মোবাইল ফোনে পরের পর নির্দেশ দিয়ে অভিলাষকে গাইড করতে লাগলেন তিনি। আয়না আর কাচের গোলকধাঁধায় অভিলাষ অন্ধের মতো পথ খুঁজতে লাগল। বারবার ধাক্কা খেতে লাগল কাচে অথবা আয়নায়। নিজের প্রতিবিম্বের সঙ্গে ধাক্কা এড়াতে গিয়ে বেশ কয়েকবার নাকাল হল। তারপর, বহু ধস্তাধস্তির পর ও কিউব- ১১০১১-এ পৌঁছতে পারল।
তখনই ও ওর এফপিজি-কে প্রথম দেখতে পেল।
বেঁটে চেহারার মোটাসোটা মানুষ। ফরসা, গালে সাহেবদের মতো লালচে আভা। মাথার প্রায় পুরোটাই টাক। চোখে চৌকো কাচের শৌখিন চশমা। চোখজোড়া গোল-গোল। তাতে সবসময়েই একটা অবাক ভাব। নাকের নীচে ছোট চওড়া গোঁফ। আর থুতনির নীচে গলকম্বল।
গোটা অফিসটা এসি হওয়া সত্ত্বেও ভদ্রলোকের কপালে আর টাকে বিনবিনে ঘাম। পকেট থেকে একটা সাদা রুমাল বের করে ঘন-ঘন ঘাম মুছছেন।
এফপিজির চেহারা অভিলাষকে হতাশ করল। এ যে দেখছি বোকা-বোকা একটা জোকার! যার সঙ্গে বুদ্ধির বা আই. কিউ-র কোনও সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অভিলাষ। ভদ্রলোককে কয়েকবার জরিপ করল।
না, ভদ্রলোকের পোশাক বেশ স্মার্ট। ঘিয়ে রঙের ফুলশার্ট। গাঢ় নীল রঙের টাই। আর গাঢ় নীল টেরিউলের প্যান্টের ওপরে সরু-সরু সাদা স্ট্রাইপ।
এফপিজির নাম কমলপাণি। অভিলাষের সঙ্গে হাতমোলানোর সময় শুধু প্রথম নামটাই বললেন তিনি। তারপর ওকে নিয়ে কাচ আর আয়নায় ঘেরা একটা কিউবিকল-এ বসলেন।
অভিলাষ আগেই লক্ষ করেছিল, কিউবিকলগুলোর নম্বর ডেসিম্যাল নাম্বারে না লিখে বাইনারিতে লেখা। ও যখন এর কারণ ভাবছিল তখন কমলপাণি হাতে হাত ঘষে একটু খসখসে গলায় ওকে জিগ্যেস করলেন, ‘বলুন, স্যার, আপনার ন্যাগিং প্রবলেমটা কী? আপনাকে এটুকু অ্যাশিয়োর করছি, নেচার অফ প্রবলেম যা-ই হোক না কেন, উই উইল সলভ ইট ফর গুড।’
অভিলাষ আর দেরি করল না। সমস্যাটা ও বলতে গেলে কমলপাণির মুখের ওপরে উগরে দিল।
‘সমস্যাটা আমার ওয়াইফ। আই ওয়ান্ট টু বাম্প আর অফ—ওকে একেবারে খতম করতে চাই…।’
‘গুড!’ কমলপাণি চাপা হেসে মাথা নাড়লেন ‘আপনার ওয়ে অফ এক্সপ্রেশান আমার ভালো লেগেছে, স্যার। বি ডায়রেক্ট অ্যান্ড টু দ্য পয়েন্ট। সেভস টাইম।’ কাচের টেবিলে আলতো করে আঙুলের টোকা মারতে শুরু করলেন কমলপাণি। সাদা সিলিং-এর দিকে কয়েক লহমা তাকিয়ে রইলেন। আস্তে-আস্তে বললেন, ‘ওয়াইফকে…খুন…করতে…চান। তাই তো?’ চোখ নামালেন অভিলাষের দিকে ‘মোস্ট কমন প্রবলেম। হ্যাঁ, সলভ হয়ে যাবে। তবে মার্ডার করতে চান কোন মোডে—ভারচুয়াল মোড, না রিয়েল মোড?’
‘তার মানে?’
‘দেখুন, আমরা মার্ডার করি দু-ভাবে—ইন ভারচুয়ালিটি, অ্যান্ড ইন রিয়েলিটি…।’
অভিলাষ ফ্যালফ্যাল করে কমলপাণির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর মাথায় তখনও ভালো করে কিছু ঢুকছিল না। ভারচুয়াল? রিয়েল? এসব কী বলছে ওর এফপিজি! তাছাড়া মানুষটা মার্ডার করার ব্যাপারটা এমন মামুলিভাবে উচ্চারণ করেছে যে, অভিলাষের স্পাইনাল কর্ড বেয়ে বরফজলের হিমস্রোত নেমে গেল।
কমলপাণি যতই কথা বলছিলেন অভিলাষ ততই বুঝতে পারছিল বোকা-বোকা জোকার-জোকার ভাবটা ওঁর ছদ্মবেশ। ক্ষুরধার বুদ্ধি না থাকলে ‘এন্ড গেম’-এর এক্সিকিউটিভ হওয়া যায় না।
‘…ব্যাপারটা আপনাকে বুঝিয়ে দিই, স্যার…’ দু-হাত নেড়ে বললেন কমলপাণি, ‘ধরুন, আপনাদের কনজুগাল লাইফ একদম ঘেঁটে গেছে। মানে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা একেবারে বিষিয়ে গেছে—মিউচুয়াল হেট্রেড ছাড়া আর কিছু বাকি নেই। তখন, ধরুন, আপনি ডিসাইড করলেন যে, আপনার ওয়াইফকে মার্ডার করবেন—এই যেমন আপনি ডিসাইড করেছেন।
‘আমাদের সাইকোলজি ডিভিশান স্টাডি করে দেখেছে যে, এরকম কেস-এ প্রায় এইটিথ্রি পারসেন্ট মানুষের বেলায় রিয়েল মার্ডারের দরকার হয় না। ভারচুয়াল মার্ডার করলেই কাজ হয়ে যায়। মানে, য়ু গেট ইয়োর হেট্রেড আউট অফ ইয়োর সিস্টেম। তখন স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর রিলেশানটা আবার রিপেয়ার হয়ে যায়। এভরিথিং এন্ডস ওয়েল। ঠিক আছে?’
‘ভারচুয়াল মার্ডার মানে?’ হতবাক অভিলাষ জিগ্যেস করল।
কমলপাণি হাসলেন, ওঁর ভুঁড়ি হাসির দমকে কেঁপে উঠল আঙুলের ডগা খুঁটতে-খুঁটতে তিনি বললেন, ‘ভারচুয়াল মার্ডার মানে নকল খুন। কিন্তু আপনি ভাববেন আসল খুনই হয়েছে। ব্যাপারটা আমাদের কোম্পানির ইনভেনশান—ইন্টারন্যাশনাল পেটেন্টও নেওয়া আছে। এর ডিটেইল-এ এখন যাচ্ছি না—পরে আপনি দেখতেই পাবেন—যদি অবশ্য আপনি ভারচুয়াল মোডে যান।
‘আমাদের কোম্পানির নিয়ম হল, ভারচুয়াল মার্ডার হলে সেটা অবশ্যই ক্লায়েন্টকে নিজের হাতে করতে হবে। আর…ইফ এনিবডি গোজ ফর রিয়েল মোড, ”এন্ড গেম” টেকস কেয়ার অফ এভরিথিং। ক্লায়েন্টকে কোনও ঝামেলা ঘাড়ে নিতে হবে না। বরং আমরা ক্লায়েন্টকে জবরদস্ত অ্যালিবাই তৈরি করে দেব—পুলিশের বাবাও তাকে সেই মার্ডারের সঙ্গে জড়াতে পারবে না। তা ছাড়া মার্ডারটা আমরা এমনভাবে কমিট করব যে, সেটা একটা পারফেক্ট অ্যাক্সিডেন্টের মতো দেখাবে। এই ধরুন কার অ্যাক্সিডেন্ট, কিংবা মালটিস্টোরিড বিল্ডিং থেকে পড়ে যাওয়া—এই টাইপের। অ্যাবসোলিউটলি নো উয়ারিজ ফর দ্য ক্লায়েন্ট। ক্লায়েন্টকে শুধু আমাদের প্রপার ফি-টা ক্রেডিট কার্ডে জমা করতে হবে। ব্যস…।’
