর্ঘ আরেক মুহূর্ত মরিডোর কপালে আঙুল ছুঁইয়ে রাখল আলবার্তো। তারপর সরিয়ে আনল। কিশোরের ওপরও একই প্রক্রিয়া চালাল। শেষে অহ! বলে সরিয়ে আনল আঙুল কপালের ওপর থেকে।
রবিনের দিকে হাত বাড়াল বুড়ো। ওর কপালে আঙুল ছুঁইয়েই। ঝটকা দিয়ে সরিয়ে আনল, যেন জ্বলন্ত কয়লা ছুঁয়েছে। কুঁচকে গেল ভুরু। তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল রবিনের চোখের দিকে। স্থির চেয়ে রইল দীর্ঘ এক মুহূর্ত।
আলবার্তোর চোখের দিকে চেয়ে বার বার কেবল রূপালী মাকড়সার কথাই মনে আসতে থাকল রবিনের। দুনিয়ার আর সব ভাবনা চিন্তা সরে গেছে বহুদূরে। সে যেন উঠে বসেছে নীল মেঘের চূড়ায়। পায়ের নিচ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে মেঘ। অদ্ভুত এক শূন্যতা মাথার ভেতরে। মনে করতে চাইছে, কোথায় আছে রূপালী মাকড়সা। হঠাৎ এক টুকরো কালো মেঘ আচ্ছন্ন করে ফেলল মনকে…
অবাক হল যেন আলবার্তো। আরেকবার তার প্রক্রিয়া চালাল রবিনের ওপর। বিড়বিড় করল নরম গলায়, ভাব! ভাব! অবশেষে শব্দ করে শ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়াল।
চোখ মিটমিট করতে লাগল রবিন। মনে হল, প্রচণ্ড এক ঘূর্ণিপাক। থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে তাকে।
আপনমনেই ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল বুড়ো। তাকাল রোজারের দিকে।
প্রথম ছেলেটা জানে না, বলল আলবার্তো। ও দেখেনি রূপালী মাকড়সা। মাথাবড় ছেলেটা দেখেছে, তবে হাতে নেয়নি। জানে না কোথায় আছে। আর, ওই বেঁটে ছেলেটা হাতে নিয়েছিল। এবং তারপর…
তারপর? সামনে ঝুঁকে এসেছে রোজার। উত্তেজিত। তারপর কি?
ভাবছিল সে ঠিক মতই। হঠাৎ এক টুকরো কালো মেঘ এসে ঢেকে দিল মনকে। মেঘের ভেতরে হারিয়ে গেল.রূপালী মাকড়সা। এ ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হইনি আর কখনও! ও জানত, কোথায় আছে। রূপালী মাকড়সা, তারপর হঠাৎ করেই মুছে গেল, মন থেকে। কিছুতেই মনে করতে পারছে না আর। ও না পারলে, আমারও কিছু করার নেই।
হারামির বাচ্চা! গাল দিয়ে উঠল রোজার। চিন্তিত ভঙ্গিতে টোকা দিতে লাগল চেয়ারের হাতলে। বুড়ো জিপসি… বলতে গিয়েও থেমে গেল সে। তাড়াহুড়ো করে স্বর পাল্টাল। জাদুকর আলবার্তো, তুমি যথেষ্ট করেছ। রূপালী মাকড়সা কোথায় রেখেছে, মনে নেই বিটার। এটা তোমার দোষ নয়। কিন্তু, অনুমানে কিছু বলতে পার না? প্রচণ্ড ক্ষমতা তোমার, জানি। অনুমান করা সম্ভব শুধু তোমার পক্ষেই। কোথায় থাকতে পারে রূপালী মাকড়সা? আগ্রহী চোখে আলবার্তোর দিকে। তাকাল সে। এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। ওটার আসলেই কি কোন দরকার আছে? ওটা ছাড়া আমার ইচ্ছে কি পূরণ হতে পারে না? নেহায়েত একটা দুধের বাচ্চাকে সিংহাসনে না বসালেই কি নয়? আমি বসতে পারি না?
রহস্যময় হাসি ফুটল বৃদ্ধ জাদুকরের ঠোঁটে। ডিউক, রূপালী মাকড়সার সঙ্গে সাধারণ মাকড়সার তফাৎ নেই। তোমার ইচ্ছের কথা বলছ? বিজয়ের ঘণ্টা শুনেছি আমি।…বয়েস তো অনেক হল। পরিশ্রম আর করতে পারি না। ঘুমানো দরকার। এবার তাহলে আসি। গুড নাইট!
রহস্যময় হাসিটা লেগেই রইল আলবার্তোর ঠোঁটে। লাঠি ঠুকতে ঠুকতে এগোল দরজার দিকে।
প্রহরীদের দিকে চেয়ে হাত নাড়ল রোজার। জাদুকরকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এস। তারপর ফিরল সঙ্গী ডিউক লুথারের দিকে। শুনলে তো? জাদুকর কি বলে গেল! রূপালী মাকড়সা শুধুই একটা সাধারণ রূপার টুকরো। ওটার কোন ক্ষমতা নেই। এবং ইচ্ছে করলে ওটা ছাড়াই চলতে পারি আমরা। তাছাড়া, ও বলল, বিজয়ের ঘণ্টা শুনতে পাচ্ছে। আর কোন দ্বিধা নেই আমার। জাদুকর আলবার্তোর ভবিষ্যদ্বাণী কখনও মিথ্যে হয় না। আর অপেক্ষা করে লাভ নেই। আগামীকাল সকালেই কাজে লেগে পড়। অ্যারেস্ট কর দিমিত্রিকে। অনির্দিষ্টকালের জন্যে নিজেকে রিজেন্ট ঘোষণা করব আমি। আমেরিকার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক বাতিল করে দেব, আমাদের ঘরোয়া ব্যাপারে অন্যায়ভাবে নাক গোনর জন্যে। ঘোষণা করব, দুটো আমেরিকান স্পাই এবং চোর ধরা পড়েছে আমাদের হাতে। তৃতীয়টার জন্যে পুরস্কার ঘোষণা করব। ভোর হওয়ার আগেই ধরে নিয়ে এস মরিডোর পরিবারের, সব লোককে। মিনস্ট্রেলদের যাকে যেখানে পাবে, ধরে নিয়ে এসে ঢোকাও কয়েদখানায়। ওদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আন। একসঙ্গে অনেক কথা বলে দম নিল ডিউক। আগামীকাল সকালেই পুরো ভ্যারানিয়া চলে আসবে আমার হাতের মুঠোয়। তারপর সিদ্ধান্ত নেব, চোর দুটোকে নিয়ে কি করা যায়। কানমলা দিয়ে ছেড়ে দেব, বের করে দেব দেশ থেকে, নাকি বিচার হবে প্রকাশ্যে? প্রহরীদের দিকে তাকাল। এগুলোকে নিয়ে ভর কয়েদখানায়।
