ভেতরের দৃশ্যটা দেখে আঁতকে উঠল সার্জেন্ট ব্যাঙ্কস, আর একই সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল মোনা রোপ।
উইঙ্ক থ্রি টাইমস – জন চার্টারস
আমান্ডা উইন্টারটন তার কুমারী জীবনের প্রায় অবসান ঘটাতে চলেছে।
ভাবনাটি তার শরীরে শিহরণ তুলল, ঝিমঝিম করে উঠল মাথা, মুদে এল চক্ষু এবং নিঃশ্বাস হয়ে উঠল ঘন। সে তার টাইপিং ডেস্কের ড্রয়ার খুলে পেন্সিল খোঁজার ভান করল পাছে অফিসের অন্য মেয়েরা তার জ্বলজ্বলে চেহারাটা দেখে ফেলে এবং তাকে নিয়ে নিতান্তই অবাচীন ও নিষ্ঠুর তামাশায় মেতে ওঠে। ওরা তাকে পেছনে কুমারী বুড়ি বলে ঠাট্টা করে, কখনও কখনও সামনে বলতেও কসুর করে না।
যেহেতু ওরা বয়সে তরুণী এবং সুন্দরী, ছোট ছোট স্কার্ট পরে যেসব সেলসম্যান আসে তাদের প্রত্যেককে সুঠাম পায়ের ঝলক দেখিয়ে দেয় এবং আপত্তিকর সব কথা বলে যা শুনলে ঝাঁ ঝাঁ করে কান, কাজেই তারা যে আমাকে পাত্তা দেবে না এবং কুষ্ঠরোগীর চোখে দেখবে সেটাই স্বাভাবিক।
আমার বয়স আটত্রিশ, একুট বেশিই রোগা, লম্বাটে গড়নের সিরিয়াস চেহারা এবং আঁখিজোড়া বড়বড়। সে তার চুল সবসময় খোঁপা করে রাখে কারণ চুল খুলে দিলে কেশরাজি লুটিয়ে পড়বে তার টাইপরাইটারের ওপর।
গত সতের বছর ধরে, মায়ের মৃত্যুর পর থেকে আমাকে তার পঙ্গু বাপের সমস্ত দেখাশোনা করতে হচ্ছিল। দরদহীন এ সমাজে যারা গ্রাহ্যই করে না আমান্ডার বাপ বাঁচল কী মরল, সামান্য পেনশনের ওপর নির্ভরশীল মানুষটা আঁকড়ে ধরেছিলেন তাঁর মেয়েকে। লোকটার জীবন হুইলচেয়ারে আটকে ছিল, মেয়ে ছাড়া তাঁর কেউ নেই।
ছোট একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকে তারা। প্রতিদিন একই রুটিন: বাবার নাস্তা তৈরি করে আমান্ডা, লাঞ্চ রেডি করে রাখে, তারপর ছোটে অফিসে। অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হয় ডিনার বানাতে। তারপর বাপকে সময় দিতে হয়, তার সঙ্গে কথা বলতে হয়, মাঝে মধ্যে সাদা কালো টিভিতে অনুষ্ঠান দেখে, পয়সার অভাবে রঙিন টেলিভিশন কেনা হয়নি, অতপর বিছানায় গমন; পরদিন একই রুটিনের পুনরাবৃত্তি।
মাঝে মধ্যে দুএকটি শনিবারে সে স্থানীয় সিনেমা হলে মুভি দেখতে যাওয়ার প্রস্তাব পায়। তবে আমান্ডা দেখতে সুন্দরী নয় এবং বাসায় গিয়ে বাবার সেবা যত্ন করতে হবে, এরকম অজুহাতে বিরক্ত হয়ে যায় বন্ধুরা। তারা ওর কথা বিশ্বাস করুক বা না-ই করুক, এর ফলে বন্ধুত্ব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ফলে আমাকে পরবর্তী আরও বহুদিন অপেক্ষায় থাকতে হয় যদি কোনো পুরুষ ওকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে।
তবে এসব ঘটনা ঘটনা আমাকে না হতাশ করে না তিক্ততায় ভরিয়ে তোলে মন। সে তার বাবাকে ভালবাসে এবং তার বোধে এসেছে কোনো মানুষই সারাক্ষণ সুখে থাকে পারে না; তার জীবনের এ বোঝ সে খুশি মনেই মেনে নিয়েছে, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ সে অন্তত সুস্থ এবং নিরোগ আছে, লাফ দিয়ে চলন্ত বাসে উঠতে পারে, এক দৌড়ে সিঁড়ি বাইতেও তার সমস্যা। নেই, যে কাজগুলো তার বাবা আর কোনদিন করতে পারবেন না। অনেক। বছর পরে আমান্ডা বুঝতে পেরেছে তার শাদী হওয়ার কোনো চান্সই নেই; কোনো পুরুষ চলৎশক্তিহীন একজন মানুষকে তার শ্বশুর হিসেবে মেনে। নেবে না। এতেও কিছু মনে করছে না আমান্ডা। এক চোখ বন্ধ করে কেউ কেউ সেক্স এবং বিয়ে ছাড়া থাকতে পারে এবং ভান করতে পারে এসবের কোনো অস্তিত্ব নেই, যদিও কোনো উষ্ণ মধ্য রাত্তিরে ঘুম ভেঙে গেলে যৌবন জ্বালায় কাউকে কাউকে খুব জ্বলতে হয় এবং কামনার গলা টিপেও হত্যা করতে হয়।
আমান্ডা ম্যানেজারের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করে। কাজটি সে উপভোগও করে তবে মুশকিল হলো প্রকান্ড অফিসটি আরও চার জনের সঙ্গে শেয়ার করতে হয়। আর সেই চারজনের প্রত্যেকেই তরুণী, আকর্ষণীয় এবং যথেষ্ট সফিসটিকেটেড। তারা ওকে ঘৃণা করে না, ভৎর্সনাও করে না। তাদের কাছে ও স্রেফ কুমারী বুড়ি, বসের সেক্রেটারি, তাকে ওরা পাত্তাই দেয় না তবে মাঝে মধ্যে মজা করার ইচ্ছে হলে ওরা। চার অক্ষরের শব্দটি নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে আর সেই শব্দটি শুনে লজ্জায় লাল হয়ে যায় আমান্ডা এবং ভান করে কিছু শোনেনি।
আমান্ডা ডেস্কের ড্রয়ার থেকে মুখ তুলে চাইতে দেখল ওর দিকে তাকিয়ে আছে লাল চুলের, লম্বা লম্বা পায়ের অধিকারিণী অকালপকৃ আইরিন।
কী হয়েছে, আমান্ডা, তোমার মুখচোখ কেমন গনগন করছে। আমাদের বাজে কথাটা শুনে ফেললে নাকি?
এইলিন, ছিপছিপে এবং সফিসটিকেটেড, সারাক্ষণই বিরক্তিতে কুঁচকে থাকে চেহারা, নিজের ডেস্ক থেকে মুখ তুলে চাইল।
বুঝতে বোধহয় একটু দেরিই করে ফেলেছ, তাই না? আমি তো ভাবলাম তোমার মাসিক টাসিক বন্ধ হয়ে গেছে বোধহয়।
ওদের কথা শুনে চটে গেল আমান্ডা।
তোমাদের মুখে দেখছি কিছুই আটকায় না। অনেক পড়াশোনা করে এই-ই শিখেছ বুঝি? নাকি জীবনে কোনোদিন স্কুলেই যাওনি? পিথাগোরাসের সূত্র কী জানো?
না, তবে আমি ওর শিশ্ম দেখেছি! আইরিনের চটাস জবাবে মেয়েগুলো হাসিতে ফেটে পড়ল। এমনকী আমান্ডাও হাসল। আজ তাকে কিছুই আপসেট করতে পারবেন না। ঘড়ি দেখল। প্রায় পাঁচটা বাজে। ঘুরতে থাকো ঘড়ির কাঁটা, ঘোয়রা আমার নিয়তির দিকে, আমার কুমারীত্বনাশের দিকে। যে কাজটি করে অবশেষে আমি পরিপূর্ণ নারী হবো।
