আমি ইঙ্গিত বুঝতে পেরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে গুনে-গুনে চৌষট্টি টাকা তাঁর হাতে তুলে দিলাম। ডক্টর সমাদ্দার মাথা ঝুঁকিয়ে বিলটা লিখতে-লিখতে বললেন, ‘আপনি বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটায় আসুন। আর এর মধ্যে যদি ওই নাইটমেয়ার আবার দেখেন তা হলে আমাকে জানাবেন, কেমন?’
‘ইয়েস, ডক্টর।’ বিলটা তাঁর হাত থেকে নিয়ে পকেটে ভরলাম। যথাক্রমে দুশমন এবং তার প্রভুর সঙ্গে নজর মিলিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। স্প্রিং-এর দরজা আপনাথেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
সিঁড়ি নামতে-নামতে মনের আয়নায় ভেসে উঠল শঙ্করদাস গিরির মুখ। এবং পরক্ষণেই যেন দেখতে পেলাম কবরের বাইরে বেরিয়ে থাকা তাঁর সাবান-ধরা ডানহাতটা…।
বৃহস্পতির বিকেল ঠিক পাঁচটায় ডক্টর সমাদ্দারের চেম্বারে হাজির হলাম। আমাকে দেখে পরিচিতের হাসি হেসে তিনি বলতে বললেন। দুশমন যথারীতি তার প্রভুর পাশে বসে। ডক্টর সমাদ্দারকে জানালাম তাঁর অনুমানই ঠিক। এই দু-দিনে সেই স্বপ্ন আমি আরও দুবার দেখেছি।
উত্তরে মনের বক্তব্যকে যেন গুছিয়ে নিলেন ডক্টর সমাদ্দার। মাথার রুপোলি চুলে একবার হাত বুলিয়ে বললেন, ‘মিস্টার রায়, এ দু-দিন আমি আপনার ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। তাতে যে-সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, তার খানিকটা আমি আগেরদিনই আপনাকে জানিয়ে দিয়েছি। অর্থাৎ, ডক্টর শঙ্করদাস গিরিকে আপনি সত্যি-সত্যি কোথাও-না-কোথাও দেখেছেন।’
আমি বিহ্বলভাবে মাথা নাড়লাম।
ডক্টর সমাদ্দার বলে চললেন, ‘তা ছাড়া আমি আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। মিস্টার রায়, কখনও কি আপনি কোনও হসপিটাল, নার্সিং হোম বা মেন্টাল হোমে ছিলেন?’
আমি স্পষ্টস্বরে জবাব দিলাম, ‘হ্যাঁ, ছিলাম। সামান্য মেন্টাল প্রবলেম হওয়ার জন্যে আমাকে মাসখানেক মাইথনের একটা মেন্টাল হোমে কাটাতে হয়।’
‘কবে?’
‘গতবছর শীতে।’
‘সেই মেন্টাল হোমের নাম আর অ্যাড্রেস আপনার মনে আছে?’
‘আছে।’ আমি নাম ও ঠিকানা বললাম।
প্যাডের কাগজে সেটা টুকে নিলেন ডক্টর সমাদ্দার। তারপর বললেন, ‘এখন আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন: স্বপ্নে দেখা সেই বাড়ির সঙ্গে মাইথনের সেই হোমের কি কোনও মিল আছে? ভালো করে ভেবে জবাব দিন—।’
‘অত ভাবার দরকার নেই, ডক্টর—’ বিনা দ্বিধায় জবাব দিলাম, ‘অনেকটাই মিল আছে।’
‘তা হলে আমার অনুমানই ঠিক।’ ধীরে-ধীরে বললেন অম্বিকা সমাদ্দার, ‘কারণ, বাড়িটার এমন বর্ণনা আপনি দিয়েছেন, যার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় কোনও হসপিটাল বা নার্সিং হোমের। সুতরাং, এখন আপনার উচিত মাইথনের সেই মেন্টাল হোমে যাওয়া, এবং স্বপ্নে দেখা ব্যাপারগুলো মিলিয়ে নেওয়া। যেমন ধরুন, সত্যিই শঙ্করদাস গিরি নামে কোনও ডক্টর সেখানে আছেন কিনা। অথবা সেই জঙ্গল, মাঠ—সত্যিই এসবের কোনও অস্তিত্ব সেখানে রয়েছে কিনা। তা হলেই আপনার কনশাস আর সাবকনশাস মাইন্ডের গরমিলগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে। সেখানে গিয়ে আপনার খোঁজখবরের রেজাল্ট আমাকে জানাতে ভুলবেন না, কেমন?’
আলোচনা-শেষের স্পষ্ট ইঙ্গিত। কিন্তু আমি বসেই রইলাম। ডক্টর অম্বিকা সমাদ্দার একটু অবাক হলেও মুখে কিছু বললেন না। অভিব্যক্তিতে একটি নীরব প্রশ্নচিহ্ন ফুটিয়ে অপেক্ষায় রইলেন।
‘ডক্টর, আপনার কাছে আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে।’ একটু ইতস্তত করে বললাম, ‘মাইথনে আমার সঙ্গে আপনাকেও আসতে হবে। ওখানে একা যেতে হলে আমি খুব শেকি ফিল করব। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড—এ জন্যে আপনার ফিজ যা লাগে দেব। প্লিজ, ডক্টর, প্লিজ, আমার সঙ্গে আপনি চলুন। একটা দিনের তো ব্যাপার!’
ডক্টর সমাদ্দার কয়েকমিনিট চুপ করে রইলেন। কী যেন ভাবলেন মনে-মনে। অবশেষে মুখ খুললেন, ‘আপনার অবস্থা আমি বুঝতে পেরেছি, মিস্টার রয়, কিন্তু আমার পক্ষে যাওয়া একটু প্রবলেম। আমার চেম্বার রয়েছে, রয়েছে দুশমন, তা ছাড়া—।’
‘আপনি করবেন না, ডক্টর।’ অনুনয়ের সুরে বললাম, ‘প্লিজ, একটা দিন আপনি আমার জন্যে সময় দিন। বললাম তো, আপনার প্রপার ফিজ আমি নিশ্চয়ই দেব। কিন্তু আমার সঙ্গে আপনাকে যেতেই হবে। প্লিজ।’
‘কিন্তু দুশমন?’ দুশমনের পিঠে হাত রাখলেন ডক্টর সমাদ্দার, ‘আমাকে ছাড়া ও থাকতে পারবে না। আমি ছাড়া কারও কথা ও শোনে না, কারও হাতে খাবার খায় না।’
মরিয়া হয়ে বলে উঠলাম, ‘ওকেও তা হলে সঙ্গে নিন। আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু ডক্টর, প্লিজ, ওখানে আমাকে একা যেতে বলবেন না—।’
ডক্টর সমাদ্দার দুশমনের লোমশ কালো পিঠে হাত বোলাতে-বোলাতে বললেন, ‘আপনার কথাই থাক। দুশমনও আমাদের সঙ্গী হোক।’ তারপর দুশমনের পিঠে চাপড় মেরে: ‘গেট রেডি দুশমন, কাল আমরা বেড়াতে যাচ্ছি।’
উত্তরে দুশমনের হিংস্র দাঁতের ফাঁক থেকে একটা চাপা গরগর শব্দ ভেসে এল।
‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, ডক্টর।’ আবেগে ডক্টর সমাদ্দারের হাত চেপে ধরলাম। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। ভিজিট-এর চৌষট্টি টাকা তুলে দিলাম তাঁর শীর্ণ হাতে। বললাম, ‘তা হলে আগামীকাল দুপুরের ট্রেনে আমরা রওনা হচ্ছি।’
মৃদু হেসে ঘাড় হেলালেন অম্বিকা সমাদ্দার।
ওঁর চেম্বার ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। সিঁড়ি নামতে শুরু করলাম।
মাইথনের সেই মেন্টাল হোমের দরজায় যখন পৌঁছলাম, তখন সন্ধে সাড়ে ছ’টা।
