চুপ! হঠাৎ শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেছে কিশোরের।
চত্বরে বেরিয়ে এসেছে মিসেস ডেনভার। এক টুকরো টিপেপার দিয়ে জোরে জোরে ডলছে হাত। পুলের কাছে ছেলেপিলেদের বসা নিষেধ। নাকী গলায় খেঁকিয়ে উঠল সে।
উঠে দাঁড়াল কিশোর। এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল মহিলার সামনে। মিসেস ডেনভার, কি হয়েছে আপনার হাতে? কি লাগিয়েছেন?
মানে?
হাত দুটো দেখাবেন? জোরে জোরে বলল গোয়েন্দাপ্রধান।
কিশোরের গলা শোনার অপেক্ষায়ই ছিলেন অলিভার। ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন।
আপনার হাতে কালো দাগ, কিসের? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
এই ইয়ে, মানে— থতমত খেয়ে গেছে মিসেস ডেনভার। রান্নাঘরে—
আপনি মিস্টার অলিভারের ঘরে ঢুকেছিলেন, কঠিন কণ্ঠে বলল কিশোর। তাঁর ডেস্কের ড্রয়ার খুলেছেন, কাগজপত্র ঘেঁটেছেন, চিঠিপত্র পড়েছেন, মেডিসিন কেবিনেট খুলেছেন, বাথরুমের আয়নায় হাত দিয়েছেন। কেন?
০৬.
জীবনে বোধহয় এই প্রথম বাকশক্তি হারিয়ে ফেলল মিসেস ডেনভার। হাঁ করে চেয়ে আছে কিশোরের দিকে। রক্ত জমেছে মুখে, লাল, আরও লাল হয়ে উঠছে।
ডলে ফল হবে না, বলল কিশোর। সহজে উঠবে না ওই দাগ।
নেমে এসে ছেলেদের পাশে দাঁড়ালেন অলিভার। মিসেস ডেনভার, আপনার। সঙ্গে কয়েকটা কথা আছে আমার।
অলিভারের কথায় চমকে যেন বাস্তবে ফিরে এল ম্যানেজার। নাকী গলায় চেঁচিয়ে উঠল, জানেন, এই বিচ্ছটা কি বলেছে আমাকে? চোর বলেছে!
জানি। ঠিকই বলেছে! জবাব দিলেন অলিভার। বাড়ির সবাই জানুক, এটা নিশ্চয় চান না? মিসেস ডেনভারের দরজার দিকে এগোলেন। আসুন। কথা বলব। ছায়াশ্বাপদ।
আমি…আমি ব্যস্ত, গলার স্বর খাদে নেমে গেছে ম্যানেজারের। অনেক-অনেক কাজ পড়ে আছে, জানেন আপনি।
জানি, জানি, বললেন অলিভার। আপনার তো চব্বিশ ঘন্টাই কাজ! তো, আজ আর কি কি করার ইচ্ছে? ডাস্টবিন ঘটবেন? আর কারও ঘরে ঢুকবেন?…আসুন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বকতে পারব না।–নাকি, উকিলকে টেলিফোন করব?
আর কিছু বলতে হল না। প্রায় উড়ে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল মিসেস ডেনভার।
তিন গোয়েন্দার দিকে চেয়ে হাসলেন অলিভার। তোমাদের আসা উচিত হবে না। ওখানে বস। আমি কথা বলে আসছি।
দরজা খোলা। ভেতরে ঢুকে পড়লেন অলিভার। বন্ধ করে দিলেন দরজা।
চুপচাপ বসে রইল তিন গোয়েন্দা। কান খাড়া। মিসেস ডেনভারের তীক্ষ্ণ, নাকী গলা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কি বলছে, বোঝা যাচ্ছে না। খানিক পর পরই থেমে। যাচ্ছে তার গলা। ছেলেরা বুঝতে পারছে, তখন নিচু গলায় কথা বলছেন অলিভার। তাঁর গলা শোনা যাচ্ছে না।
খুব ভালমানুষ, এক সময় বলল মুসা। কিন্তু, আমার মনে হয়, প্রয়োজনে সাংঘাতিক কঠোর হতে পারেন তিনি। মোলায়েম গলায় কি ধমকটাই না লাগালেন ম্যানেজারকে।
পুলের ওপাশে দরজা খোলার শব্দ হল। ফিরে তাকাল তিন গোয়েন্দা। বেরিয়ে। আসছে টমি গিলবার্ট। রোদের দিকে চেয়ে চোখ মিটমিট করছে, অন্ধকারের জীবের মত। পরনে মোটা সুতার পাজামা, দলে-মুচড়ে আছে। শার্টের কয়েকটা বোতাম। নেই। পা খালি। হাই তুলল সে।
গুড মর্নিং, বলল কিশোর।
আবার চোখ মিটমিট করল টমি। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে রগড়াল। চুল-মুখ অপরিষ্কার, ধোয়া হয়নি।
আবার হাই তুলল টমি। জিভ আর টাকরার সাহায্যে অদ্ভুত আঁ-ম আঁ-ম শব্দ করল। চোখে যেন কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। একটা চেয়ারে হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে কোনমতে সামলে নিল। মাথা ঝাড়া দিয়ে তাকাল একবার পুলের দিকে। ছেলেদের দিকে ফিরল। বসবে কি বসবে না, দ্বিধা করছে।
অবশেষে ধপ করে পাথুরে চত্বরেই বসে পড়ল। গুটিয়ে হাঁটুর ওপর তুলে নিল পাজামার নিচের দিকটা। তারপর একটা বিশেষ ভঙ্গিতে বসল।
ভঙ্গিটা চেনে কিশোর। যোগ ব্যায়ামের একটা আসন, পদ্মাসন। গুড মর্নিং, আবার বলল সে।
ফ্যাকাসে মুখটা কিশোরের দিকে ফেরাল টমি। পুরো এক সেকেণ্ড স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। চোখের কোন নির্দিষ্ট রঙ বোঝা যাচ্ছে না। মণির চারপাশের সাদা অংশটা টকটকে লাল, ঘুমিয়ে ছিল, কিন্তু ঘুম ভাল হয়নি যেন!
এখনও সকালই রয়েছে? অবশেষে কথা বলল টমি।
হাতঘড়ির দিকে তাকাল কিলোর। না, তা নেই। একটা বেজে গেছে।
আবার হাই তুলল টমি।
মিস্টার অলিভারের কাছে শুনলাম, আপনি ভারমন্টের একটা নাইটশপে কাজ করেন? বলল কিশোর।
সামান্য সতর্ক মনে হল টমিকে। মৃদু হাসল। মাঝরাত থেকে সকালতক। খুব খারাপ সময়। তবে ভাল পয়সা দেয় ওরা। ওই সময়টীর জন্য আলাদা ভাতা দেয়। কাজেই ছাড়ি না। তাছাড়া সারাদিন আর রাতের অর্ধেকটা সময়ই থাকে আমার। পড়াশোনা করতে পারি।
স্কুলে পড়েন? জানতে চাইল কিশোর।
মুখ বাঁকাল টমি, হাত নাড়ল বিশেষ ভঙ্গিতে, যেন স্কুলে যাওয়াটা বেহুদা সময় নষ্ট। বহু আগেই ওই পাট চুকিয়েছি। বাপ চেয়েছে, আমি কলেজে যাই। তারপর ডেন্টিস্ট হই। কোন মানে খুঁজে পেলাম না এর। কে যায়, সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকে। লোকের মাড়ি খোঁচাখুঁচি করতে? আসলে, ও-সবই এক ধরনের মোহ, মায়া।
মোহ! বিড়বিড় করল মুসা।
হা। সবই মোহ। পুরো দুনিয়াটাই একটা মায়া। সবাই আসলে ঘুমে অচেতন আমরা, ঘুমের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখছি। ব্যাপারটা বুঝে গেছি আমি। তাই জেগে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছি।
মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল রবিন আর মুসা। মনের ভাব, মাতাল নয় তো ব্যাটা?
