মিস্টার অলিভার, জোর দিয়ে বলল কিশোর। আগে চেষ্টা করে দেখতে হবে। আমাদের। হবে না বলে কিছুই না করলে, সত্যি সত্যি হবে না। আপনিই তো বলেছেন, বাইরে থেকে ফিরে এসে খোলা পেয়েছেন ড্রয়ার।
বেশ, বিশেষ ভরসা পাচ্ছেন বলে মনে হল না, তবু সম্মতি দিলেন অলিভার। সব রকমভাবে চেষ্টা করে দেখতে রাজি আছি আমি। যাও, মাখাও তোমার মলম। তারপর চল, বাইরে কোথাও গিয়ে খেয়ে আসি। খুব খিদে পেয়েছে।
ঠিক, চেঁচিয়ে উঠল মুসা। খুব ভাল কথা বলেছেন। খিদেয় নাড়িভুড়িই হজম হয়ে যাচ্ছে আমার!
ড্রয়ারের হাতলে সাবধানে মলম মাখাল কিশোর। হাত লাগাল না, কাগজের তোয়ালেতে লাগিয়ে নিল আগে, তারপর ডলে ডলে ভালমত লাগাল চীনামাটির হাতলে।
তিন গোয়েন্দাকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন অলিভার। কোথায় খেলে ভাল হয়, প্রস্তাব দিল মুসা। উত্তেজনায় জোরে জোরে কথা বলছে সে। দরজা বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিলেন অলিভার। সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন ওরা চারজন।
শূন্য চতৃর। গেটের কাছে সাক্ষাৎ হয়ে গেল মিসেস ডেনভারের সঙ্গে। আরও একজন দাঁড়িয়ে আছে তার কাছাকাছি। টমি গিলবার্ট। গির্জার দিকে তাকিয়ে আছে। ওরা।
গির্জার চত্বরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা অ্যামবুলেন্স।
কি হয়েছে? জিজ্ঞেস করল মুসা।
গির্জার দারোয়ান, বলল টমি। মারাত্মক আহত! এই খানিক আগে চিলেকোঠায় ওঠার সিঁড়ির গোড়ায় পাওয়া গেছে তাকে। বেহুশ! দেখতে পেয়েছেন, ফাদার স্মিথ!
.
০৫.
গির্জায় ছুটে গেল তিন গোয়েন্দা আর মিস্টার অলিভার।
একটা স্ট্রেচার তুলে নিয়েছে সাদা পোশাক পরা দুজন লোক। তাতে দারোয়ান পল, গলা পর্যন্ত টেনে দেয়া হয়েছে চাদর।
গির্জা থেকে বেরিয়ে এলেন ফাদার স্মিথ। পেছনে এল মিসেস ব্রাইস।
ওকে মেরে ফেলেছে! বিলাপ করে কেঁদে উঠল ব্রাইস। মেরে ফেলেছে! খুন! খুন করেছে বেচারাকে!
ব্রাইস, ভুল বলছ, শান্ত গলায় বললেন ফাদার। মেরে ফেলেনি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, চেহারা ফ্যাকাসে। কম্পিত হাতে গির্জার দরজায় তালা লাগালেন তিনি। গতরাতে ওর সঙ্গে আসা উচিত ছিল আমার! একা তালা লাগাতে পাঠানো উচিত হয়নি মোটেই! ইসস, সারাটা রাত ঠাণ্ডার মধ্যে পড়ে ছিল বেচারা!
সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন ফাদার। সব আমার দোষ! ওরও বাড়াবাড়ি আছে! কতবার বলেছি, রাতে বাতি নেবে না। অন্ধকার রাখবে না চত্বর। না, কথা শুনবে না। বিদ্যুতের খরচ বাঁচায়। এখন হল তো!
বুদ্বু! একেবারে গাধা!কাঁদতে কাঁদতে বলল ব্রাইস। কি এমন খরচ বাঁচত! এখন? এখন তো থাকবে হাসপাতালে পড়ে!
ওসব ভেবে কিছু হবে না, ব্রাইস, বললেন ফাদার। যাও…যাও, চমৎকার এক কাপ চা বানিয়ে খাও গিয়ে। ভাল লাগবে। অ্যামবুলেন্সের পেছনের সিটে গিয়ে উঠলেন তিনি। দরজা বন্ধ করে দেয়া হল। স্টার্ট নিয়ে চলে গেল গাড়ি।
শুনেছেন, চা! অলিভারের দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে উঠল ব্রাইস। চমৎকার এক কাপ চা খেতে বলছে! ওদিকে বোধহয় মারাই গেল লোকটা! আমাকে চা খেয়ে শান্ত, হতে বলছে! ঈশ্বর! লোকটার এক্কেবারে মায়াদয়া নেই! ভূতটা হয়ত শেষই করে দিল পল বেচারাকে… ঝড়ের মত ছুটে চলে গেল মহিলা রেকটরির দিকে।
ভূত? অলিভারের দিকে চেয়ে বলল রবিন।
মিসেস ব্রাইসের ধারণা, গির্জার আশপাশে ভূত আছে, বললেন অলিভার। দেখেছেও নাকি সে। এর আগের ফাদার, বৃদ্ধ হয়ে মারা গেছিলেন এখানেই। বছর তিনেক আগে। কারও কারও ধারণা, গির্জার মায়া ত্যাগ করতে পারেননি তিনি। মৃত্যুর পরেও এসে ঘুরে বেড়ান এর ভেতরে। চল, খাওয়ার কাজটা সেরে ফেলি।
উইলশীয়ার বুলভার্ড-এর দিকে চলল ওরা।
মিস্টার অলিভার, হাঁটতে হাঁটতে বলল রবিন। আপনার ঘরে যে আসে, সে আর এই গির্জার ভূত কি একই? কি মনে হয় আপনার?
নিশ্চয় না! জোর দিয়ে বললেন অলিভার। ফাদারের ভূত হলে দেখামাত্রই চিনতাম। তবে সেটা আছে কিনা, শিওর না আমি। আজ অবধি শুধু মিসেস ব্রাইসই দেখেছে ওটা, আর কেউ না। মহিলা বলে, রাতে, মোমবাতি হাতে গির্জার ভেতরে ঘুরে বেড়ায় ফাদারের প্রেতাত্মা। আমার বিশ্বাস হয় না। কেন সেটা করবেন তিনি? খুব ভাল লোক ছিলেন। ভাল লোকেরা মৃত্যুর পর ভূত হয় না। কতদিন তাঁর সঙ্গে দাবা খেলেছি। নাহ্, তার ভূত হতেই পারে না।
আড় নিল ওরা। কয়েকটা ব্লক পেরিয়ে এসে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে। দাঁড়াল। তিন গোয়েন্দাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন অলিভার।
সুন্দর রেস্টুরেন্ট। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দরজার পেতলের হাতলগুলোও নিয়মিত। ঘষামাজায় ঝকঝক করছে। টেবিলে পরিষ্কার টেবিলক্লথ, কড়া মাড় দিয়ে ইস্তিরি করা। প্রতিটি টেবিলের মাঝখানে ফুলদানীতে ফুল। কৃত্রিম, কিন্তু ভাল করে খেয়াল না করলে বোঝাই যায় না, মনে হয় আসল। খদ্দের নেই। অসময়। নাশতার সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগে, আবার লাঞ্চেরও সময় হয়নি এখনও। ওরা চারজন আর একজন ওয়েটার ছাড়া কোন লোক নেই পুরো ঘটাতে।
খাবার এল।
মিস্টার অলিভার, প্লেট টেনে নিতে নিতে বলল কিশোর, আপনার অ্যাপার্টমেন্ট হাউসটা অনেক বড়। সেই তুলনায় তোক দেখিনি। ভাড়াটে কি নেই? শুধু মিসেস ডেনভার—
মহিলার নামটা শুনেই মুখ বাঁকালেন অলিভার।
..মিসেস ডেনভার, আবার বলল কিশোর। আর টমি গিলবার্ট। বড় অসময়ে বাসায় দেখা যায় লোকটাকে।
