আন্দাজে কিছু বলা পছন্দ নয় আমার, বলল কিশোর। কাজেই এখন কিছু বলতে চাই না। জামান আসুক, তার সঙ্গে কথা বলে নিই আগে। যে কটা ব্যাপারে শিওর হয়েছি, সবার সামনেই বলব তখন।
দশটা বাজল। উঠে গিয়ে পেরিস্কোপে চোখ রাখল মুসা। একটা ট্যাক্সি এসে ইয়ার্ডের গেটে থেমেছে। ওটা থেকে বেরিয়ে এল জামান। তাড়াহুড়ো করে দুই সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরিয়ে গেল মুসা। অতিথিকে নিয়ে আবার একই পথে ঢুকল হেডকোয়ার্টারে। জামান মর্কেল, তাকে গোপন জায়গায় আনা যায়, এক নাম্বার কথা। দুনাম্বার, সারাজীবন আমেরিকায় থাকছে না সে, লিবিয়ায় ফিরে যাবে শিগগিরই। কাজেই ফাস করে দেবে আস্তানার খবর, এমন ভয় নেই।
জামান, পরিচয় করিয়ে দিল মুসা, রবিন মিলফোর্ড, রেকর্ড রাখা আর গবেষণার দায়িত্বে আছে। আর এ হল গোয়েন্দাপ্রধান কিশোর পাশা।
তোমাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম, একে একে কিশোর আর রবিনের সঙ্গে হাত মেলাল জামান।
এবার কাজের কথায় আসা যাক, বলল কিশোর। মুসা, গত বিকেলে হেডকোয়ার্টার থেকে বেরোনর পর যা ঘটেছে, সব খুলে বল। কিছুই বাদ দেবে না। রবিন, নোট নাও।
একে একে সব বলে গেল মুসা। শর্টহ্যাণ্ডে নোট নিল রবিন। কিশোর গতরাতেই শুনেছে সব কথা, যদিও সংক্ষেপে। কিন্তু সে এই প্রথম শুনল।
সেরেছে! মুসার কথা শেষ হতেই বলে উঠল রবিন। সত্যিই বলতে পারবে না স্টোর-হাউসটা কোথায়?
কি ছোটা ছুটেছি, বলে বোঝাতে পারব না, গতরাতের কথা মনে করে চোখ বড় বড় হয়ে গেছে মুসার। থেমে রাস্তার নাম দেখার সময় কোথায়! পালিয়েছি কোনমতে! ধরতে পারলে আর আস্ত রাখত না। তবে, ট্যাক্সি স্ট্যাণ্ড থেকে বিশ ব্লক দূরে হবে জায়গাটা।
বিইশ ব্লক! আঁতকে উঠল রবিন। একেক সারিতে বিশটা করে ধরলেও চারশো ব্লক খুঁজতে হবে! তারমানে চারশো গলি। আর একেক ব্লকে যতটা বাড়ি, ততগুলো উপগলি! নাহ, অসম্ভব মনে হচ্ছে…
ভুলে যাচ্ছ কেন? বাধা দিয়ে বলল মুসা, স্টোর-হাউসের দরজায় চিহ্ন একে দিয়ে এসেছি।
ঠিক, সায় দিল কিশোর। তাতে কাজ অনেক সহজ হবে।
কিন্তু হাতে আমাদের সময় নেই বেশি, প্রতিবাদ করল রবিন। বড়জোর আজ বিকেল পর্যন্ত। এর মধ্যে খুঁজে বের করতে হবে বাড়িটা। কি করে সম্ভব?
একটা প্ল্যান এসেছে আমার মাথায়, বলল কিশোর। সেই মাফিক কাজ শুরু করে দিয়েছি। তবে তাতেও মোটামুটি সময় লাগবে। তার আগে এস, আলোচনা করে দেখি কি করে মমি-রহস্যের সমাধান করা যায়।
সত্যি রা-অরকনের মমি খুঁজে বের করতে পারবে তোমরা? এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না জামান। কোন উপায় জানা আছে? ফিরে পাব আমাদের পূর্বপুরুষকে?
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে কাটতে ফিরে তাকাল কিশোর। এখনও জানি না। তবে একটু ভুল শুধরে দেয়া দরকার, জামান। রা-অরকন তোমাদের পূর্বপুরুষ নন, অন্তত এখন আমার তাই মনে হচ্ছে।
রেগে উঠল জামান। কিন্তু জ্যোতিষ যে বলল! ও ভাওতা দেয়নি! তাছাড়া, ও নিজে কিছু বলেনি। ধ্যানে বসেছিল। ওর মুখ দিয়ে কথা বলেছেন রা-অরকন। যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী ওই জ্যোতিষ। তার প্রমাণ পেয়েছি আমরা।
একটা কথা ঠিক, বলল কিশোর। তিন হাজার বছর আগে মিশর শাসন করেছিল লিবিয়ানরা।
এবং রা-অরকন ছিলেন লিবিয়ান, রাজার ছেলে, জোরাল কণ্ঠে ঘোষণা করল জামান। জ্যোতিষ তাই বলেছে।
তা বলেছে! কিন্তু কতখানি সত্যি, কে জানে! প্রফেসর বেনজামিনের মত অভিজ্ঞ লোকও জানেন না, রা-অরকন সত্যিই কে ছিলেন? ঠিক কত বছর আগে কবর দেয়া হয়েছিল তাঁকে। হতে পারে তিনি লিবিয়ান। কিন্তু তার অর্থ এই নয় তিনি তোমাদের পূর্বপুরুষ ছিলেনই।
কিন্তু জ্যোতিষ যে বলল! জেদ ধরে বসেছে যেন জামান। মস্ত বড় জ্যোতিষ ওই লোক, তার কথা মিথ্যে হতে পারে না।
কে বলল? বেড়ালটার ব্যাপারেই মিথ্যে বলেছে সে। অন্তত ঠিক কথা বলতে পারেনি।
তোমার কথা বুঝতে পারছি না! কটি করল জামান।
বেশ বুঝিয়ে দিচ্ছি, বলল কিশোর। জ্যোতিষ বলেছে, রা-অরকনের আত্মা তাঁর প্রিয় বিড়ালের রূপ ধরে, দেখা দেবে তোমাদেরকে। বেড়ালটা আবিসিনিয়ান, চোখের রঙে বৈসাদৃশ্য, সামনের দুপা কালো। এই তো?
হ্যাঁ, গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে বলল জামান। দেখা দিয়েছে ও। গত হপ্তার এক রাতে বৃহস্যজনকভাবে আমার ঘরে এসে হাজির হল রা-অরকনের আত্মা, বেড়ালের রূপ ধরে।
তাই, না? উঠল কিশোর। একটা জিনিস দেখাচ্ছি তোমাকে। ছোট্ট গবেষণাগারে গিয়ে ঢুকল সে। বেরিয়ে এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। হাতে সেই বেড়ালটা।
রা-অকনা প্রায় চেঁচিয়ে উঠল জামান। আমার সম্মানিত পূর্বপুরুষ, বহাল তবিয়তেই আছে।
প্রফেসর কেনজামিনের বাড়িতে, একটা ঝোঁপ থেকে বেরিয়েছিল গতরাতে, বলল কিশোর। নিয়ে এসেছি আমরা। এবার দেখ। পকেট থেকে একটা রুমাল বের করল সে। বেড়ালটার সামনে এক পায়ের কালো অংশে জোরে জোরে ডলতে লাগল। সাদা রুমালে কালো দাগ লেগে যাচ্ছে। কালো পা হয়ে যাচ্ছে সাদা। বেড়ালটীর পায়ের ব্লড আসলেই সাদা। এটা মিসেস ভেরা চ্যানেলের স্ফিঙ্কস। কালো রঙ লাগিয়ে দেয়া হয়েছে পায়ে।
এতক্ষণে বুঝল মুসা, গতরাতে কেন এত নিশ্চিত ছিল কিশোর, ওটা মিসেস চ্যানেলের বেড়াল। খাইছে! এ-তো দেখছি ছদ্মবেশ!
কাঁপা কাঁপা হাত বাড়াল জামান। বেড়ালটার একটা পা ধরে দেখল। চোখে অবিশ্বাস। ছদ্মবেশ! তাহলে রা-অরকনের আত্ম নয় ওটা! কিন্তু জ্যোতিষ যে বলল—
