সুতরাং আপনারাই বলুন, এইরকম একটা বুদ্ধিদীপ্ত সাইকোজিক্যাল মার্ডার আমি ছাড়া আর কার পক্ষে সম্ভব?
তবে মহিনকে একটা সূত্র দিয়েছিলাম লিফটের বোতাম টেপার সময়। আমার ফ্ল্যাট যদি চারতলায় হয়, তবে আমাকে তিন নম্বর বোতাম টিপতে হবে। কিন্তু মহিন বোঝেনি, চার নম্বর বোতাম টেপার পর যে-তলায় গিয়ে লিফট থেমেছে, সেটা আমার ফ্ল্যাট নয়। সেটা পাঁচতলার সেই অসম্পূর্ণ মরণ-ফ্ল্যাট। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণ দরজায় লাগিয়ে দিলাম প্লাস্টিকের ১২ নম্বর ও একটা কলিংবেলের ক্যাপ—কারণ, ডিটেলের প্রতি আমি গভীর মনোযোগ দিই।
অতএব মনে রাখবেন বন্ধুগণ, প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম ‘শার্প’ দেবনাথ। এই কিলিং মার্কেটে যিনি মনোপলি বিজনেস করে চলেছেন। সুতরাং তার সঙ্গে দুশমনির কথা ভুলেও মনে আনবেন না। তা হলে আপনাদেরও অবস্থা হবে ওই মহিন রায়ের মতো। কাউকে মোক্ষলাভ করানোর পর আমি মনে-মনে ভীষণ দুঃখ পাই, বিশ্বাস করুন। কিন্তু কী করব, আমি নিরুপায়। আফটার অল, আই অ্যাম দ্য কিং অফ প্রফেশনাল কিলার্স। দ্য গ্রেট ‘শার্প’। সুতরাং—।
অপারেশান ভারচুরিয়্যালিটি
অনেকক্ষণ ধরে ফোন করব কি করব না ভেবে শেষ পর্যন্ত নম্বরটা ডায়াল করেই ফেলল অভিলাষ।
কয়েক সেকেন্ড পার হতে-না-হতেই ও-প্রান্তে রিং বাজতে শুরু করল। অভিলাষের বুকের ভেতরে ধুকপুক শুরু হয়ে গিয়েছিল। লাইনটা কি এখনই কেটে দেবে? নাকি…।
না, না—লাইন কাটার কী দরকার! একটু কথাবার্তা বললে খোঁজখবর করলে ক্ষতি কী? আসল কাজে না এগোলেই হল।
‘হ্যালো—’ একটি মেয়ের গলা।
‘এটা কি ”এন্ড গেম”-এর অফিস?’ প্রশ্নটা করতে গিয়ে অভিলাষের গলা কেঁপে গেল।
‘হ্যাঁ—বলুন…।’ রোবটের মতো গলায় মেয়েটি বলল।
‘আ-আমি কয়েকটা ইনফরমেশান চা-চাই…।’
‘এর জন্যে আপনাকে আমাদের অফিসে এসে কোনও একজন এক্সিকিউটিভের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমাদের অফিসটা হল থারটি ফাইভ গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ। ”দ্য টাওয়ার্স” বিল্ডিং-এর সেভেনটিনথ ফ্লোর। উই আর ওপেন টুয়েন্টিফোর ইনটু সেভেন।’একটু দম নিয়ে মিষ্টি গলার মেয়েটি জিগ্যেস করল, ‘মে আই নো হু ইজ মেকিং দিস কল?’
কয়েকবার ঢোঁক গিলে অভিলাষ বলল, ‘মানে…আপনাদের একটা এসএমএস দেখে আ-আমি কল করেছি। আই মিন…।’
‘ইটস ও. কে., স্যার। ইমপরট্যান্ট পারসনসদের মোবাইল ফোনে কনট্যাক্ট করাটা আমাদের অ্যাড ক্যামপেইনেও খুব হেলপ করে। আমাদের কোম্পানির মরাল হচ্ছে, ”আ ক্লায়েন্টস সিক্রেট ইজ অলওয়েজ আ সিক্রেট।” ক্লায়েন্টদের সব ব্যাপার আমরা গোপন রাখি। ফর এক্স্যাম্পল, এই যে আপনি আমাদের ফোন করেছেন, এটা কেউ জানতে পারবে না। ইভন দ্য পুলিশ ক্যান নট ট্রেস দিস কল। বিকজ মোবাইল ফোন সার্ভিস প্রোভাইডারের সঙ্গে আমাদের স্পেশাল এগ্রিমেন্ট আছে। উই পে দেম বিগ মানি। সো এভরিথিং ইজ হাশ-হাশ।’ একটু থামল মেয়েটি। বোধহয় অভিলাষকে সাহস জোগানোর সময় দিল। তারপর: ‘আই হোপ ইউ আর স্যাটিসফায়েড, স্যার। নাউ মে আই নো হু ইজ কলিং?’
অভিলাষ ঘামতে শুরু করেছিল। ওর দম যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। ও তাড়াতাড়ি লাইনটা কেটে দিল।
ব্যাপারটা শুরু হয়েছে কাল সকাল থেকে। ঘুম থেকে উঠেই চায়ের টেবিলে রঙ্গনার সঙ্গে প্রবল খটাখটি হয়ে গেল। ইস্যুটা খুবই সামান্য: অভিলাষের একটা নীলচে ফুলহাতার শার্ট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেটা রঙ্গনাকে জিগ্যেস করতেই ও ঠোঁট উলটে বলে বসল, ‘তো আমাকে কী করতে হবে?’
তাতে বিরক্ত হয়ে অভিলাষ বলেছে, ‘কেন, তোমাকে জিগ্যেস করাটা কি অন্যায় হয়েছে?’
‘অন্যায় না হলেও ন্যায়ের বেসিসটাও তো খুব একটা খুঁজে পাচ্ছি না। শার্টটা নিয়ে কি আমি বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি?’ ভুরু উঁচিয়ে একটু তেরছা হাসি ছুড়ে দিয়েছে রঙ্গনা। তারপর: ‘তুমি তো জানো, আমার ভাইয়েরা এত কম দামি শার্ট পরে না। দে অলওয়েজ গো ফর সুপারব্র্যান্ডস…।’
ব্যস, শুরু হয়ে গেল।
ওদের বিয়েটা প্রেম করে হয়েছিল ঠিকই, তবে রঙ্গনা একমুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারে না ওরা ব্যাপক বড়লোক। বিয়ের প্রথম তিন-চার বছরে সেরকম কোনও সমস্যা হয়নি। সমস্যা শুরু হয়েছে পাঁচে পা দেওয়ার পর। ওদের মধ্যে কোনওরকম ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট হলেই দু-চার লাইন কথা চালাচালির পর রঙ্গনা ওর সেই গোরু রচনায় ফিরে আসে। অভিলাষকে মনে করিয়ে দেয় যে, ওরা টগবগে বড়লোক।
তো সকালের ঝগড়ার প্রায় সাড়ে তিনঘণ্টা পর অভিলাষের মোবাইলে এসএমএস-টা আসে।
অভিলাষ তখন অফিসে। ল্যাপটপ কম্পিউটারের কিবোর্ডে ওর আঙুল চলছিল। মোবাইল ফোনটা রাখা ছিল একটা পেন ড্রাইভের পাশে। হঠাৎই এসএমএস-এর রিং বেজে ওঠায় কাজ থামিয়ে ও মেসেজটা দ্যাখে। অচেনা নম্বর থেকে আসা এক অদ্ভুত এসএমএস:
Harassed with any nagging problem? Call us, the PROBLEM
SOLVER. We’re the best.—END GAME (9832100051)
এসএমএস-টার মানে প্রথমে ঠিক বুঝতে পারেনি অভিলাষ। যে-কোনও ঘ্যাপচানো সমস্যায় ব্যতিব্যস্ত হলে ‘এন্ড গেম’ সব সমস্যার সমাধান করে দেবে? যে-কোনও সমস্যা বলতে…ওদের সমস্যার এলাকাটা ঠিক কতটা বড়? গ্যাসট্রিক আলসার থেকে কিডন্যাপিং বা মার্ডার পর্যন্ত কি?
বলতে গেলে ঠিক তখনই রঙ্গনাকে খুন করার ব্যাপারটা প্রথম ওর মাথায় আসে।
