ভারমন্টে, বাজারের এক দোকানে কাজ করে, মাঝরাত থেকে সকাল পর্যন্ত, বললেন অলিভার। ছেলেটার, চালচলন কেমন একটু অদ্ভুতই মনে হয় আমার কাছে। টমি, নামটাও যেন কেমন। বুড়ো হলেও টমি বলে ডাকা হবে, ভাবতেই হাসি পায়। আমার সবচেয়ে ছোট অ্যাপার্টমেন্টটা ভাড়া নিয়েছে সে। তেমন আয় নেই, বোঝা যায়। একটা মেয়েও ভাড়া থাকে আমার বাড়িতে। লারিসা, লারিসা ল্যাটনিনা। টমির বয়েসী, ওর পাশের অ্যাপার্টমেন্টটা নিয়েছে। শহরতলীতে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে চাকরি করে। আর, ফ্র্যাঙ্কলিন জ্যাকবস একজন স্টকব্রোকার।
পুলিশ চলে যাবার পর গত সন্ধ্যায় যে লোকটাকে দেখলাম? জানতে চাইল রবিন।
হ্যাঁ। বাড়ির শেষ মাথায় কোণের একটা ফ্ল্যাট নিয়েছে। খুব সকালে বেরিয়ে অফিসে চলে যায়, দুপুরের পর ফেরে। ওর এক ভাগ্নে, বব বারোজ, কলেজে পড়ে। জ্যাকবসের কাছেই থাকে। আরও একজন থাকে আমার বাড়িতে। ব্রায়ান এনড্রু, ওরফে বেড়াল-মানব।
বেড়াল-মানব! বিশাল এক স্যাণ্ডউইচে কামড় বসাতে গিয়েও থেমে গেছে মুসা।
হাসলেন অলিভার। আমিই ওই নাম রেখেছি। বেড়াল নিয়ে মেতে থাকে। রোজ বিকেল পাঁচটায় পাড়ার যত ভবঘুরে বেড়াল আছে, এসে হাজির হয় ওর ঘরে। ওগুলোকে খাবার দেয় সে। নিজের পোষা একটা বিড়াল আছে, একটা সিয়ামিজ বেড়াল।
কাজকর্ম কি করে? জানতে চাইল মুসা।
কিছু না, বললেন অলিভার। ব্যাংকে বোধহয় জমানো টাকা আছে। তুলে আনে, আর খরচ করে। সারাদিনই প্রায় বাইরে বাইরে ঘোরে। ভবঘুরে বেড়াল ধরে আনে, যেগুলো তার বাড়ির সন্ধান পায়নি। আহত, বা রোগা বেড়াল দেখলে, তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের খরচে পৌঁছে দিয়ে আসে পশু হাসপাতালে।
আর কে কে বাস করে আপনার বাড়িতে? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
আরও অনেকেই থাকে। মোটমাট বিশজন ভাড়াটে। বেশির ভাগই খেটে খাওয়া মানুষ। যাদের নাম বললাম, তারা ছাড়া আর সবাই ছুটিতে বাইরে গেছে। আত্মীয়-স্বজন কিংবা বন্ধুদের ওখানে বড়দিন পালন করবে। ছুটি শেষ হলেই ফিরে আসবে আবার। ব্রায়ানের ভাগ্নেকে ধরলে, এখন মোট সাতজন আছে আমার। বাড়িতে।
ভালই, বলল কিশোর। সন্দেহের আওতা খুব সীমিত।
ঝট করে চোখ তুললেন অলিভার। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তুমি কি ভাড়াটেদের কাউকে সন্দেহ করছ? ওদেরই কেউ আমার ঘরে ঢোকে, ভাবছ?
আরও প্রমাণ দরকার, নইলে শিওর হয়ে বলতে পারব না। তবে, লোকটা এমন কেউ, যে জানে, কখন আপনি বাড়ি থাকেন, কখন থাকেন না। আমরা বেরিয়ে এসেছি দেখে থাকলে, আজও ঢুকতে পারে আপনার ঘরে।
কাঁধ ঝাঁকালেন মিস্টার অলিভার। হয়ত তোমার কথাই ঠিক, কিশোর। আমার ডেস্ক ঘাটার অনেক সময় পেয়েছে সে আজ।
খাওয়া শেষ হল। ওয়েটারকে বিল আনতে বললেন অলিভার।
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এল চারজনে। উইলশায়ার রোড ধরে এসে ঢুকল। প্যাসিও প্লেসে। গির্জার সামনের রাস্তা একেবারে নির্জন। অ্যাপার্টমেন্ট হাউসে এসে পৌঁছুল ওরা। ঘরের ভেতরে বাসন-পেয়ালা ধুচ্ছে মিসেস ডেনভার, গেট থেকেই শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ওই মেয়েমানুষটাকেও খেতে হয় মাঝে মাঝে, বলে উঠলেন অলিভার, তাই রক্ষে! নইলে চব্বিশ ঘণ্টায় কখনও বুড়িটার চোখের আড়ালে থাকতে পারতাম না। শকুনি, শকুনি!
হেসে ফেলল মুসা। খুব বেশি বিরক্ত করে বুঝি?
করে মানে? সারাক্ষণ ভাড়াটেদের পেছনে লেগে আছে। কে কখন কি করছে না করছে, চোখ রাখছে। উদ্ভট সব প্রশ্ন করে বসছে মাঝে মাঝেই। শুধু তাই না, কে কি খায় না খায়, তা-ও ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া উচ্ছিষ্ট ঘেঁটে দেখে আসে। কয়েকবার ডাস্টবিন ঘটতে দেখেছি আমি ওকে। বুড়িটার বকবকানির দৌলতে কে কি খায়, কি করে, আমারও জানা হয়ে গেছে অনেকখানি। জানি, লারিসার প্রিয় জিনিস চকলেট, ডিনার খায় ঠাণ্ডা করে। ব্রায়ানের বেড়ালগুলো হপ্তায় চল্লিশ টিন। খাবার সাবাড় করে, এটাও জানি। এ-বাড়িতে থেকে কারও গোপনীয়তা বলে আর কিছু রইল না। সব ওই বুড়িটার কল্যাণে।
অলিভারের পিছু পিছু ব্যালকনিতে এসে উঠল তিন গোয়েন্দা। তালা খুললেন তিনি। দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন। ছেলেরাও ঢুকল।
খবরদার! ঘরে ঢুকেই সাবধান করল কিশোর। কেউ কোন জিনিসে হাত দেবে না। পকেট থেকে ছোট একটা আতশী কাঁচ বের করে সোজা গিয়ে ঢুকল। মিস্টার অলিভারের কাজের ঘরে। কাঁচের ভেতর দিয়ে পরীক্ষা করল ড্রয়ারের হাতল।
বাহু, চমৎকার! চেঁচিয়ে উঠল গোয়েন্দাপ্রধান।
প্রায় ছুটে দরজায় এসে দাঁড়ালেন অলিভার।
ড্রয়ার খুলেছিল কেউ, জানাল কিশোর। হাত দিয়েছিল হাতলে। মানুষের হাত, ভূত-ফুত না। মলমে ছাপ পড়ে আছে।—রবিন, একটা তোয়ালে, প্লীজ।
তাড়াতাড়ি রান্নাঘর থেকে একটা কাগজের তোয়ালে এনে দিল রবিন।
সাবধানে হাতলটা মুছে ফেলল কিশোর।
ড্রয়ার খুলব? জানতে চাইলেন অলিভার।
নিশ্চয়।…আমিই খুলছি, ড্রয়ারটা টেনে খুলল কিশোর। দেখুন, কিছু চুরি হয়েছে কিনা।
দেখলেন অলিভার। না, সব ঠিকই আছে। অবশ্য কখনোই কিছু চুরি হয়নি। ঘাটাঘাটি করে যায় শুধু। আজ টেলিফোনের বিলটা খুলে দেখেছে কেউ। সকালে, ড্রয়ারের শেষ দিকে ছিল ওটা, ভাজ করা। খামে ভরা।
খামের ওপর মলম লেগে আছে, খুশিতে দাঁত বেরিয়ে পড়েছে কিশোরের। খুব ভালমতই হাতে লাগিয়েছে মলম।
ও-ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল কিশোর। বসার ঘর পেরিয়ে সামনের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। ঝুঁকে ভালমত পরীক্ষা করল হাতলটা। এখানে মলম মাখাইনি। কিন্তু এখন লেগে আছে।
