আলোর সুইচের দিকে হাত বাড়াল মোনা, সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলাল। আরেকটু হলেই মস্ত এক ভুল করতে যাচ্ছিল সে। বেটি জেগে থাকলে আলো জ্বললেই সে দেখতে পেত মোনার গায়ে বাইরের পোশাক…।
মোনা কাপড় পাল্টাল। রাতের পোশাক পরল। হঠাৎ বালিশের নিচে রাখা হাতুড়িটার কথা মনে পড়ে গেল। জোর করে নিজেকে স্বাভাবিক রাখল ও, হাতুড়িটা নিয়ে রান্না ঘরে গেল, ওটাকে একটা ড্রয়ারে রেখে দিল। তারপর আলো জ্বালল, সিগারেট ধরাল। এখন বেটি ফেয়ারচাইল্ড ওকে ইচ্ছে মতো দেখুক। দেখুক ঝড়ের রাতে তার মতো আরও একজন নির্মম সময় কাটাচ্ছে।
মোনা কফি বানিয়ে নিল। পরবর্তী চারটে ঘন্টা তার কাটল মারিজুয়ানা সেবন করে আর বাইরে ঝড়ো হাওয়ার দাপাদাপি শুনে।
সকাল সাতটার দিকে ঝড়ের তান্ডব থেমে গেল, শুধু বর্ষণধারা অব্যাহত রইল। আটটা বাজার কয়েক মিনিট আগে মোনা শুনল গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে রয়েস ফেয়ারচাইল্ড। আরও মিনিট বিশেক কাটিয়ে দিল সে কাপড় পরতে। তারপর বেরিয়ে পড়ল কনভার্টিবলটা নিয়ে। দেখল জানালার পাশে বসে আছে বেটি, ওকে লক্ষ করছে।
থিয়েটার পার্কিং সেটে চলে এল মোনা, ভাড়া গাড়িটা, এজেন্সির কাছে হস্তান্তর করল। ইচ্ছে করলে কাল রাতেই কাজটা করতে পারত সে। কিন্তু তাতে ধরা পড়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। রাত সাড়ে তিনটায় গাড়ি ফেরত দিতে গেলে এজেন্সি সহজেই তাকে চিনে রাখত, কিন্তু সকাল নটা বিশ-এ সেই আশঙ্কাটা নেই।
অ্যাটেনডেন্ট লোকটা লম্বা-চওড়া কিন্তু নোংরা, দেখে মনে হয় গোসল শব্দটার সঙ্গে পরিচিত নয়।
কাজ শেষ, ম্যাম? জিজ্ঞেস করল সে।
শান্ত গলায় জবাব দিল মোনা, হ্যাঁ। ভাড়া চুকিয়ে পা বাড়াল অফিসের বাইরে।
পেছন থেকে ডাক দিল লোকটা, শুনুন, শুনুন! গাড়ির হাবক্যাপটা কোথায় ফেলে এসেছেন, ম্যাম?
মোনা থমকে দাঁড়াল, ঘুরল। লোকটা সেডানের ডান দিকের হুইলের পাশে দাঁড়ানো, কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে মোনার দিকে। হুইলের ওপর কোনও হাবক্যাপ নেই।
মোনা কোন কথা বলতে পারল না। ওর জিভটা যেন আঠা দিয়ে লেগে আছে টাকরায়। হাবক্যাপটা হারাল কিভাবে? কোথায় কবরে? নাকি মেঠো রাস্তাটার কোথাও? অথবা থিয়েটার পার্কিং লটে।
আ-আমাকে কি এ জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে? তোতলাতে তোতলাতে বলল মোনা।
লোকটা মোনার আগাপাশতলা যেন চাটল চোখ দিয়ে। নিজের সঙ্গে বোধ হয় যুদ্ধ করছে। তার পাতলা ঠোঁটজোড়া একদিকে বেঁকে গেল, বিড়বিড় করে বলল, না, আপনাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। আমাদের বীমা করা আছে।
কাঠ হয়ে এজেন্সি অফিস থেকে বেরুল মোনা, এগোল কনভার্টিবলের দিতে। গাড়ি নিয়ে শপিং সেন্টার সুপার মার্কেটে চলে এল ও, খামোকা বেশ কিছু মুদি সওদা কিনল। তারপর ফিরে এল বাড়িতে। ওর চিৎকার দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলাল। কাঁপা হাতে কফি ঢালল কাপে, চুমুক দিল। হাবক্যাপ হারানোর ঘটনাটা ছাড়া আর সবকিছুই এখন পর্যন্ত ঠিক আছে। তবে পুলিশে খবর দেয়ার আগে আরও একটা কাজ বাকি রয়ে গেছে। এখন দশটা চল্লিশ বাজে। পাইপার-এর নম্বরে ফোন করল মোনা।
পাইপারের যে লোক ফোন ধরল, সে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানাল, না, মি. রোপ এখনও অফিসে পৌঁছেননি। আর এভাবে তিনি কখনোই অনুপস্থিত থাকেন না। অফিসে আগে না জানিয়ে মি. রোপ আজ পর্যন্ত কোথাও যাননি। পাইপার কি এ ব্যাপারে মিসেস রোপকে কোন সাহায্য করতে পারে?
কিন্তু মোনার কোনও সাহায্যের প্রয়োজন নেই।
সে এবার পুলিশ ডিপার্টমেন্টে রিং করে মিসিং পারসনস ব্যুরোর নাম্বারটা চাইল। ও ধারের লোকটা নিরাসক্ত গলায় বলল তার স্বামী হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসায় ফিরে আসবেন, মিসেস মোনা খামোকা দুশ্চিন্তা করছেন। হয়তো গতকালকের ঝড় জলের জন্যে তিনি অতি মাত্রায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
ব্যাপারটা ঠিক তা নয়, অফিসার।
ঠিক আছে, আপনি যদি অন্য কোন আশঙ্কা করে থাকেন তাহলে আমরা কি এখান থেকে লোক পাঠাতে পারি–
সত্যি পাঠাবেন? প্লীজ!
ব্যাঙ্কস নামে এক তরুণ সার্জেন্টকে পাঠাল ওরা। লোকটার বয়স খুব বেশি হলে ত্রিশ। সে মোনাকে যারপরনাই বিস্মিত করল। মনে হলো মোনার কষ্ট সে অন্তর দিয়ে অনুভব করতে পেরেছে। সার্জেন্টকে পছন্দ হয়ে গেল মোনার তার প্রশ্নের ধরণ শুনে। হ্যারি সম্পর্কে বিস্তারিত নোট নিল সে, বলল মোনা যেন তার স্বামীর জন্যে খুব বেশি চিন্তা না করে। আশা করা যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই তার স্বামীকে খুঁজে পাওয়া যাবে।
মিনিট বিশেক পর বিদায় হলো সার্জেন্ট। বেটি ফেয়ারচাইল্ড এল মোনার সঙ্গে কথা বলতে। রাতে বোধ হয় ঘুমায়নি, চোখ বসে গেছে, কিন্তু তাকে বেশ কৌতূহলী আর উত্তেজিত দেখাল।
একটু আগে যে গাড়িটা দেখলাম, হড়বড় করে বলল বেটি, পুলিশের গাড়ি মনে হলো! কি হয়েছে, মোনা?
মোনা ওকে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করল।
যেন স্তম্ভিত হয়ে গেছে কথাটা শুনে এমনভাবে, বেটি বলল, হ্যারি কাল রাতে বাসায় ফেরেনি?
অফিস থেকে ফেরার পর আমাকে বলল ওষুধের দোকানে যাচ্ছে। তারপর থেকে ওর আর কোন সংবাদ নেই।
কোথায় যেতে পারে, বলো তো?
আমি জানি না, বেটি।
অফিসে খোঁজ নিয়েছ?
মোনা মনে মনে উল্লাস বোধ করল। সকালেই নিয়েছি। কিন্তু ওরা বলল হ্যারি অফিসে যায়নি…
