সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, কোন্ পথে বেরিয়ে গেছে চোর, কিশোরের কথার পিঠে বলল রবিন। দরজা খুলে হেঁটে চলে গেছে আর দশজন সাধারণ মানুষের মতই।
এবং দরজায় আবার তালা লাগিয়ে গেছে, বলল কিশোর। দরজা খুলে বাইরের দিকের বোল্ট-লক পরীক্ষা করল। মলম লেগে আছে হালকাভাবে। হুমম! চাবি আছে ওর কাছে!
অসম্ভব! প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন অলিভার। ওটা স্পেশাল লক। চাবি থাকতেই পারে না কারও কাছে!
কিন্তু আছে, দৃঢ় কণ্ঠে বলল কিশোর। দরজা বন্ধ করে দিল আবার।
সবকটা ঘরে তন্ন তন্ন করে মলমের দাগ খুঁজল ওরা এরপর। বাথরুমের আয়নায় পাওয়া গেল ছাপ। পাওয়া গেল ওষুধের বাক্সের গায়ে।
মেডিসিন কেবিনেটও খুলেছিল সে, হাসল কিশোর।
ঘোঁৎ ধরনের একটা শব্দ করলেন অলিভার। রেগে গেছেন।
যাক, উন্নতি হচ্ছে তদন্তের, আবার বলল কিশোর।
তাই কি?
নিশ্চয়, গভীর আস্থা কিশোরের কণ্ঠে। প্রথমেই জেনে গেলাম, আপনার ঘরে ঢুকে ড্রয়ার, জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে যে, তার হাতে মলম লাগে। তারমানে অশরীরী নয়। আর দশজন মানুষের মতই স্বাভাবিকভাবে দরজা খুলে ঢুকেছিল সে আজ সকালে, বেরিয়ে গেছে আবার দরজা দিয়েই। অর্থাৎ, দেয়াল কিংবা কাঠের দরজা ভেদ করে সে আসে না। এবার গিয়ে চত্বরে বসব। চোখ রাখব, কারা। আসছে, কারা যাচ্ছে। হাতের দিকে নজর রাখব। কালো দাগ দেখলেই ধরব ক্যাক করে।
এখানে যারা থাকে, তাদের কেউ যদি না হয়? বললেন অলিভার।
আমি শিওর, এ-বাড়িতেই থাকে সে। এমন কেউ, যে সকালে আমাদেরকে বেরিয়ে যেতে দেখেছে।
অলিভারকে ঘরে রেখে বেরিয়ে এল তিন গোয়েন্দা। চত্বরে নামল। বসে পড়ল গিয়ে সুইমিং পুলের কিনারে সাজানো চেয়ারে।
দারুণ একখান পুলি! চোখ চকচক করছে মুসার।
কেউ কোন জবাব দিল না।
কি ভেবে উঠে পড়ল রবিন। পুলের কিনারে গিয়ে বসে পড়ল। তাকাল নিচে। টলটলে পরিষ্কার পানি। তলায় নীল আর সোনালি রঙের মোজাইক। খুব সৌখিন লোকের কাজ! স্যান সিমেঅন-এর হাস্ট ক্যাসলে আছে এমন একটা পুল, দেখেছি। পানিতে হাত রাখল সে। উষ্ণ রাখা হয়েছে কৃত্রিম উপায়ে।
গেটের বাইরে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হল। লাফিয়ে ভেতরে এসে ঢুকল একটা ধূসর বেড়াল, পেছনে একজন লোক। তামাটে চুল। সাদা সোয়েটারের ওপর খাকি। রঙের জ্যাকেট। ছেলেদের দিকে একবার তাকাল। কোনরকম আগ্রহ দেখাল না। বেড়ালটার পিছু পিছু চত্বর পেরিয়ে চলে গেল বাড়ির এক প্রান্তের একটা দরজার কাছে। বেড়ালটাকে দরজার গোড়ায় রেখে ভেতরে ঢুকে পড়ল। মাত্র কয়েক সেকেণ্ড পরেই বেরিয়ে এল আবার, হাতে খাবারের প্লেট। নামিয়ে রাখল। খাবারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল বেড়াল। ঝুঁকে গভীর আগ্রহে ওটার খাওয়া দেখতে লাগল। লোকটা।
ব্রায়ান, ফিসফিস করে বলল রবিন। গত সন্ধ্যায়ও দেখেছি ওকে আমরা।
নতুন একটা ভবঘুরে খুঁজে পেয়েছে, ইঙ্গিতে বেড়ালটাকে দেখাল মুসা। অসময়ে খাওয়াচ্ছে দেখছ না। পাঁচটায় খাবার সময়, জানা নেই ওটার।
দ্রুত খাওয়া শেষ করল বেড়ালটা, নিঃশব্দে চলে গেল বাড়ির পেছনে। শূন্য প্লেটটা তুলে নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল ব্রায়ান এনড্রু।
সিঁড়িতে আবার শোনা গেল পায়ের শব্দ, আবার খুলে গেল গেট। ভেতরে ঢুকল বলিষ্ঠ সেই লোকটা। জ্যাকবস। ঠোঁটের কোণে সিগারেট। ছেলেদের দিকে চেয়ে সামান্য মাথা ঝোকাল সে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রেখে হাসল। তারপর চলে গেল নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে, ব্রায়ানের পাশের ফ্ল্যাটটাই তার। ও হাত দেবার আগেই ভেতর থেকে খুলে গেল দরজা। বেরোল একটা ছেলে। আঠারো-উনিশ বছর বয়েস।
মামা, ভ্রুকুটি করল ছেলেটা, সিগারেট একবারও সরাতে পার না মুখ থেকে!
বকিসনে, বব। দিনটা খুব খারাপ যাচ্ছে আজ। অ্যাশট্রেটা দিবি?
ধুয়ে রেখে দিয়েছি পুলের কাছে। নাওগে। উহ, কি বিচ্ছিরি গন্ধ! বাড়ির আবহাওয়াই দূষিত করে দিচ্ছ!
ঘুরে দাঁড়াল জ্যাকবস। লম্বা লম্বা পা ফেলে এসে পুলের ধার থেকে তুলে নিল বিশাল, ছোটখাট একটা গামলার মত অ্যাশট্রে। ছেলেদের পাশের একটা চেয়ারে বসে পড়ে অ্যাশট্রেতে ছাই ঝাড়ল সিগারেটের। ধূমপান করে চলল নীরবে।
আমার ভাগ্নেটার মত নিশ্চয় পাকামো কর না তোমরা? এক সময় কথা বলল। জ্যাকবস। গুরুজনদের কোন ব্যাপারে নাক গলাও না তো?
আমার বাবা-মা সিগারেট খায় না, সাফ জবাব দিয়ে দিল মুসা।
ঘোৎ করে উঠল জ্যাকবস। আমারও খাওয়া উচিত হচ্ছে না। তবে, সাবধানে থাকি আমি। যেখানে-সেখানে ছাই ঝাড়ি না, আগুন লাগিয়ে দিই না। এমনভাবে বলছে সে, যেন আগুন লাগিয়ে দেয়াটাই সিগারেট খাওয়ার একমাত্র দোষ। অফিসে এ-রকম আরেকটা অ্যাশট্রে আছে আমার। কাজ করার সময়ও সতর্ক থাকি আমি। অ্যাশট্রের মাঝখানে পোড়া সিগারেট খুঁজে রেখে তারপর কাজে হাত দিই।
সিগারেটে সুখটান দিল জ্যাকবস। পোড়া টুকরোটা অ্যাশট্রেতে ঠেসে নিভিয়ে উঠে দাঁড়াল। অ্যাশট্রেটা নিয়ে চলে গেল তার ঘরে।
কত রকমের মুদ্রাদোষ যে থাকে মানুষের বাধা পেয়ে থেমে গেল মুসা।
তোমার যেমন ইয়াল্লা আর খাইছে, ফস করে বলে বসল রবিন।
কথাটা কানে তুলল না মুসা। পুলের ওপাশে আরেকটা ফ্ল্যাটের দরজার দিকে চেয়ে আছে। টমি গিলবার্ট কি ঘরেই আছে! পর্দা টানা! কিশোরের দিকে তাকাল। চল না, বেল বাজাই? দেখি আছে কিনা—
